শুরু হচ্ছে ‘জোড়াতালি’র লিগ

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৩৩ এএম

এটাকে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আয়োজিত লিগ না বলে বলা যেতে পারে মাহফুজা আক্তার কিরণ আয়োজিত ‘জোড়াতালি’র নারী লিগ। এই লিগ আয়োজনে অন্য কারও কোনো কথা চলে না। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রভাবশালী এই নারী কর্মকর্তা যা চাইবেন, যেভাবে চাইবেন, যাদের খেলাতে চাইবেন, সেভাবেই হবে। এ নিয়ে টু শব্দ করা চলবে না। করলেই নাম কাটা যাবে গুড বুক থেকে। এই সংগঠককে যে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে রেখেছেন খোদ বাফুফে বস কাজী সালাউদ্দিন।

বাফুফে প্রধানের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাফুফের অভ্যন্তরে আরেকটি স্বাধীন প্রশাসন গড়ে তুলেছেন কিরণ। নারী ফুটবল সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হয়ে নিজ মর্জিতে করেন সবকিছু। এখানে অন্য কারও খবরদারি চলে না। কিরণ নিয়মিত নারী লিগ আয়োজন করেন না। বিরতি দিয়ে করলেও তাতে খেলিয়ে দেন সব অনামি-অখ্যাত দলকে। বাফুফের শীর্ষ কর্তার নেক নজরে আছেন বলেই নারী ফুটবল পায় সর্বাধিক গুরুত্ব। তাই তো বাইরের সহায়তা এলে সেটা পুরুষ ফুটবলের আগে ব্যবহার করা হয় নারী ফুটবলে। জাপানের সহায়তায় জেএফএ কাপ বয়সভিত্তিক আসর আয়োজন নিয়ে রয়েছে অনেক অভিযোগ। কোনো নজরদারি থাকে না, যেনতেনভাবে একটা টুর্নামেন্ট আয়োজন করে বড় একটা বাজেট হালাল করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কিরণ নেতৃত্বাধীন বাফুফের নারী ফুটবল কমিটির বিরুদ্ধে। এর মাঝে শুক্রবার কিরণ জানান দিলেন আজ থেকে তিনি শুরু করতে যাচ্ছেন নারী ফুটবল লিগ; যেখানে দেশের স্বীকৃতি ক্লাবগুলোর একটিও নেই।

আগের তিন লিগে বসুন্ধরা কিংস ছিল। বড় বাজেটের দল গড়ে তারাই হয়েছিল হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন। এবার তারাও নেই। বাফুফে ও নারী কমিটির নানা অসংগতি দেখে ক্লাব লাইসেন্সিংই করেনি বসুন্ধরা কিংস। তাদের অভিযোগ, গতবার সরাসরি বাফুফের অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে লিগে অংশ নিয়েছে রানার্সআপ আতাউর রহমান ভূঁইয়া কলেজ স্পোর্টিং ক্লাব। বাফুফের নারী ক্যাম্পের কোচরাও নানাভাবে কোচিং করিয়েছেন সেই দলটিকে। ডাগআউটে না থাকলেও বাইরে থেকে বাফুফের তৎকালীন বিদেশি টেকনিক্যাল ডিরেক্টরকে দেখা গেছে সেই দলটিকে দিক নির্দেশনা দিতে। এ নিয়ে বারবার কথা বলেও প্রতিকার মেলেনি, তাই এবার সরে দাঁড়িয়েছে বড় বাজেটের বসুন্ধরা কিংস। তাতে বড় ক্ষতিটা হয়েছে নারী ফুটবলারদেরই। শেষ তিন লিগে যারা কিংস থেকে পেয়েছিলেন লোভনীয় চুক্তি, তাদের এবার একটা সময় পর্যন্ত খেলাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। বড় নাম, বড় বড় চুক্তি এসব চিন্তা করে অনেকেই সাবিনা খাতুন, সানজিদা, মারিয়া মান্ডা, কৃষ্ণারানী, রূপনা চাকমাদের দলে নিতে চায়নি অনামি দলগুলো। পরে অবশ্য বাফুফের থেকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়ে নাসরিন স্পোর্টস একাডেমি দলে নিয়েছে ১৫ জন তারকা ফুটবলার। তাতে শূন্য থেকে একেবারে লিগ ফেভারিট বনে গেছে নাসরিন একাডেমি।

কিংস খেলছে না। তাদের খেলানোর চেষ্টাও সেভাবে করা হয়নি কিরণের পক্ষ থেকে। আবার বাফুফের সব পর্যায়ের লিগের পৃষ্ঠপোষকতা করা বসুন্ধরা গ্রুপ যখন নারী লিগ থেকে স্পন্সর সরিয়ে নিল, তখন হুঁশ হয়েছে এই কর্মকর্তার। সিদ্ধান্ত বদলের জন্য বাফুফে চিঠি দিয়েছে বসুন্ধরাকে। তাতে অবশ্য ফল হয়নি। বসুন্ধরা গ্রুপ এবার নিজেদের সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছে। পরে অবশ্য নামকায়াস্তে একটা স্পন্সর জোগাড় করেছে বাফুফে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ‘উপায়’ অর্থসহায়তা দিতে রাজি হয়েছে শেষ মুহূর্তে। স্পন্সরশিপ বাবদ প্রতিষ্ঠানটি কত টাকা বাফুফেকে দেবে, সেটা প্রকাশ করেনি কোনো পক্ষই। কেবল জানা গেছে, লিগে অংশগ্রহণকারী নয় দলকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া চ্যাম্পিয়ন দল ৫ লাখ ও রানার্সআপ দল পাবে ৩ লাখ টাকা। স্বীকৃত ক্লাবগুলোকে কেন নারী ফুটবলমুখী করা গেল না এত বছরে। এই প্রশ্নে কিরণের একটা উত্তর প্রস্তুত থাকে, ‘তাদের অনেক অনুরোধ করেও আনা যায়নি। তাদের তো আর জোর করা যাবে না।’

এদিকে লিগটা যে জোড়াতালির তা শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনেই প্রকাশিত হয়েছে। দেশে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। এর মধ্যেই লিগটা কিরণ আয়োজন করতে যাচ্ছেন দিনের আলোয় প্রখর রোদের মধ্যে। আবহাওয়া অফিসের জারি করা হিট ওয়েভের মধ্যে কমলাপুর স্টেডিয়ামের তপ্ত টার্ফে খেলতে হবে মেয়েদের। প্রতিদিন দুটি ম্যাচ রাখা হয়েছে সকাল সাড়ে ৯টা ও বিকেল পৌনে ৪টায়। অথচ কমলাপুর স্টেডিয়ামে আছে কৃত্রিম আলোর সুবিধা। সেটা বাফুফে ব্যবহার করতে পারছে না বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার টাকা নেই বলে! এমনটাই দাবি করেছেন কিরণ, ‘ফ্লাডলাইটে খেলা চালাতে হলে বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে। আমাদের টাকা নেই। খুব কষ্ট করে আমরা স্পন্সর এনে খেলার আয়োজন করি।’ অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফ্লাডলাইটে নারী লিগ আয়োজনে বাফুফেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ গুনতে হতো ৩ লাখ টাকার মতো। এক বড় একটা ফেডারেশন সেই দায়িত্বটা না নিয়ে নারী ফুটবলারদের বাধ্য করছে তীব্র গরমের মধ্যে খেলতে।

এদিকে বসুন্ধরা না থাকায় গত তিন লিগের রানার্সআপ আতাউর রহমান ভূঁইয়া কলেজ স্পোর্টিং ক্লাবকেই ধরা হয়েছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। তবে শেষ মুহূর্তে কিরণের পরোক্ষ সহায়তায় নাসরিন জাতীয় দলের তারকাদের দলে নিয়ে গড়েছে সেরা দল। এই দুই দল ছাড়াও এবার অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ আর্মি স্পোর্টিং ক্লাব। যার কোচের দায়িত্বে আছেন নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রায় অগ্রণী ভূমিকা রাখা কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। এ ছাড়া পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জ এবার অংশ নিচ্ছে এই লিগে। এর বাইরে অন্য দলগুলো হলো সিরাজ স্মৃতি সংঘ, উত্তরা ফুটবল ক্লাব, জামালপুর কাচারীপাড়া একাদশ, ঢাকা রেঞ্জার্স ও সদ্য পুষ্করণী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত