স্টার সিনেপ্লেক্সের সন্ধ্যার শো কারিগরি কারণে শুরু হতে দেরি হলো। পঞ্চম দিনে এসেও ঈদের সিনেমা দেখার দর্শকের লাইন ছিল দেখার মতো। ‘ওমর’ দেখা হলো বিভিন্ন বয়সী দর্শকে ভরপুর ‘হল ওয়ানে’। শুরুর আগে কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের আগের সিনেমাগুলোর কথা মনে করে। ‘প্রজাপতি’কে অনেকে সিনেমা মানতেই নারাজ, ‘ছায়াছবি’ তো আলোর মুখই দেখেনি শেষ পর্যন্ত, ‘তাঁরকাটা’কে দর্শক প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলিউডি এক সিনেমার আদলে নির্মিত বলে আর সর্বশেষ ২০১৮তে মুক্তি পাওয়া ‘যদি একদিন’ সিনেমায় সেলিব্রেটি গায়ক তাহসানকে এনেও কাজের কাজ হয়নি, ছবিটি প্রত্যাশিত দর্শকপ্রিয়তা পায়নি। এরপর ৫ বছর বিরতি দিয়ে রাজ গত বছরের আগস্টে এই ‘ওমর’ সিনেমার ঘোষণা দিয়েছিলেন। খুব সম্ভব রাজ নিজের আগের সিনেমাগুলোতে করা ‘চিত্রনাট্যের গলদ’ টের পেয়েছেন এবং ‘ওমর’ এ সেটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কোনো তথাকথিত স্টার নেই, নায়িকা নেই, নেই মারকাটারি অ্যাকশন। ট্রেলার দেখেও অনেক দর্শক একে ঈদের সিনেমা মানতে নারাজ, সেটা জানাচ্ছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু সিনেমা দেখে মনে হলো, এবার রাজ একটা ‘গল্পনির্ভর’ সিনেমাই বানালেন যেখানে নায়ক স্বয়ং ‘সিনেমার চিত্রনাট্য’ আর কারিগরের লেখক সিদ্দিক আহমেদ।
সিনেমার শুরুতেই জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আর চিত্রনায়ক মান্নাকে দেওয়া ট্রিবিউট পর্দায় দেখে দর্শকের সঙ্গে আমিও খানিকটা অবাক হয়েছি। প্রচারণার সময়কালে পরিচালক রাজ বলেছিলেন, এই ট্রিবিউটের কারণ বুদ্ধিমান দর্শক ধরতে পারবেন। সে কথায় পরে আসছি। সাগর আর পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে শুরুর ন্যারেশনে ছিল গল্পের চরিত্রগুলোর ব্যাপারে কয়েক লাইনে বর্ণনা। দর্শক সবুজেঘেরা কক্সবাজারের দৃশ্য দেখতে দেখতে এলাকার সবচেয়ে ক্ষমতাধর ‘বড় মির্জা’ আর তার ছেলে ‘ছোট মির্জার’ কথা জানতে পারে। এর পরপরই আসে সেই ‘ভাইরাল বেবি’ নামের আইটেম গানটি। হোটেলের বারে কলকাতার সুন্দরী দর্শনা বণিক তন্বীর দেহের নাচন আর চটুল কথার গান দর্শক উপভোগ করেছে বলেই মনে হলো। রাজ আর দেরি করেননি। সেই গান থেকেই সোজা ঢুকে গেছেন গল্পে, যেটা আগের সিনেমাগুলোতে তিনি করেননি। ছোট মির্জার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বদির সঙ্গে আইটেম গার্লকে কেন্দ্র করে বারে হাতাহাতি হয় এক অচেনা যুবকের। ভোর রাতে সেই যুবক হানা দেয় ছোট মির্জার হোটেল রুমে বদির ‘খেয়ে ফেলা’র পাত্র হতে। রাগান্বিত ছোট মির্জা তেড়ে এলে বদি, যুবক আর ছোট মির্জার মাঝে পিস্তলসহ হয়ে যায় আরেক দফা হাতাহাতি। তবে এবার ঘটে ভীষণ বিপদ। পিস্তলের গুলি লাগে এলাকার ‘গডফাদার’ মির্জা সাহেবের একমাত্র ছেলের বুকে আর পিস্তল হাতে থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তারই সহচর বদি, মাঝখান থেকে যেন ফেঁসে যায় নাম-পরিচয় না জানা অচেনা সেই যুবক। একে অন্যকে দোষারোপ করে যখন বুঝতে পারে ঘটনা যা হওয়ার হয়ে গেছে, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় লাশ গুম করার। কোনো রকমে ব্যাগে ভরা লাশ গাড়ির পেছনে রেখে দুজনে ছুটে চলে সাগরের কোলঘেঁষে। কিন্তু ঘটনাক্রমে তাদের সামনে এসে পড়ে বড় মির্জা নিজেই। বদি ওমরকে ছোট মির্জার লণ্ডনফেরত বন্ধু পরিচয় দিলে ওমরের স্থান হয় বাঘের ঘরে মানে মির্জার বাড়িতেই। ওমর আর বদি কি এই লাশ গুম করে নিজেদের বাঁচাতে পারবে, নাকি নিজেরাই ফেঁসে যাবে মির্জার রোষানলে, সেইটাই সিনেমার বাকি গল্প।
মার্ডার মিস্ট্রি জনরা কয়েক ধরনের হতে পারে হয়ে যাওয়া খুনটা কে করেছে, কেন করেছে, কীভাবে করেছে বা খুন করার পর কী হলো, এই প্রশ্নগুলো ধরে একেকটা গল্প সাজান থ্রিলার লেখকরা। এখানে চিত্রনাট্যকার সিদ্দিক আহমেদ শুরুতেই খুন দেখিয়ে দর্শককে জানিয়ে দিয়েছেন, গল্পটা হবে খুনের প্রেক্ষাপট কিংবা খুন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ ভারতের সিনেমা ‘দৃশ্যম’ ঠিক এই জনরার গল্পই বলেছে। মজার ব্যাপার হলো, সিনেমাতেও শরীফুল রাজ তার ডায়ালগে সেই সিনেমা ও যে বই থেকে সিনেমাটা বানানো তার কথা বলেছে, দর্শক সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাস দিয়ে সেটা লুফেও নিয়েছে। সিনেমার পুরো দুই ঘণ্টা গল্প এগিয়েছে বয়ে যাওয়া পানির মতো। আবার কখনো বাঁধে আটকে যাওয়া পানির মতো গল্প থমকে থেকেছে চরিত্রগুলোর থমকে যাওয়ার সঙ্গে। ‘ওমর’ নামভূমিকায় অভিনয় করা শরীফুল রাজ আর বদির চরিত্রে নাসিরউদ্দিন খান মূল কুশীলবের মতো লাশ গুম করার চিন্তা থেকেছে, দর্শককেও চিন্তায় রেখেছে। মাঝে মাঝে মির্জাবাড়ির কাজের মেয়ের রস রসিকতা গল্পে কমিক রিলিফ দিয়েছে, দর্শক প্রাণখুলে হেসেছে।
‘ওমর’-এর সংলাপ বেশ উপভোগ্য এবং ঘটনার সঙ্গে মানানসই, মেদহীন। তবে কিছু চরিত্রের অতি অভিনয় মাঝে মাঝে সংলাপে বিরক্তি ধরিয়েছে। সংলাপে যথেষ্ট গালিগালাজ ও প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী শব্দ আছে বলে বাচ্চাদের হলে নিয়ে না যাওয়াই ভালো। তবে যে শ্রেণির চরিত্রগুলো এই সংলাপ বলেছে, তাদের মুখে খারাপ না লেগে বরং হাসির খোরাক হয়েছে। ছোট মির্জার দেহরক্ষী বদি, বড় মির্জার পিএস মতি, কাজের মেয়ে ফুলির নাম কিংবা ফুলির মুখে তার বিয়ের পাত্র দেখা নিয়ে সংলাপ শুনে দর্শকের বুঝতে বাকি নেই কেন হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করা হয়েছে সিনেমার শুরুতে। ভাইরালের যুগে চিত্রনায়ক মান্নার ‘আকাশ ভরা তাঁরা’ বা অশ্লীল সংলাপ ব্যবহার এখানেও ওমরের মুখ দিয়ে মান্নাকেও স্মরণ করা হয়েছে।
পারফরম্যান্স বিবেচনায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করা শরীফুল রাজ দুর্দান্ত। এই সিনেমায় ঠিক যে টোনে কথা বলা দরকার, যে ছাঁচে নিজেকে রেখে গল্পে সাসপেন্স ধরে রাখা দরকার ছিল রাজ সেটাই করেছে। তার এন্ট্রি সিনে
দর্শকের আওয়াজ ভাবতে বাধ্য করবে রাজকে কমার্শিয়াল সিনেমায় ভালোভাবে ব্যবহারের। নাসিরউদ্দিন খান বদি চরিত্রে ঠিকঠাক, কমিক এবং সাসপেন্স বেশ ভালোভাবে দেখিয়েছেন। তবে অনেক জায়গায় তাকে রিপিটেড এবং অতি অভিনয় করতে দেখা গেছে। বড় মির্জার রোলে শহীদুজ্জামান সেলিম বেশ ভয় ধরিয়েছেন। তার স্ত্রী চরিত্রে বাস্তবের স্ত্রী রোজী সিদ্দিকীও ভালো করেছেন। এর বাইরে শিবলু মৃধা, নাফিস, আয়মন শিমলা সবাই যার যার জায়গায় ভালো করেছেন। তবে অতিথি চরিত্রে তানভীর ও ফজলুর রহমান বাবুকে আরেকটু অভিনয়ের জায়গা দেওয়া গেলে মন্দ হতো না হয়তো।
রাজু রাজের চোখ জুড়ানো সিনেমাটোগ্রাফি আর স্যাভি নাভিদদের মিউজিকের পাশাপাশি ভালো ছিল সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও। তবে এর নেগেটিভ দিকও নেহায়েত কম না। টানটান রাখতে বিরতির পরে শুরুর বিশ মিনিট খুব ধীরগতির হয়ে যায়। ভাবলে অবাক লাগে, পুলিশ মোবাইল ট্র্যাক করে একটা গাড়িকে ধাওয়া করেছে প্রায় দশ মিনিটের কাছাকাছি সময়। এ সময় বড় মির্জার মাত্রাতিরিক্ত ধূমপান চোখে লেগেছে। ফ্ল্যাশব্যাক হিসেবে যে ঘটনাটি দিয়ে ক্লাইম্যাক্সকে আবেগঘন করা হয়েছে সেটা ট্রেলারেই অনেক দর্শক যেন বুঝে গিয়েছিলেন। আরফিন রুমির ফিরে আসা প্লেব্যাক ‘রব জানে’ বের হওয়ার পরও সিনেমার গল্প অনেকটা আন্দাজ করা গিয়েছিল। সে দিক থেকে খুব বেশি রহস্য উন্মোচনের জায়গা ছিল না গল্পে। ফজলুর রহমান বাবুর মতো জাত অভিনেতাকে ভালোভাবে কাজে লাগানো হয়নি বললেই চলে। মাত্রাতিরিক্ত গালি হাসি এনে দিলেও অনেকের ভালো লাগার কথা না।
তবে সিনেমা শেষে দর্শকের ছুড়ে দেওয়া মন্তব্য আর উচ্ছ্বাস বলে দিল টিকিটের পয়সা অনেকেরই উসুল হয়েছে। ঈদের সিনেমা হিসেবে বিগবাজেট বা সচরাচর গল্পের না হলেও ‘ওমর’ রাজের সেরা নির্মাণ হয়েই থাকবে।
ওমর। কাহিনী ও পরিচালনা: মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ। চিত্রনাট্য: সিদ্দিক আহমেদ। অভিনয়: শরিফুল রাজ, দর্শনা বণিক, নাসির উদ্দিন খান, ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুজ্জামান সেলিম, রোজী সিদ্দিকী, আবু হুরায়রা তানভীর, তানজিলা হক। চিত্রগ্রহণ: রাজু রাজ। সংগীত: নাভেদ পারভেজ ও স্যাভি। প্রযোজনা: কিবরিয়া ফিল্মস। মুক্তি : ১১ এপ্রিল, ২০২৪
