কোনো মামলারই বিচার শেষ হয়নি

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:১১ এএম

১১ বছর পার হচ্ছে ‘রানা প্লাজা’ ট্র্যাজেডির। বিশ^কে নাড়িয়ে দেওয়া মর্মস্পর্শী ওই ঘটনায় করা চারটি মামলার একটিও বিচারিক আদালতের গন্ডি পেরোয়নি। ১ হাজার ১৩৬ জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় করা হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। অন্যদিকে ভবন মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাসহ ওই ভবন নির্মাণে দুর্নীতি ও ইমরাত নির্মাণ আইনের তিনটি মামলা রয়েছে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে। তবে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে ইমরাত আইনের মামলাটির বিচার কার্যক্রম থমকে আছে প্রায় আট বছর ধরে।

৫৯৪ জন সাক্ষীর হত্যা মামলায় সবশেষ গত ২১ এপ্রিল ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন ৮০ জনের বেশি সাক্ষী। আসামিদের সাক্ষ্য শেষে আরও অন্তত তিন ধাপ আইনি প্রক্রিয়া (সাফাই সাক্ষ্য, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্কের শুনানি) শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসবে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে মামলা নিষ্পত্তি হবে, সে সম্ভাবনার কথাও শোনাতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। এমন পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন ওই ঘটনায় ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষ্য, একে তো ঘটনার পর থেকে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। এখন বিচার পেতেও বছরের পর বছর বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি পিছু ছাড়ছে না।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটনার পর ওই ভবনের মালিক সাভার যুবলীগের সহসভাপতি (পরে বহিষ্কৃত) সোহেল রানা, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রেফাতউল্লাহসহ কয়েকজনকে আসামি করে সাভার থানায় হত্যা মামলা হয়। ঘটনার পাঁচ দিন পর ভারতের উদ্দেশে পালিয়ে যাওয়া রানাকে যশোরের বেনাপোল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের এপ্রিলে দেওয়া অভিযোগপত্রে আসামি করা হয় ৪১ জনকে। এতে সাক্ষী করা হয় ৫৯৪ জনকে। আসামিদের মধ্যে শুধু প্রধান আসামি সোহেল রানা কারাগারে আছেন। অন্যদের মধ্যে ২০২০ সালের ৪ জুন রানার বাবা আবদুল খালেক মারা যান। আরও দুজন মারা যান বিভিন্ন সময়ে। ফলে এ মামলার আসামি এখন ৩৮ জন। এর মধ্যে সাতজন এখনো পলাতক। জামিনে আছেন ৩০ জন আসামি।

২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু ও সাক্ষ্যগ্রহণের আদেশ দেয়। আসামিদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া ঘটনার পর আসামি রানাকে পালাতে সহযোগিতা করার অভিযোগে তার তিনজনের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ২১২ ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগ গঠন চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে কয়েকজন আসামির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে ১০ আসামির ক্ষেত্রে বিচার কার্যক্রম স্থগিতাদেশ ও এমন পরিস্থিতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ হবে কি না, এমন আইনি প্রশ্নে পেরিয়ে যায় ছয় বছরের বেশি সময়। ২০২২ এর ৩১ জানুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। চলতি বছর ১৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রানার জামিন স্থগিতের আদেশে এ মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। এরপর মামলার বিচারকাজে গতি আসে।

ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শেখ হেমায়েত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষীদের বেশিরভাগ ঢাকার বাইরে থেকে আসেন এবং তারা দরিদ্র। সরকারিভাবে তাদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। এখন সব সাক্ষীকে হাজির করা কঠিন হলেও আমরা চেষ্টা করছি। যৌক্তিক সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসবে বলে আশা করি।’

আসামি রানার আইনজীবী ফারুক আহাম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষ্য শেষে আমরা সাফাই সাক্ষ্য দেব। এরপর আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শেষে হবে যুক্তিতর্ক। আমরা যেহেতু আসামিপক্ষ তাই আমরা আমাদের যুক্তি তুলে ধরব।’

বিচার পেতেও দুর্দশায় ভুক্তভোগীরা: গত রবিবার হত্যা মামলার শুনানির ধার্য দিনে অন্তত তিনজন সাক্ষীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের একজন মিনু আক্তার (৩৫)। সাক্ষ্য দিতে আগের দিন তিনি এসেছেন যশোরের খাজরুবাজার থেকে। সঙ্গে স্বামী কামরুল ইসলাম ও সাড়ে তিন বছর বয়সী কন্যা শিশু। প্রচন্ড গরম, ক্লান্তি আর অনভ্যস্ত পরিবেশে তারা অবসাদে নুইয়ে পড়ছিলেন। আলাপকালে মিনু জানান, ঘটনার সময় ওই ভবনের একটি গার্মেন্টে সুইং অপারেটরের কাজ করতেন। ছয় দিন পর তাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনা হয়। ঘটনার ভয়াবহতা এখনো তাড়া করে ফেরে তাকে। এখন গ্রামের বাড়িতে একটি সেলাইয়ের কাজ করে কিছু উপার্জন করেন। স্বামী কামরুল করেন কৃষিকাজ। এ দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। কামরুল বলেন, স্ত্রী মিনু ঘুমের ঘোরে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন। মানসিক সমস্যা থাকলেও অর্থাভাবে সেই চিকিৎসাও এখন বন্ধ। মামলায় সাক্ষ্য দিতে সমন পেয়ে তড়িঘড়ি করে আসেন ঢাকায়।

মামলার অন্য সাক্ষী দয়াল সূত্রধর (৩৮)। তিনি এসেছেন মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের চক মিরপুর থেকে। রানা প্লাজা ভবন ধসে তিনি হারিয়েছেন স্ত্রী রীতা সূত্রধরকে। ঘটনার ১৩ দিন পর রীতার লাশ মেলে। মেয়ে দোলা সূত্রধর এখন পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে। পেশায় সিএনজিচালক দয়াল বলেন, ‘স্ত্রী হারিয়েছি। বিচার চাইতে এসেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করছি।’

সাক্ষ্য দিতে আসা ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের রঘুনাথপুর গ্রাম থেকে গত রবিবার ভোরে ঢাকায় আসেন লুৎফা বেগম (৪৫)। আলাপকালে বলেন, ঘটনার সময় তিনি ওই ভবনের একটি ফ্লোরে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। মাথায় ও কানে আঘাত পেয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে। এখনো কানে কম শোনেন। তিনি জানান, এর আগেও একবার সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। কিন্তু সাক্ষ্য না হওয়ায় বাড়ি ফিরে যান। এরপর আবার সমন পান সাক্ষ্য দিতে। ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় শুধু বাসে আসতে-যেতে ভাড়া গুনতে হয় ২ হাজার ৪০০ টাকা। তিনি বলেন, সাক্ষ্য দিতে এসে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু এজন্য তাদের কোনো আর্থিক সহায়তা নেই। এমনকি দিনভর ক্ষুধা মেটাতে হয়েছে বিস্কুট ও পাউরুটি খেয়ে।

ইমারত আইনের মামলা থমকে আছে : ভবন ধসের পর রাজউকের করা ইমারত আইনের মামলায় রানাসহ ১৮ জনকে আসামি করে ২০১৫ সালের এপ্রিলে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। ২০১৬-এর ১৪ জুন অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ আসে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্যমতে, অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে ওই বছর কয়েকজন আসামির আবেদনের পর মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ আসে হাইকোর্ট থেকে। এরপর থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ থমকে আছে।

আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আনোয়ারুল কবির বাবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছরের নভেম্বরে জেলা ও দায়রা আদালত থেকে এ মামলার নথি তলব করা হয়। এরপর নথি ওই আদালতে পাঠানো হয়। মামলাটি এখন সেই অবস্থাতেই আছে। স্থগিতাদেশ থাকায় একজনের সাক্ষ্যগ্রহণও সম্ভব হয়নি।’

দুর্নীতির মামলা আছে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে : রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের করা মামলায় ভবন মালিক রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই অভিযোগ দেওয়া হয় আদালতে। মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে পাঠানো হলেও অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে নথিপত্রে কিছু অসংগতি থাকায় ২০১৬ সালের ৬ মার্চ পুনঃতদন্তের আদেশ দেন আদালত। এরপর ২০১৭ সালের ২১ মে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে রানাসহ ১২ জনের বিচার শুরু হয়। এ মামলায় সাক্ষ্য শেষ পর্যায়ে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। অন্যদিকে রানার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর সাভার মডেল থানায় মামলা করে দুদক। এতে তার বিরুদ্ধে ২ কোটি ৫৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি বিচারাধীন আছে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে। ৩৭ সাক্ষীর এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ পর্যায়ে আছে। দুটি মামলায় ২৮ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য আছে। দুর্নীতির দুই মামলার বিষয়ে দুদকের কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া দেননি।

নিহতের স্মরণে আলোচনা সভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী : সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১১ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিহতের স্মরণে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা হয়েছে। গতকাল সকালে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির উদ্যোগে দোষীদের শাস্তি ও সম্মানজন ক্ষতিপূরণের দাবিতে ‘রানা প্লাজা হত্যাকান্ডের ১১ বছর : হাজারো প্রাণ ও স্বপ্নের গল্প’ নিয়ে এ আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা হয়।

প্রদর্শনীতে আলোকচিত্রী ও গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার, আলোকচিত্রী এন্ড্রু বিরাজ, রাহুল তালুকদার ও শুভ্রকান্তি দাসের ছবি এবং পোশাক শ্রমিকদের সন্তানদের মধ্যে সাতজন আঁকিয়ে চিত্রকর্ম এবং জীবিত থাকা অবস্থায় স্টুডিওতে ২০ জন শ্রমিকের তোলা ছবি স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া নিহত ও আহত পরিবারের কাছ থেকে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সংগৃহীত ছবি স্থান পায়, যার বেশিরভাগ ছবি শ্রমিকরা স্টুডিওতে গিয়ে তুলেছিলেন।

হাজারো শ্রমিকের মৃত্যুর প্রতিবাদে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ভবনের ভেতরে দুদিন আটকে থাকা আহত শ্রমিক জেসমিন। তিনি বলেন, ‘ভবন ধসের পর এমনভাবে দুদিন ভেতরে আটকা ছিলাম, বাঁচার কোনো আশা ছিল না। একজন অচেনা মানুষ আমাকে আগলে রেখে বাঁচিয়েছিল। তখন কে পুরুষ, কে নারী, কে হিন্দু, কে মুসলমান তা ভাবার সুযোগ ছিল না। বাঁচার চরম ইচ্ছা এবং সন্তানকে দেখার ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছু তখন মাথায় আসেনি। কিন্তু আজ ১১ বছর ধরে সেই দুঃসহ স্মৃতির ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি মনে এবং শরীরে। অথচ এখনো দোষীদের শাস্তি হয়নি। দোষীদের শাস্তি হলে আমরা মরেও একটু শান্তি পেতাম।’

গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার ও অন্যরা বলেন, ১১ বছরেও ১ হাজার ১৭৫ জন প্রাণ হত্যার বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়নি। কারখানার ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া অন্যান্য মালিক, সরকারি কর্মকর্তারা জামিনে আছেন। সোহেল রানাও গত বছর জামিন পায়। পরে তার জামিন উচ্চ আদালত স্থগিত করে। বিচারের এই ধীরগতি সরকার ও রাষ্ট্রের মালিকপক্ষ ও দোষীদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের এবং তাদের বাঁচিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টারই শামিল বলে অভিহিত করেন বক্তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত