ইসরায়েলের গাজা হামলার জেরে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে গত ছয় মাস ধরে জার্মানিসহ পশ্চিমা বিশ্বে বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চলছে। এর অংশ হিসেবে গত ১২ এপ্রিল বার্লিনে আয়োজিত একটি সম্মেলন পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়ে যায়। জার্মান পুলিশ প্যালেস্টাইন কংগ্রেস-এর ওই সম্মেলনের ভেন্যুতে চড়াও হয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও মাইক্রোফোন বাজেয়াপ্ত করে। তারা অংশগ্রহণকারীদের কয়েকজনকে আটকও করে। শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়ে যায়। রাজনৈতিক দল ডিইইএম ২৫ এবং নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে মিলে ‘জুইশ ভয়েস ফর পিস’ এর আয়োজন করেছিল।
এখানেই শেষ নয়, জার্মানির পুলিশ কর্র্তৃপক্ষ এই সম্মেলনের তিন মূল বক্তা ইয়ানিস ভারোফাকিস, ঘাসান আবু-সিত্তা এবং সালমান আবু-সিত্তার বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ওপর অভূতপূর্ব নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল আন্দোলনের এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর গ্রিসের সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারোফাকিস জার্মানিতে ফিলিস্তিন সম্পর্কে কথা বলতে পারবেন না। এমনকি জুম কলের মাধ্যমেও না।
এই ঘটনাটি এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আজকাল জার্মানিতে ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং গাজায় তাদের আচরণের যে কোনো সমালোচনাকে ইহুদি-বিদ্বেষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ ইহুদি-বিদ্বেষের প্রমাণিত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি নীতিকে সমর্থন করার কারণে উগ্র ডানপন্থি ব্যক্তিরা সম্প্রতি গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশে বাকস্বাধীনতার একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে।
বৈপরীত্যটা খুবই প্রকট। ডানপন্থি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের ইসরায়েলপন্থি রাজনীতিবিদরা (যাদের মধ্যে এমনকি নাৎসি সেøাগান ব্যবহার করার জন্য বিচারাধীনরাও আছেন) ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে ‘ইহুদি-বিদ্বেষ’ মোকাবিলার নামে ইচ্ছামতো কথা বলতে পারবেন। কিন্তু ফিলিস্তিনি সার্জন এবং যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর ঘাসান আবু-সিত্তাহ জার্মান জনসাধারণকে তার অভিজ্ঞতা জানাতে পারবেন না। ঘাসান আবু-সিত্তাহ সাম্প্রতিককালে গাজার হাসপাতালে কাজ করেছেন। ফিলিস্তিনি ছিটমহলটিতে ইসরায়েলি হামলার সময় অনেক যুদ্ধাপরাধের ঘটনার সাক্ষী তিনি।
বার্লিনে ‘প্যালেস্টাইন কংগ্রেস’-এর বিরুদ্ধে অভিযানটি এ ধরনের ক্রমবর্ধমান ঘটনারই এক নজির মাত্র। নিরাপত্তার অজুহাতে এবং ইহুদি-বিদ্বেষের ধোঁয়াটে অভিযোগে জার্মান কর্র্তৃপক্ষ গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রদর্শন এবং গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবি জানানো সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করছে। এখানে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো:
গত নভেম্বরে কবি রণজিৎ হোসকোটেকে বিশ্বের অন্যতম সুপরিচিত সমকালীন শিল্প প্রদর্শনী ডকুমেন্টা ১৬ এর নির্বাচক কমিটি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। রণজিৎ ২০১৯ সালে ইহুদিবাদকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তুলনা করে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন এ কথা প্রকাশ পাওয়ার পর এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্কের বিষয়ে বাকস্বাধীনতার অভাবকে কারণ দেখিয়ে রণজিৎ হোসকোটের পদত্যাগের মাত্র কয়েকদিন পরই কমিটির বাকি সদস্যরাও পদত্যাগ করেন।
ডিসেম্বরে জার্মানির গ্রিন পার্টির সঙ্গে যুক্ত হেনরিশ বোল ফাউন্ডেশন মাশা গেসেনকে দেওয়া ‘হান্না আরেন্ড্ট প্রাইজ ফর পলিটিক্যাল থট’ পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেয়। এ সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে বলা হয় নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় প্রকাশিত মাশা গেসেনের প্রবন্ধ ‘ইন দ্য শ্যাডো অব দ্য হলোকাস্ট’ এর কথা বলা হয়। ওই প্রবন্ধে মাশা গেসেন জার্মানির ইসরায়েল নীতির সমালোচনা করেছেন। অবরুদ্ধ গাজার পরিস্থিতিকে তিনি হলোকাস্টের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি নিধনযজ্ঞ) সময় পূর্ব ইউরোপে নাৎসি-নিয়ন্ত্রিত ইহুদি বসতিগুলোর দুর্ভোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ও সম্মানজনক চলচ্চিত্র উৎসব বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা বাসেল আদ্রা এবং ইসরায়েলি সাংবাদিক ইউভাল আব্রাহামের নির্মিত ছবিকে পুরস্কৃত করায় বিতর্কের ঝড় ওঠে। চলচ্চিত্রটিতে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। আদ্রা এবং আব্রাহামের বক্তৃতা শেষে তালি দেওয়ার ছবি প্রচারিত হওয়ার পরে জার্মানির সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্লডিয়া রথের পদত্যাগের দাবি ওঠে। আরও যা স্তম্ভিত করার বিষয় সেটা হলো ক্লডিয়া রথ পরে দাবি করেছিলেন, তিনি কেবল ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতাকে বাহবা দিচ্ছিলেন, তার ফিলিস্তিনি সহযোগীকে নয়। এই ঘটনার পর জার্মান রাজনীতিবিদরা ইসরায়েল-বিরোধী পক্ষপাতিত্বের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল কমানোর হুমকি দেন। এতে সেন্সরশিপের আশঙ্কা জেগেছে দেশটিতে।
একই মাসের মধ্যে প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ঘাসান হেজকে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট থেকে বরখাস্ত করা হয়। একটি ডানপন্থি সংবাদপত্র তার বিরুদ্ধে গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর তেল আবিবের সমালোচনা করে ‘ক্রমবর্ধমানভাবে কঠোর বিবৃতি’ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিল। কয়েক সপ্তাহ পরেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের কারণে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ন্যান্সি ফ্রেজারকে কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক জার্মানি ইসরায়েলকে রাজনৈতিক ও সামরিক উভয়ভাবে টানা সমর্থন করে গেছে। ২০২৩ সালে ইসরায়েলের কেনা সামরিক অস্ত্র সরঞ্জামের প্রায় ৩০ শতাংশ জার্মানি থেকে এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা গাজায় গণহত্যার অভিযোগ এনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে (আইসিজে) যাওয়ার পরে জার্মানি দেশটির পক্ষে মামলায় ভূমিকা রাখার প্রস্তাব দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় আফ্রিকার দেশ নামিবিয়া প্রকাশ্যেই বার্লিনকে তার ‘অসময়োচিত’ সিদ্ধান্তটি ‘পুনর্বিবেচনার’ আহ্বান জানিয়েছিল। নামিবিয়ার ঔপনিবেশিক শাসক হিসেবে জার্মানি সেখানে ১৯০৪ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে বিংশ শতাব্দীর প্রথম গণহত্যা চালিয়েছিল। অন্যদিকে নিকারাগুয়া ইসরায়েলে অস্ত্র সরঞ্জাম পাঠিয়ে জাতিসংঘের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে আইসিজেতেই জার্মানির বিরুদ্ধে আরেকটি পৃথক মামলা করে। কথিত অনুন্নত দেশের এই দুই পদক্ষেপ জার্মানির এই দাবির ভণ্ডামি উন্মোচন করে দিয়েছে যে, তারা গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন করার মাধ্যমে আসলে ইহুদি-বিদ্বেষকে মোকাবিলা করছে।
দেশগুলোর উদ্যোগ আরও দেখিয়ে দিল, জার্মানি কীভাবে গণহত্যাকারী ইসরায়েলকে অস্ত্র, তহবিল এবং কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে ইউরোপীয় আদর্শের অন্তস্তলের কথিত মূল্যবোধ এবং নীতিগুলোকে বানচাল করার হুমকি সৃষ্টি করেছে যার মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, স্বাধীনতা, সমতা এবং আইনের শাসন। এই ভণ্ডামিপূর্ণ অবস্থানের জন্য জার্মানি অভ্যন্তরীণভাবে এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে বাধ্য। জার্মান কর্র্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিপন্থি বক্তৃতা সেন্সর করে ইহুদি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বলে দাবি করছে। কিন্তু নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে দিয়ে বলছে, জার্মানি রাষ্ট্র জায়নবাদবিরোধিতাকে উগ্র ইহুদিবিরোধিতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে দেশটির অভ্যন্তরে বিদেশি-বিদ্বেষের আগুনে ঘি ঢালছে। বলা হচ্ছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসী এবং শরণার্থীরা ইহুদি বিরোধিতা আমদানি করছে। ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করার জন্য তাদের এ তকমা দেওয়া হচ্ছে। এভাবে তাদের অনেককে অন্যায়ভাবে বহিষ্কারের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। অন্যদিকে জার্মানির উগ্র ডানপন্থিরা ইহুদি-বিদ্বেষ এবং ইসরায়েলের সমালোচনাকে এক করে দেখানোর কৌশল ব্যবহার করে ইসলামফোবিয়া ছড়াচ্ছে। তারা মুসলিম ও আরবদের ভয় দেখানো এবং লক্ষ্যবস্তু করা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রসঙ্গত, আগামী জুনে অনুষ্ঠেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে উগ্র ডানপন্থিদের প্রতি জনসমর্থন বাড়ছে।
ইহুদি-বিদ্বেষ এবং ইসরায়েল সম্পর্কে এই ভণ্ডামিপূর্ণ অবস্থান অবশ্যই শুধু জার্মানির ক্ষেত্রে ঘটছে না। পশ্চিমা বিশ্ব জুড়ে গাজায় ইসরায়েলি সরকারের অপরাধের বিরোধিতাকারী সব ধরনের প্রগতিশীলদের ইহুদি-বিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হচ্ছে, জায়নবাদ-বিরোধী অভিমত ও ইসরায়েল রাষ্ট্রের সমালোচনাকে ইহুদি-বিদ্বেষের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের জো বাইডেন ও ডেমোক্রেটিক পার্টি, ফ্রান্সের মারিন লো পেনের অতি-ডান দল ন্যাশনাল র্যালি এবং জার্মানির এএফডি সবার গলায় এক সুর।
ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে পশ্চিমের বর্তমান অবস্থার সবচেয়ে জাজ্বল্যমান উদাহরণগুলোর একটি হয়তো নিউ ইয়র্কের হোবার্ট অ্যান্ড উইলিয়াম স্মিথ কলেজের স্থায়ী অধ্যাপক জোডি ডিনকে বাধ্যতামূলকভাবে ছুটিতে পাঠানো। তার অপরাধ ছিল একটি নিবন্ধে এডওয়ার্ড সাইদের অনুকরণে এ কথা লেখা যে, ‘ফিলিস্তিন পরিস্থিতি সবার হয়ে কথা বলে’। মার্কিন মূলধারার শিক্ষক ও তাত্ত্বিক সমাজ হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার বিষয়ে জনগণের ধারণাকে কীভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে নিবন্ধটিতে জোডি ডিন তাই তুলে ধরেছিলেন।
আলজাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর: আবু ইউসুফ
লেখক: গ্রিসের সাংবাদিক। নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওপেন ডেমোক্রেসি, তুরস্কের টিআরটিসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় লিখে থাকেন
