মোদির মন্তব্য খোঁচা নাকি প্রচারকৌশল

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৪২ এএম

ধর্মীয় বিভেদের রাজনীতি ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচনে সম্ভবত অনেকের ধারণার চেয়েও জোরদারভাবে উঠে আসছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গত রবিবারের জনসভার বিতর্কিত ভাষণ এ আশঙ্কার পালে হাওয়া দিচ্ছে এখন। গত কয়েক বছরে দলের অন্য কিছু কিছু নেতার বেফাঁস মন্তব্য বা দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ার কিছু ঘটনা সত্ত্বেও মোটের ওপর সভা-সমাবেশে মোদি দেশের অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার সরকারের সাফল্যকেই ভাঙিয়ে আসছিলেন। তার এবারের নির্বাচনী প্রচারের মূল ফোকাসও দৃশ্যত তাই ছিল। ভোট টানতে ধর্মকে ব্যবহারের অভিযোগে ইতিমধ্যেই মামলার শিকার হলেও মোটের ওপর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘মোদি ম্যাজিকের তেলেসমাতি’ই ছিল প্রচারণার মূল সুর। স্পষ্টতই মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করে রাজস্থানের রবিবারের ভাষণ সেখান থেকে একেবারেই উল্টোদিকে মোড় নেওয়ার মতো ঘটনা।

এবারের ভোটের আগ দিয়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাসের পরপরই অবশ্য বলা হয়েছিল, আইনটি প্রণয়নের শুরুতে যেমন হিন্দুত্ববাদীদের চাঙ্গা করে দেওয়া গিয়েছিল, তেমন জিগির আবার তোলা গেলে ভোটের বাক্সে ব্যাপক লাভবান হবে বিজেপি। নির্বাচন শুরুর আগে দিয়ে এখানেই থেমে না থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটারদের পাশাপাশি শিখদেরও খুশি করতে নানা উদ্যোগ ঘোষণা করেছে মোদি সরকার। বিভিন্নভাবে চলেছে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের সমালোচনা। ভোটের জন্য ধর্মকে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে আদালতে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। এবার প্রথম দফা ভোটের পর কার্যত সরাসরি মুসলিমদের ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যা বললেন, তাকে বিদ্বেষমূলক ও অস্বাভাবিক বলেই আখ্যায়িত করেছেন বিরোধী দল ও পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ। তৃতীয় দফা বিজয়ের সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত থাকার পরও এ ধরনের কৌশল কেন নিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি তা-ও অনেকের কাছে এখন প্রশ্ন। বিষয়টি সচেতন বা পরিকল্পিত হয়ে থাকলে তার মধ্যে বড় বিপদও দেখছেন তারা।

রবিবার রাজস্থান রাজ্যের ওই সমাবেশে নরেন্দ্র মোদি প্রধান বিরোধী দল জাতীয় কংগ্রেসকে ইঙ্গিত করে দাবি করেছেন, বিরোধীরা ক্ষমতায় জিতলে জনগণের সম্পদ ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ মধ্যে বিতরণ করবে। তিনি আরও বলেছেন, যাদের সম্পদ বিলিয়ে দেওয়া হবে তাদের ‘অনেক সন্তান আছে’। ‘অনেক সন্তান থাকা’ আর ‘অনুপ্রবেশকারী’ দুটিই ভারতের রাজনীতিতে পরিচিত কথা যার লক্ষ্যবস্তু বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মুসলিমরা। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুটিই অতিরঞ্জিত ও বিতর্কিত ছাপ্পা।

কংগ্রেস দল মোদির দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, প্রথম দফার ভোটে খারাপ ফলের আভাস পেয়েই ভোট বাড়াতে বিদ্বেষ প্রচারের পথে হাঁটছে বিজেপি। হতাশা থেকেই দলটি এ পথে বলে দাবি তাদের। মুসলিমদের অনেক সন্তানের বিষয়ে মোদির ইঙ্গিতের জবাবে কংগ্রেস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদির বাবা-মাও ছয় সন্তানের জনক।

ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের মুসলিমরা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অনুসরণ করা দেশের প্রাচীনতম দল কংগ্রেসের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবেই পরিচিত। এ দলটির ভেতরেও উত্থান-পতন হলেও বিজেপির ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির মুখে কংগ্রেস অনেক মুসলিমের কাছে মন্দের ভালো বা শেষ ভরসা।

নরেন্দ্র মোদি রাজস্থানের সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে কংগ্রেস দলের ইশতেহারের প্রসঙ্গ তুলেই ওই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেসের ইশতেহারে বলা হয়েছে, তারা নারীদের ঐতিহ্যগতভাবে জমানো স্বর্ণের হিসাব নেবে এবং তা নতুন করে বিতরণ করবে। কংগ্রেস নেতাদের ‘শহুরে নকশাল’ আখ্যা দিয়ে মোদি বলেন, তারা মা-বোনদের মঙ্গলসূত্রকে পর্যন্ত ছাড়বে না। মোদি সমাবেশে অভিযোগ করে বলেন, তাদের (কংগ্রেসের) অতীতের সরকার বলেছিল, দেশের সম্পদের ওপর মুসলমানদের অধিকারই আগে। তার প্রশ্ন: ‘তারা তাহলে জনগণের কাছ থেকে সম্পদ নিয়ে অন্য কার কাছে বিতরণ করবে?... যাদের বেশি সন্তান আছে তাদের। অনুপ্রবেশকারীদের কাছে। আপনাদের কষ্টার্জিত অর্থ কি অনুপ্রবেশকারীদের দেওয়া উচিত, বলুন?’

নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সেই ২০০৬ সালের একটি বক্তৃতার কথা উল্লেখ করছিলেন। ওই বক্তৃতায় মনমোহন সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়নের কথা বলেছিলেন যাতে তারাও উন্নয়নের ফলের ভাগ পায়। অন্যদিকে এবারের ইশতেহারের ব্যাখ্যা দিয়ে সম্প্রতি হায়দরাবাদে এক সমাবেশে রাহুল গান্ধী বলেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে কোন শ্রেণির হাতে কত সম্পদ আছে তা জানতে সমীক্ষা করা হবে। এসব মিলিয়েই হয়তো রাজস্থানে ওই নির্বাচনী তোপ দাগার প্রেরণা পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।

বিরোধী নেতারা প্রধানমন্ত্রী মোদির মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে তার দলের ইশতেহারের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, এটি সব ভারতীয়র জন্য। তার ভাষায়, এ ইশতেহার সবার জন্য সমতা এবং ন্যায়বিচারের কথাই বলে। মল্লিকার্জুন খাড়গে মোদির মন্তব্যকে আতঙ্কে ভরা ‘বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মন্তব্য, এটি ভোটের প্রথম পর্বে বিজেপির চেয়ে ভালো করা বিরোধীদের থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ারই চক্রান্ত। প্রধানমন্ত্রী পদের মর্যাদার অবমাননারও অভিযোগ তোলেন খাড়গে। তিনি বলেন, ‘ভারতের ইতিহাসে আর কোনো প্রধানমন্ত্রী তার পদের মর্যাদাকে মোদিজির মতো ছোট করেননি।’

ইসলামি দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদ-উল-মুসলিমিনের প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসিও সমালোচনামুখর হয়েছেন। তিনি মোদির নির্বাচনী প্রচারণার ভাষা ধার করেই বলেন, ২০০২ সাল থেকে একমাত্র ‘মোদি গ্যারান্টি’ হচ্ছে মুসলিমদের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করে ভোট পাওয়া।’

তৃণমূল কংগ্রেস দলের সাংসদ সাকেত গোখলে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মোদির এ মন্তব্যকে ‘ঘৃণাপূর্ণ ও বিভেদমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে তার এ বক্তৃতা সম্পর্কে অভিযোগ তোলার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। মোদির নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ ও তাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে রাজস্থানে নির্বাচন কমিশনের কাছে অন্তত দুটি অভিযোগ করাও হয়েছে। আঞ্চলিক দল আজাদ অধিকার সেনা ও একটি অলাভজনক সংগঠন অভিযোগ দুটি করেছে। সাকেত গোখলের মতে, ‘মোদি বুঝে গেছেন তার গ্যারান্টির কথা কেউ আর বিশ্বাস করছেন না। তাই ঘৃণা-ভাষণ শুরু করেছেন।’

বিজেপি এবং এর সমমনা দলের অনেক নেতা প্রচার করে যাচ্ছেন, ভারতীয় মুসলমানরা এক সময় সংখ্যায় হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাওয়ার সংকল্প থেকেই বেশি বেশি সন্তান জন্ম দেন। কিন্তু বাস্তব ঘটনা এর বিপরীত। সরকারি তথ্যই বলছে, ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মুসলিমদের মধ্যেই সবচেয়ে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। গত তিন দশকে এর হার প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। এ অবস্থায় ভারতীয় রাজনৈতিক ভাষ্যকার আসিম আলি আলজাজিরাকে বলেছেন, মোদির মন্তব্য ‘ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য।... নির্বাচনী মাঠে উল্লেখযোগ্য বাঁকবদলকে চিহ্নিত করেছে এটি।...ভারতীয় রাজনীতির জন্য এটা খুবই বিপজ্জনক এক মুহূর্ত।’

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এবং সাধারণ মুসলমানরা অনেকে বলছেন, নরেন্দ্র মোদির আলোচিত মন্তব্যটি ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে। ভারতীয় সাংবাদিক এবং উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা বিষয়ক বই ‘সিটি অন ফায়ার’-এর লেখক জেয়াদ মাসরুর খান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হয়তো কংগ্রেসকে নিছক খোঁচা মেরেই কথাগুলো বলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি ভারতের মুসলমানদের সম্পর্কে একটি গতানুগতিক ধারণাকে পাকাপোক্ত করবে। ধারণাটি হচ্ছে মুসলিমরা ভারতের জন্য সম্পদ নয়, বরং সমস্যা। জেয়াদ মাসরুর খানের দাবি, নির্বাচনী প্রচারণার ধরনের এই পরিবর্তন ‘মোদির প্রকৃত চরিত্রই প্রকাশ করেছে’।

তবে নয়াদিল্লির সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ (সিএসডিএস) গবেষণা কর্মসূচির জাতীয় সমন্বয়কারী সন্দীপ শাস্ত্রী আলজাজিরাকে বলেছেন, তার প্রত্যাশা মোদির ওই বক্তব্য নেহাতই একটি আলগা মন্তব্য। প্রচার কৌশলে সচেতন পরিবর্তন নয়। কারণ তার মতে, জনমত জরিপে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে থাকা মোদির এমনটি করার কথা নয়। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে কথাগুলো তার ভালো লাগেনি। সন্দীপ শাস্ত্রী বলেছেন, ‘বক্তৃতা থেকে যে আভাস পাওয়া যায় মোদির অভিপ্রায়ও যদি সত্যিই তা-ই হয় তাহলে এটি বড় শঙ্কার বিষয়।’

বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র জাফর ইসলাম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অনুপ্রবেশকারী বলতে মোদি ভারতে থাকা অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। ভারতীয় নাগরিক মুসলমানদের নয়। বিজেপির দাবি, তারা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য করে না এবং সব নাগরিকের সঙ্গে সমান আচরণ করে। তবে বিভিন্ন গবেষণা, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মূল্যায়ন হচ্ছে, দেশটিতে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন বেড়েছে। রাজস্থানে ভোট টানতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি যে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করলেন তা তাদের ঘোষিত নীতিকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ভারতে মুসলিমের সংখ্যা ২০ কোটির ওপরে যা বহু দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। ইতিমধ্যেই নানা উদ্বেগে থাকা এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য নতুন শঙ্কায় ফেলতে পারে। মোদি ও তার দল কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া সামলান সেটাই দেখার।

লেখক: সাংবাদিক, দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত