ফজরের নামাজ মানুষকে প্রফুল্ল রাখে

আপডেট : ০৩ মে ২০২৪, ০৩:০০ এএম

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজর ও এশার নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, তুলনামূলকভাবে এ দুই ওয়াক্তের নামাজ আদায় করা কষ্টকর। যারা এ কষ্টের নামাজে অভ্যস্ত হবে, তাদের জন্য অন্য ওয়াক্তের নামাজ আদায় করাও সহজ হবে। কোরআন ও হাদিসে এ নামাজের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে ফজরের নামাজ। আল্লাহতায়ালা ফজর নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, ‘নামাজ কায়েম করো সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত এবং কায়েম করো ফজরের নামাজ। নিশ্চয় ফজরের নামাজ পরিলক্ষিত হয় বিশেষভাবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৭৮)

ফজর নামাজে উপস্থিত হওয়ার প্রতি উৎসাহ ও জোর তাগিদ দিয়ে নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘আজানে ও প্রথম কাতারে কী (ফজিলত) রয়েছে, তা যদি লোকেরা জানত, লটারির মাধ্যমে বাছাই করা ছাড়া এ সুযোগ লাভ করা যদি সম্ভব না হতো, তাহলে অবশ্যই তারা লটারির মাধ্যমে ফয়সালা করত। জোহরের নামাজ প্রথম ওয়াক্তে আদায় করার মধ্যে কী (ফজিলত) রয়েছে, যদি তারা জানত; তাহলে তারা এর জন্য প্রতিযোগিতা করত। আর এশা ও ফজরের নামাজ (জামাতে) আদায়ের কী ফজিলত রয়েছে, তা যদি তারা জানত, তাহলে নিঃসন্দেহে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা হাজির হতো।’ (সহিহ বুখারি ৬১৫)

ফজরের নামাজের গুরুত্ব অন্যান্য নামাজের ওপর যেমন, ফজরের সুন্নতের গুরুত্বও অন্যান্য সুন্নতের ওপর তেমন। ফজিলতের ক্ষেত্রে ফজরের সুন্নত সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে, অন্য সুন্নতের ব্যাপারে এমন ফজিলত বর্ণিত হয়নি। তাই ফজরের সুন্নতে রয়েছে অধিক গুরুত্ব। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘ফজরের দুই রাকাত (সুন্নত) নামাজ দুনিয়া ও তার সবকিছু থেকে উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম ৭২৫)

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর অথবা মুকিম অবস্থায় কখনোই তা ছাড়তেন না। ফরজ নামাজের ব্যাপারে যেমন সতর্ক থাকতেন, তেমনি ফজরের সুন্নতের ব্যাপারেও থাকতেন সর্বোচ্চ সতর্ক। যা হজরত আয়েশা (রা.) কর্র্তৃক বর্ণিত হাদিসে ফুটে উঠেছে, নবীজি (সা.) ফজরের (ফরজ নামাজের) আগে দুই রাকাত সুন্নত আদায়ের প্রতি যত কঠোরভাবে খেয়াল রাখতেন, অন্য কোনো নফল নামাজের প্রতি ততটা রাখতেন না। (সহিহ মুসলিম ৭২৪)

ফজরের নামাজের গুরুত্বের কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ফজরের সময় দিনরাতের ফেরেশতাদের পালাবদল হয়। তবে ফজরের নামাজে উভয় দল একত্র হয়। এরপর দুনিয়াতে এক দল থেকে যায়, আরেক দল আল্লাহর কাছে উপস্থিত হয়। আর এ সময় বান্দা যা কিছু করে, ফেরেশতারা তা আল্লাহর কাছে পেশ করে। তাই এ সময়ের নামাজ, ইবাদত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফেরেশতারা পালাবদল করে তোমাদের মধ্যে আগমন করে। এক দল দিনে, এক দল রাতে। আসর ও ফজরের নামাজে উভয় দল একত্র হয়। অতঃপর তোমাদের মধ্যে রাতযাপনকারী দলটি উঠে যান। তখন তাদের প্রতিপালক তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আমার বান্দাদের কোন অবস্থায় রেখে এলে? অবশ্য তিনি নিজেই তাদের ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত। উত্তরে তারা বলেন, আমরা তাদের নামাজে রেখে এসেছি। আর আমরা যখন তাদের কাছে গিয়েছিলাম, তখনো তারা নামাজ আদায়রত অবস্থায় ছিল।’ (সহিহ বুখারি ৫৫৫)

সুতরাং এই সময়ে যে ব্যক্তি কষ্ট করে ঘুম থেকে জাগ্রত হয় এবং নামাজের জন্য অন্ধকারে মসজিদে গমন করে, তাকে কেয়ামতের দিন পূর্ণ নুরের মাধ্যমে এর প্রতিদান দেওয়া হবে। হজরত বুরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যারা অন্ধকার রাতে মসজিদে হাজির হয়ে জামাতে নামাজ আদায় করে, তাদের কিয়ামতের দিনের পরিপূর্ণ নুরের সুসংবাদ দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ ৫৬১)

অসংখ্য হাদিসে বলা হয়েছে, নামাজ মানুষকে অন্যায়-অবিচার থেকে দূরে রাখে। নেক আমলসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম আমল নামাজ। যে ব্যক্তি ঠিকভাবে নামাজ আদায় করে নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে হেফাজত করে, আল্লাহতায়ালাও তাকে জাহান্নাম থেকে হেফাজত করেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এমন কোনো ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে না, যে সূর্যোদয়ের আগের এবং সূর্যাস্তের আগের নামাজ অর্থাৎ ফজর ও আসরের নামাজ আদায় করে।’ (সহিহ মুসলিম ৬৩৪)

বস্তুত মুমিনের জন্য আল্লাহর ইবাদত করা সহজ। কিন্তু মুনাফিকের জন্য খুবই কষ্টকর। মুনাফিকরা সুযোগ সন্ধানী। লোকচক্ষুর আড়ালে ইবাদতে ফাঁকি দেয়। এশা ও ফজরের নামাজ তাদের জন্য খুব কষ্টকর। কেননা, এ সময় মানুষ অন্ধকারে দেখতে পায় না বলে তারা নামাজে খুব অলসতা করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মুনাফিকদের জন্য ফজর ও এশার নামাজ অপেক্ষা অধিক ভারী নামাজ আর নেই।’ (সহিহ বুখারি ৬৫৭)

বলা হয়েছে, যে ব্যক্তির সকাল শুরু হয় আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে সে সফলকাম। এর অর্থ, দিনের শুরুতেই সে শয়তানকে পরাস্ত করে দিয়েছে। শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছে। এভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মাধ্যমে দিনের শেষ পর্যন্ত শয়তানের প্রভাব থেকে তার জন্য দূরে থাকা সহজ হয়। তার দিন কাটে হাসিখুশি ও প্রফুল্লতায়। অন্যথায় যার সকাল শুরু হয় আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে, সে দিনের শুরুতেই শয়তানের কাছে পরাজয় বরণ করে নেয়। দিনের শেষ পর্যন্ত শয়তান তাকে সহজেই কাবু করতে সক্ষম হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন শয়তান তার ঘাড়ের পেছনের অংশে তিনটি গিঁট দেয়। প্রতি গিঁটে সে এ বলে চাপড়ায়, তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত। অতএব, তুমি শুয়ে থাকো। অতঃপর যদি সে জাগ্রত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, একটি গিঁট খুলে যায়। এরপর অজু করলে, আরেকটি গিঁট খুলে যায়। অতঃপর নামাজ আদায় করলে, আরেকটি গিঁট খুলে যায়। তখন তার প্রভাত হয় উৎফুল্ল মনে।

অন্যথায় সে সকালে ওঠে কলুষ-কালিমা ও আলস্যে।’ (সহিহ বুখারি ১১৪২)

লেখক : প্রিন্সিপাল পদুয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, ফেনী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত