আনসার চায় স্বতন্ত্র দায়িত্ব ক্ষুব্ধ পুলিশ

আপডেট : ০৮ মে ২০২৪, ০৬:১২ এএম

ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে ১৩৯টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ হবে আজ বুধবার। চারটি ধাপে এবারের উপজেলা নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। আর এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের মাঠে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও কালো টাকার বিস্তার ঠেকাতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু শেষ সময়ে এসে বাদ সেধেছে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালন নিয়ে টানাপড়েন। আনসার বাহিনী চাচ্ছে তারা নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। আর পুলিশ চাচ্ছে অন্যান্য নির্বাচনের মতোই আনসার সদস্যরা পুলিশের অধীনে থেকেই দায়িত্ব পালন করবে। এর ফলে দুই বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় থাকবে। কিন্তু আনসার তা মানতে নারাজ। এ নিয়ে দুই বাহিনীর মধ্যে ‘শীতল বিরোধ’ দেখা দিয়েছে।

ইতিমধ্যে আনসার সদস্যদের জেলা প্রশাসকের অধীনে থেকে দায়িত্ব পালন করতে পরিপত্র জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিষয়টি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের ক্ষোভ ও কিছু দাবি-দাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ওই প্রতিনিধিদলে একজন অতিরিক্ত আইজিপি, একজন ডিআইজি ও দুজন পুলিশ সুপার ছিলেন বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে। পুলিশ কর্তারা ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন-২০২৪-এর পরিপত্রের ৩-এর গ, ঘ, ঙ ধারাসহ কিছু ধারা সংশোধনের দাবি তুলেছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে দুই বাহিনীর দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা মুখ খুলতে নারাজ। 

পুলিশ সূত্র জানায়, নির্বাচনী এলাকায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে থেকে আনসার সদস্যদের ‘স্বতন্ত্রভাবে’ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করার নির্দেশনায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে পুলিশের মাঠ পর্যায়ে। ইতিপূর্বে আনসার সদস্যরা জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) অধীনে থেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু এবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা পরিপত্রে আনসারসহ মোতায়েন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে (জেলা প্রশাসক) রাখা হয়। এর আগে নির্বাচনকালে আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি সমন্বয় করতেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি)।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আনসারের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অঙ্গীভূত আনসাররা জেলা পুলিশ সুপারদের অধীনে থেকে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবেন। আর ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে থেকে স্বতন্ত্রভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনী এলাকার নিরাপত্তার বিষয়ে সমন্বয় করছেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। পুলিশের সঙ্গে কোনো এলাকায় সমন্বয়হীনতার কোনো খবর তারা পাননি।

এ বিষয়ে কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আনসার কেন এবার এ রকম করছে তা তারা বুঝতে পারছেন না। এতদিন এই বাহিনীর সদস্যরা পুলিশ সুপারের অধীনে থেকে দায়িত্ব পালন করে এসেছে। সর্বশেষ গত সংসদ নির্বাচনেও তারা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু এবার জেলা প্রশাসকের অধীনে থেকে আনসার দায়িত্ব পালন করবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

পুলিশের মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আনসার সদস্যরা আগে পুলিশ সুপারের কাছে রিপোর্ট করতেন। পুলিশ সুপার নির্বাচনী এলাকায় প্রয়োজন অনুসারে আনসার সদস্য মোতায়েন করতেন। সাধারণ কেন্দ্রে ও গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করা হতো। এবার পুলিশ সুপারের পরিবর্তে আনসার সদস্যদের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে রাখা হয়েছে। বিষয়টি পুলিশের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আনা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল গতকাল মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই সেন্সেটিভ (স্পর্শকাতর)। আমি একটা বৈঠকে আছি। আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব।’

তবে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেউ কেউ পুলিশ ও আনসার নিয়ে কানামাছি খেলছে বলে মনে হচ্ছে। এতে আমাদের বলার কিছু নেই। তবে এতটুকু বলতে পারি পরিপত্রের অন্য জায়গায় যাই বলা হোক, ভোটকেন্দ্রের মূল নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশই পালন করবে। পরিপত্রেই বলা আছে, পুলিশ কমিশনার বা পুলিশ সুপার স্থানীয়ভাবে গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে কেন্দ্রে পুলিশ ও আনসার সদস্য কম-বেশি করবেন।’ মাঠপর্যায়ে পুলিশ ও আনসারের মধ্যে কোনো সমন্বয়হীনতা নেই বলেও উল্লেখ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। 

জানা গেছে, এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পরিপত্রে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনী এলাকায় মোতায়েন করা সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রিপোর্ট করবে এবং পুলিশ সুপার ও রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের নিয়োজিত করবেন।’

পরিপত্রে আরও বলা হয়, ‘রিটার্নিং অফিসারের চাহিদা অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশক্রমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোবাইল, স্ট্রাইকিং টিম, বিজিবির প্লাটুন বিভাজন করা হবে। আনসার ব্যাটালিয়ন প্রতি উপজেলায় এক সেকশনে ১০ জন মোতায়েন করতে হবে। উক্ত সদস্যরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনা মতো অন্য কোথাও দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশের সঙ্গে স্ট্রাইকিং বা মোবাইল টিমে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতি উপজেলায় ২০ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করতে হবে।’

উপজেলা পরিষদের দ্বিতীয় ধাপের ভোট ২১ মে, তৃতীয় ধাপে ২৯ মে এবং চতুর্থ ধাপের ভোট হবে ৫ জুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত