বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদকের বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:১৪ এএম

অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের মামলায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের ১০৩ কোটি ৪১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদারসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কমিশন সভায় এ চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়।

দুদকের তথ্যমতে, বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৪২ কোটি টাকার বৈধ উৎস না পেয়ে ২০২০ সালের ৩০ জুলাই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। সংস্থাটির উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী এইচএসবিসি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে ৪২ কোটি টাকা জমা রেখেছেন। যার বৈধ কোনো উৎস নেই। এ টাকা তিনি প্রতারণার মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্র সৃষ্টি করে অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্জন করেছেন মর্মে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে। তৌফিক ইমরোজ এসব অস্থাবর সম্পদ অসাধু উপায়ে অর্জন করেছেন, যা তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সহিত অসংগতিপূর্ণ।

জানা গেছে, মামলার বাদী গুলশান আনোয়ার প্রধানকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তিনি দীর্ঘ তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিতে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেন। কমিশন প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেয়।

দুদকের তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, বিডিনিউজ প্রধান সম্পাদকের এইচএসবিসি, ইস্টার্ন ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে ৪৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭৬ হাজার ৪৬৭ টাকা জমা থাকার রেকর্ড জব্দ করে দুদক। ওই অর্থ ব্যাংক হিসাবে ফ্রিজ অবস্থায় আছে, যার বৈধ কোনো উৎস নেই। তৌফিক ইমরোজ খালিদী ওই অস্থাবর সম্পদ তার দখলে থাকায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২), ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় দুদক চার্র্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেয়।

দুদকের তথ্যমতে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২০১৯ সালের অক্টোবরে এলআর গ্লোবাল (এলআরজি) নামের অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ পাওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপরই অনুসন্ধানে নামে দুদক। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর খালিদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এলআর গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির সিইও রিয়াজ ইসলামকে। একই বছরের ডিসেম্বরে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত বিডিনিউজের ৯টি ও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নিজ নামে ১৩টি স্থায়ী আমানতের ৪২ কোটি টাকা অবরুদ্ধ করার আদেশ দেয়।

পি কে হালদারসহ ২৩ জনের নামে দুদকের চার্জশিট : ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের ১০৩ কোটি ৪১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদারসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

দুদকের তথ্যমতে, কাগুজে প্রতিষ্ঠান আনান কেমিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমিতাভ অধিকারী ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল ইসলামের কাছে ২৯ কোটি টাকা ঋণের জন্য আবেদন করেন। আবেদনের পর কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই ২৫ অক্টোবর ২৩২তম বোর্ডসভায় ঋণ মঞ্জুর করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে আনান কেমিক্যালের নামে ৬৩ কোটি ৪১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকা উত্তোলন করে, যা ২০২২ সালে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সুদাসলে ১০৩ কোটি ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৭১৯ টাকায় দাঁড়ায়।

দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনান কেমিক্যালের নামে যে টাকা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে নেওয়া হয়েছে সেটি আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় পি কে হালদারসহ ২৩ জনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের কর্মকর্তারা অসৎ উদ্দেশ্যে আনান কেমিক্যালের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেন। জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া কোম্পানি চালু করে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের অর্থ স্থানান্তর, রূপান্তরের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়।

যাদের চার্জশিটে আসামি করা হয় তারা হলেন পি কে হালদার, আনান কেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমিতাভ অধিকারী, পরিচালক প্রিতিশ কুমার হালদার, উজ্জ্বল কুমার নন্দী, পূর্ণিমা হালদার, রাজিব সোম, রতন কুমার বিশ্বাস, ওমর শরীফ; ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক, সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবেদ হাসান, পরিচালক মো. নুরুল আলম, নাসিম আনোয়ার, মো. নুরুজ্জামান, এমএ হাশেম, মোহাম্মদ আবুল হাশেম, জহিরুল আলম, মো. আনোয়ারুল কবীর, মো. নওশেরুল ইসলাম, বাসুদেব ব্যানার্জি, ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহিদা রুনাই, অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আল মামুন সোহাগ, সিনিয়র ম্যানেজার রাফসান রিয়াদ চৌধুরী ও কোম্পানি সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খান।

দুদকের তথ্যমতে, এর আগে ২০২১ সালে পাঁচটি ভুয়া ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৫১ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে তা আত্মসাতের অভিযোগে পি কে হালদারসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠান আনান কেমিক্যাল লিমিটেডের নামে ৭০ কোটি ৮২ লাখ টাকা ঋণ তুলে নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে দুদক। গ্রেপ্তারের পর ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি রাশেদুল হক, ভারপ্রাপ্ত এমডি সৈয়দ আবেদ হাসান ও সিনিয়র ম্যানেজার রাফসান রিয়াদ চৌধুরীকে রিমান্ডে নেয় দুদক। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের আদালতে তোলা হলে ১৬৪ ধারায় নিজেকে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।

জানা গেছে, অর্থ পাচারের মামলায় পি কে হালদারকে ২০২৩ সালে ২২ বছরের সাজা দেয় আদালত। ২০২২ সালে ১৪ জুন পি কে হালদারকে তার চার সহযোগীসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে গ্রেপ্তার করে দেশটির অর্থসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। বর্তমানে পি কে হালদার ভারতে কারাগারে আটক আছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত