রাফায় ইসরায়েলের স্থল হামলা

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ০২:০০ এএম

ফিলিস্তিনের গাজার রাফাহ শহরে বিমান হামলার পাশাপাশি স্থল হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। হামাসের সঙ্গে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত না করেই মধ্যস্থতাকারীরা গত বৃহস্পতিবার কায়রো ছেড়ে যেতে বাধ্য হওয়ার পরদিন গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই রাফায় কামানের গোলাবর্ষণ করছে ইসরায়েল। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও উত্তরে গাজা সিটিতে স্থল ও বিমান হামলার কথা জানিয়েছে। মুহুর্মুহু বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। রাফায় আশ্রয় নেওয়া মানুষরা তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছে। এর সঙ্গে আগে থেকে আছে খাদ্যসংকটের উদ্বেগ। রাফায় অস্থিরতা চলতে থাকলে বিদেশি সহায়তাও আসা বন্ধ হয়ে যাবে। না খেয়ে মরতে হবে গাজাবাসীকে।

এদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গতকাল নতুন করে কোনো ফিলিস্তিনির হতাহতের তথ্য জানায়নি। তাদের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত সাত মাসে গাজায় দখলদার বাহিনীর হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৯০৪ জন। এ ছাড়া একই সময়ের মধ্যে আরও ৭৮ হাজার ৫১৪ জন আহত হয়েছে। তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, রাফাহ শহরের হাসপাতালগুলোতে গত তিন-চার দিনে যারা আহত হয়েছে, তাদের রাখার জায়গা হচ্ছে না। রাফায় তিনটি হাসপাতাল রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় আবু ইউসেফ আল-নজর হাসপাতালের বেশিরভাগ কার্যক্রম বন্ধ রেখে সেটি খালি করে দিতে হয়েছে। কারণ, ইসরায়েলি বাহিনীর সেখানকার কর্মীদের সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। তাছাড়া হাসপাতালটির কাছেই লড়াই চলছে। গাজায় এখন একমাত্র এ হাসপাতালটিতে কিডনি জটিলতায় আক্রান্তদের জন্য ডায়ালাইসিস সেবা চালু আছে।

ইসরায়েলি বাহিনী রাফাহর দিকে অগ্রসর হওয়ায় পাশের নগরী খান ইউনিসের ইউরোপিয়ান গাজা হাসপাতালে রাফাহ থেকে আর রোগী পাঠানো যাচ্ছে না। রাফাহ থেকে গুরুতর রোগীদের অস্ত্রোপচারের জন্য খান ইউনিসের ওই হাসপাতালে পাঠানো হতো।

রাফাহর আরেকটি হাসপাতাল আমিরাতি মেটারনিটি হাসপাতাল। যেখানে প্রতিদিন বহু মা সন্তান প্রসব করছেন। আর কুয়েতি স্পেশালিস্ট হাসপাতালের কর্মীরা জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ ছোট্ট এই হাসপাতালটিতে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রচণ্ড অভাব। চিকিৎসা কর্মীও হাতেগোনা।

এ অবস্থায় রাফায় আশ্রয় নেওয়া মানুষরা তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা ও এএফপি। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি মারওয়ান আল-মাসরি বলেন, রাফায় নাগরিক জীবন বলতে আর কিছু নেই। ৩৫ বছর বয়সী মাসরি এএফপিকে বলেন, শহরের পশ্চিমাঞ্চলের রাস্তাগুলো সব ফাঁকা হয়ে গেছে। আমরা সবাই হামলার ভয়ে আছি। তিনি বলেন, আমি আমার আত্মীয় সবাই গুলি আর বোমা হামলার ভয়ে ভীত, আতঙ্কিত। ধীরে ধীরে এগুলো আমাদের আরও কাছে এগিয়ে আসছে।

মধ্য গাজার আল-বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে ছিলেন আল বারুকি। ইসরায়েলের হামলায় সব হারিয়ে রাফায় আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। বলছিলেন, আবারও গৃহহীন হয়ে গেলাম। আমরা আল-বুরেইজে আমাদের ঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। এখন রাফায় তীব্র গোলাবর্ষণে আমি আমার সন্তানরা আবার পথে এসে দাঁড়িয়েছি। ৩৯ বছর বয়সী এই নারী জানান, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার সন্তানের জন্ম দেন তিনি। বারুকি বলেন, আমরা জানি না কোথায় যাব আমরা। কোনো নিরাপদ জায়গা আর নেই।

রাফাহর পশ্চিমাঞ্চলেও ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে এএফপি। বারুকি ও মাসরি দুজনই জানান, অবিরাম গুলি ও বোমায় ধুলো ও ধোঁয়ায় সেখানে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তাদের। ২৯ বছর বয়সী মুহানাদ আহমেদ কিশতা বলেন, আমরা রাফায় চরম ভয় ও সীমাহীন উদ্বেগের মধ্যে বসবাস করছি। তিনি বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যেসব স্থানকে নিরাপদ বলে দাবি করছে, সেগুলোতেও বোমা হামলা চালানো হচ্ছে।

রাফাহ এবং খান ইউনিসে কর্মরত চিকিৎসক জেমস স্মিথ বলেন, মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে না পারায় স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিন ধরে অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।

রাফায় দাতব্য সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারের (এমএসএফ) মেডিকেল কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ আবু মুঘাইসিব বলেন, রাফাহ পরিস্থিতি জটিল। লোকজন তাদের জিনিসপত্র, তোশক, কম্বল, রান্নাঘরের জিনিসপত্র যা পাচ্ছে সব নিয়ে পূর্ব রাফাহ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাফাহর পশ্চিমে আর কোনো জায়গা নেই।

গত সোমবার রাফায় হামলা চালানো হবে জানিয়ে ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। এ নির্দেশের পর ইসরায়েলি বোমা হামলার ভয়ে রাফাহ ছেড়ে যেতে মরিয়া ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো। মোহাম্মদ ওয়েদা নামের একজন আলজাজিরাকে বলেন, তারা আমাদের ওপর বোমা ফেলছে, আমাদের হুমকি দিচ্ছে, চলে যেতে বলছে কিন্তু আমাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি কারও কাছে যেতে পারি এমন কেউ নেই। আমার মা মারা গেছেন। আমার আর কেউ নেই। আমরা শুধু এখানেই ঘুরছি। আর আমার কাছে কোনো অর্থও নেই, যা দিয়ে অন্য কোথাও যেতে পারি।

ইসরায়েলের হামলার প্রায় দেড় মাস পর গাজার উত্তরে বেইত হানুন থেকে রাফায় পালিয়ে এসেছিলেন ওয়েদা। তিনি বলেন, যদি সেখানে থাকতাম তাহলে সন্তানদের নিয়ে মারা যেতাম। আমার এক ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। আমার তিন মাস বয়সী ছেলে জাইন বোমার ধোঁয়ায় মারা গেছে।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাফায় অভিযান চালিয়ে হামাসকে ইসরায়েল হারাতে পারবে না বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ কথা জানান মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কারবি। তিনি বলেন, বাইডেনের মতে, রাফাহ ধ্বংস করে হামাসকে নির্মূলের লক্ষ্য সাধনে ইসরায়েল এগোতে পারবে না।

কারবি বলেন, ইসরায়েল হামাসকে অনেকটাই চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। নতুন করে রাফায় অভিযান শুধু বেসামরিক নাগরিকদের ঝুঁকিই বাড়াবে। তাছাড়া রাফায় অভিযান আদতে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার টেবিলে হামাসের হাতকেই আরও শক্তিশালী করবে, ইসরায়েলের নয়।

রাফায় বেসামরিক নাগরিক হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি হলে গাজার কোনো সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনোয়ার আলোচনার টেবিলে আসতে আগ্রহী হবেন না।

বৃহস্পতিবার মিসরের কায়রোয় মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে হামাস ও ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধবিরতি আলোচনা মতবিরোধের কারণে থমকে গেছে বলে জানিয়েছে মিসরের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। ইসরায়েল রাফায় সর্বাত্মক হামলা চালানোর পরিকল্পনায় অটল রয়েছে। জন কারবি বলেছেন, রাফায় বড় ধরনের স্থল অভিযানের বিকল্প নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলছে। এ বিকল্পের বিষয়ে ইসরায়েলকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত