সময় নতুন বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৪২ পিএম

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা গণহত্যার অভিযোগ তুলে যে অভিযোগ দায়ের করেছিল সেই ঐতিহাসিক মামলা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। যদি কার্যকরী পদক্ষেপের কথা বলা হয় তবে বলতেই হবে যে, ইসরায়েলিরা যে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্মমভাবে হত্যাকান্ড চালাচ্ছে তার বিপরীতে অতি ক্ষীণ-প্রতিউত্তরগুলোর মধ্যে এই মামলাটি একটি উজ্জ্বল বিন্দু। তবে অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যেও যে বিষয়টি খুব কম আলোচিত তা হচ্ছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই অতি জরুরি মামলাটি উত্থাপন করায় মার্কিন সাম্রাজ্য দক্ষিণ আফ্রিকাকে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। সম্প্রতি ইউএস হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে ইউএস-সাউথ আফ্রিকা বাইলেটারেল রিলেশনস রিভিউ অ্যাক্ট উত্থাপন করা হয়। এই বিলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সম্পর্কের একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা হবে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘সন্ত্রাসবাদ’ সমর্থন করছে এমন একটি ভিত্তিহীন এবং ভুয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। এই অবস্থায়, দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের অর্থনীতিসহ শিল্পকলা, পড়াশোনা, সম্প্রদায়, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রকল্প ও উদ্যোগের তহবিলসহ অনেক বিষয়েই উদ্বিগ্ন। কারণ এর মধ্যে অনেকগুলোই অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্ব জুড়ে অ্যাক্টিভিস্টদের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ আফ্রিকাকে শাস্তি দেওয়ার মার্কিন হুমকির বিরুদ্ধে কথা বলা এবং তাদের সরকার যাতে এই ধরনের পথ অনুসরণ না করে তা নিয়ে জোর দেওয়া উচিত। আন্দোলনকারীরা বর্তমানে যে দাবিগুলো করছে তার সঙ্গে এই ব্যাপারটিও যোগ হওয়া উচিত। ফিলিস্তিনের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা নিজের গলা পেতে দিয়েছে আর সেই কারণে এই মুহূর্তে ফিলিস্তিনপন্থি অ্যাক্টিভিস্টদের ন্যূনতম করণীয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দক্ষিণল আফ্রিকাকে সমর্থন করা। আজ শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে নিজেদেরও রক্ষা করার জন্য একটি জোট গঠন শুরু করা বিশ্বজুড়ে মধ্যম শক্তিগুলোর দায়িত্ব। যেকোনো সৎ পর্যবেক্ষকের কাছে এই ব্যাপারটা স্পষ্ট যে ইসরায়েলি রাষ্ট্রটিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য এবং তার ওপর আইনগতভাবে চাপ সৃষ্টি করার জন্য রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি পদক্ষেপ ছাড়া, একে গণহত্যার পথ থেকে সরানো যাবে যাবে না এখন নয়, ভবিষ্যতেও নয়। কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য যখনই চাপ প্রয়োগ করা হয়, তখনই অ্যাক্টিভিস্ট, নীতিনির্ধারক এবং প-িতরা প্রায়শই দক্ষিণ আফ্রিকাসহ দুনিয়ার অনেক দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অফ-দ্য-রেকর্ড জবাব পান। আর তা হচ্ছে, ‘আমরা ফিলিস্তিনি জনগণকে সাহায্য করার জন্য আরও সরাসরি এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে চাই, কিন্তু আমরা যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া সহ্য করতে পারব না।’

আমি এই প্রতিক্রিয়াটিকে বিমুখতার একটি রূপ হিসেবে দেখি না এবং আমি এটিকে কাপুরুষতা হিসেবেও বিবেচনা করি না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়ায় তাদের দেশ যে অর্থনৈতিক অসুবিধার সম্মুখীন হবে তা সরকারি কর্মকর্তারা এত সহজে উড়িয়ে দিতে পারেন না। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া দিয়ে কথোপকথন শেষ করা যথেষ্ট নয়। যেহেতু মার্কিন সাম্রাজ্য ফিলিস্তিনিদের অধিকার, স্বাধীনতা, মুক্তি এবং সার্বভৌমত্বের পাশাপাশি মধ্যম শক্তির সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রেও একটি বড় বাধা, তাই মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর কর্তব্য এবং স্বার্থ উভয়ই রয়েছে এই নিয়ে পরিকল্পনা করা এবং একটি কর্মপন্থা অনুসরণ করে সমস্যাটিকে মোকাবিলা করা। এই সমস্যা স্পষ্টতই, বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক শক্তির ওপর কম নির্ভরশীল হওয়ার সর্বোত্তম পথ। যদিও ব্রিকসের মতো এই লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা রয়েছে, তবে এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন থেকে অনেক দূরে রয়েছে। ফিলিস্তিনি জণগণের এতদিন অপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

মোকাবিলার আরও একটি তাৎক্ষণিক উপায় হচ্ছে যেসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে অগ্রসর হবে, তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোকে কঠিন করে তোলা। এই তাৎক্ষণিক নীতি গ্রহণ করা সহজ কারণ এর জন্য সংখ্যাগতভাবে শক্তি এবং নিরাপত্তা আছে। যদি মধ্যশক্তির একটি জোট গঠন করা হয় এবং তা ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাদের সবাইকে শাস্তি দেওয়া কঠিন হবে। কারণ সেটা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। এই ধরনের জোট কেমন হতে পারে? দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, চিলি, মিসর, মরক্কো, স্পেন, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড এবং অন্য দেশগুলো মিলে শুরু করতে পারে। যে দেশগুলো ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখে না যেমন সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান এবং অন্যান্য সুরক্ষা পেতে তারাও ওই জোটে যোগ দিতে পারে। যখন একটা শক্ত অবস্থান তৈরি হবে তখন কমশক্তির দেশগুলোও যোগ দিতে পারে, এবং তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তাদের সবাইকেই হুমকির লক্ষ্য বানানো কার্যত অসম্ভব হবে।

এই অবস্থা তৈরি হতে পারে। কিন্তু কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং অন্যান্য দেশ যারা বোঝে যে এটি সঠিক পদক্ষেপ কিন্তু তারা হয় খুব ভীতু বা অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে এবং তাদের পূর্বভূমিকার কারণে এটি অনুসরণ করতে ইচ্ছুক হবে না হয়তো। তবে মার্কিন সাম্রাজ্যের এই জোটকে আংশিকভাবে হলেও চাপ দেওয়া যেতে পারে। এমনকি, ইসরায়েলের ওপর সম্পূর্ণ দ্বিমুখী অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা যেতে পারে। যদিও এর কোনোটাই সহজ হবে না। তবে ব্যাপারটা জরুরি এবং তা কার্যকরী হতে পারে। আমি মনে করি যে নিজেদের স্বার্থেই অ্যাক্টিভিস্টদের উচিত সরকারগুলোকে এই ধরনের জোট করতে চাপ দেওয়া। সরকারগুলো ততদূরই অগ্রসর হবে যতক্ষণ ‘সুনাম ও ইজ্জত’ এবং নির্বাচনী কৌশলের জন্য তা কার্যকরী হবে। অ্যাক্টিভিস্ট, নীতিনির্ধারক এবং পন্ডিতদের যার যার সরকারকে বোঝাতে হবে যে নিজেদের স্বার্থেই দেশগুলোকে এই পথে এগুতে হবে।

ফিলিস্তিনের প্রশ্নে মার্কিন সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করা আরও গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার অসাধারণ পরিণতি বয়ে আনবে। যদিও ওপরে তালিকাভুক্ত কিছু রাষ্ট্র বিশ্বাস করে যে স্রেফ ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা উপেক্ষা করে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে পারে, দুই কারণে এই চিন্তা স্বল্পমেয়াদি। প্রথমত, ফিলিস্তিনের প্রশ্নে মার্কিন ক্রোধ এড়াতে পারার অর্থ এই নয় যে, তারা ভবিষ্যতে অন্য ইস্যুতে এর মুখোমুখি হবে না। একটি বৃহৎ পরাশক্তির অধীনস্ত থাকা মধ্যম শক্তির জন্য ভালো নয়। সাময়িকভাবে উপকার হলেও কোনো কোনো সময়ে এই অধীনতার জন্য মূল্য দিতে হবে। তাহলে এই মুহূর্তেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া নয় কেন? এখানেই দ্বিতীয় কারণটি আসে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে তৃণমূল গতিশীল। এখন সময় এসেছে সুযোগটি কাজে লাগানোর, এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা যা সবার জন্য মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।

এই মুহূর্তটি দখল করা এবং স্পষ্ট বার্তা প্রেরণ করা গুরুত্বপূর্ণ যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশের বেলায় মার্কিন একাধিপত্য মেনে নিতে হলে হয় মার্কিন সাম্রাজ্যকে শুধরাতে হবে অথবা তার ও ইসরায়েলকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হবে। যখন আমরা সেই পর্যায়ে পৌঁছাব, তখন ইসরায়েলি সেটেলার উপনিবেশ ধ্বংস হবে। আমরা ধ্বংস করতে পারব বর্ণবাদ এবং গণহত্যা, যেগুলো ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিক অস্ত্রাগারের সবচেয়ে মারাত্মক দুটি অস্ত্র।

একবার বিশ্বব্যাপী বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, ইসরায়েল তার আচরণ পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিক প্রকল্প বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় তাদের থাকবে না। ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিরা তখন সত্যিকারের বিউপনিবেশিক শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য একটি আলোচনা শুরু করতে পারে, যার অধীনে সবার সমান অধিকার এবং স্বাধীনতা রয়েছে এবং ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে ভূমি ও সার্বভৌমত্ব ভাগ করা যেতে পারে। এই ধরনের ফলাফল শুধুমাত্র ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিদের জন্যই উপকারী হবে না, এটি একটি বাস্তব সংকেতও হবে যে মার্কিন সাম্রাজ্য এখন আর সেই সাম্রাজ্য নেই যা একসময় ছিল। এবং সারা বিশ্বের মানুষ এমনকি মার্কিনিরাও, একটি বাস্তব গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণ শুরু করতে পারে। গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা আর একটি পরাশক্তির বুড়ো আঙুলের নিচে থাকবে না। মহান নেলসন ম্যান্ডেলা একবার বলেছিলেন, ‘আমরা খুব ভালো করেই জানি যে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ছাড়া আমাদের স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ।’ এই উদ্ধৃতিটির অর্থ কী তা বেশ আগেই বিশ্ব সত্যিকার অর্থে বুঝতে পেরেছে এবং সাম্রাজ্য ও ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তির অগ্রগতির জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময় চলে এসেছে।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ

লেখক: কানাডার ইউনিভার্সিটি ইন ক্যালিগারির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত