আনন্দ মৃত্যু অবহেলা

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০০ এএম

এবারের ঈদুল ফিতরে ছিল প্রায় ১ সপ্তাহের ছুটি। একটানা দীর্ঘ ছুটির কারণ, একইসঙ্গে ছিল নতুন বাংলা বছর ১৪৩১-এর প্রথম দিন। ঈদের ছুটিতে নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়া-আসা কিছু মানুষের জীবনে ছিল শেষ আনন্দ। কেউ আনন্দের শুরুতে যাত্রাপথে, আবার কেউ ফেরার পথে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। যার অধিকাংশেরই মৃত্যু সড়কে। এর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে অদক্ষ চালকের পাশাপাশি খোদ সড়কেই রয়েছে নানা অসঙ্গতি। ফোর-লেন, টু-লেন, ডিভাইডার, অস্পষ্ট সতর্ক সংকেতসহ কিছু বিষয়। একদিকে ফাঁকা রাস্তা, অন্যদিকে দক্ষ চালকের অনুপস্থিতিতে গাড়ির হেলপার-কন্ডাক্টরের হাতে চলে যায় গাড়ির স্টিয়ারিং। গাড়ির মালিক এবং রাস্তায় কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের টাকার প্রতি লালসায় দীর্ঘ ৬ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন প্রায় ১৫০ জন। শুধু ঈদুল ফিতরের দিনই সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৭০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২ শতাধিক। এই দুর্ঘটনার দায়ভার কেউই নেবে না। এ এক অদ্ভুত অবশ চেতনা। এর শেষ কবে, কীভাবে হবে সেই সমাধান কেউ জানে না।

বিভিন্ন রাস্তায় ডিভাইডারের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে, রাস্তায় নতুন চালক ও রাতের বেলা চালকরা বেশি দুর্ঘটনায় পড়ছেন। অনেক স্থানেই দেখা যায়, দিকনির্দেশনার চিহ্ন ও বাতিগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে।  ঈদের দিনসহ বন্ধের দিনগুলোতে সড়কে প্রাণহানি দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই বেশি। ডিভাইডার উঁচু করে দেওয়া ও এর মাথায় ক্যাটস আই বাতি স্থাপন করলে দুর্ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব বলে সড়ক বিশেষজ্ঞরা জানান। প্রায় ১ সপ্তাহের টানা ছুটির কারণে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষ এবার জন্মস্থান বা গ্রামের বাড়িতেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে পেরেছেন। এবারের পহেলা বৈশাখে দেশের অনেক  জেলা, উপজেলা এবং গ্রামগুলো হয়ে উঠেছিল একটি উৎসব কেন্দ্র।

অন্যদিকে রাজধানী ঢাকা বর্ষবরণের দিন যেন হয়ে উঠেছিল অচেনা হাজার মানুষের মিলনমেলা। ঈদের ছুটিতে লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়লেও, বাংলা বর্ষবরণের দিন সকালে ও বিকেলে রাজধানীতে হাজার মানুষের প্রাণবন্ত উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল, বাঙালির চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক চেতনা যেখানে ধর্ম, গোত্র, বর্ণ নয় কেবলই ছিল মানুষের মঙ্গল কামনার উদগ্র বাসনা। অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রাণের বর্ষবরণ শোভাযাত্রায় স্থান পেয়েছিল আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রতীকী উপস্থাপনের নানা বিষয়। এবারের মঙ্গল  শোভাযাত্রার সেøাগান ছিল ‘আমরা তো তিমিরবিনাশী’। শোভাযাত্রা নিয়ে নিরাপত্তার কড়াকড়ি থাকলেও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের কাছে যেন হার মেনেছিল সবকিছুই।  ঢাকঢোলের বাদ্যের তালে তালে তরুণ-তরুণীদের নৃত্য, হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দ-উল্লাস মাতিয়ে রাখে পুরো শোভাযাত্রা। তবে নির্দিষ্ট যাত্রাপথে শোভাযাত্রার চলাচলে কিছুটা হলেও খটকা লেগেছে। সর্বজনীন এমন উৎসবে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ না থাকলে ভালো হতো।  

আমরা মনে করি, সময় বেঁধে দেওয়ার এই বিধিনিষেধ অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক। বরং যত  বেশি এবং বেশি সময় নিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজন করা যাবে পহেলা বৈশাখে তত বেশি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছড়িয়ে পড়বে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতার এই সময়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আরও প্রেরণা দেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের কাছে সংস্কৃতিমনস্ক এবং প্রগতিশীল মানুষের প্রত্যাশা অনেক। যারা নিকটজন হারিয়েছেন, তাদের প্রতি থাকল আমাদের সমবেদনা। তাদের জীবনে ঈদ বা বাংলা নববর্ষের কোনো আনন্দ নেই। সড়কে যেন আর প্রাণ না যায়, সরকারকে সে বিষয়ে আরও সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই। দেশের মানুষকে কেন্দ্র করেই যেহেতু সমস্ত উন্নয়ন এবং অগ্রগামিতা সেহেতু জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টিই সর্বাগ্রে বিবেচনা করা উচিত। এ বিষয়ে কোনো অবহেলার সুযোগ নেই।

আবার শুরু হলো, সমস্ত পেশার মানুষের কর্মচাঞ্চল্য। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশই হয়ে উঠবে কর্মমুখর। আগামী ঘিরে থাক সব মানুষের কল্যাণ, আনন্দ আর সুন্দরের আলোকচ্ছটায়। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত