বর্ষার বৃষ্টি নয় তবু প্রাণঘাতী বন্যা

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ১১:০৫ পিএম

গোলাকার এই পৃথিবীর ভূগোলটা বৈচিত্র্যময়।

পৃথিবীর একপ্রান্তে শীত তো আরেক প্রান্তে ছাতিফাটা রোদ। এক পাশে তুমুল বৃষ্টি, অন্যপাশে টানা খরায় পানির হাহাকার। কোনো জায়গায় বর্ষ ঋতু শেষ তো কোনো জায়গায় আসন্ন। এর মধ্যেই গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে চলতি মে মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার একটি সাধারণ প্রাকৃতিক বাস্তবতা দেখা গেছে। এই সময়ের মধ্যে বৃষ্টিতে দেখা দেওয়া আকস্মিক বন্যায় এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে শত শত মানুষর প্রাণহানি হয়েছে। লাখ লাখ কোটি ডলারের সম্পদ নষ্ট হয়েছে। অথচ এই সময়টা ওইসব এলাকার বর্ষাকাল নয়। এশিয়ার বর্ষাকাল শুরু হবে চলতি মাস থেকে। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যে বর্ষা আসতে অপেক্ষা করতে হবে জুন মাসের মাঝামাঝি অবধি। আর আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার যেসব দেশে বন্যা হয়েছে সেসব দেশের বর্ষাকাল বিদায় নিয়েছে আরও মাস খানেক আগেই।

অসময়ে সৃষ্ট এই বন্যার জন্য অনেকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে দায়ী করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, অসময়ে ভারী বর্ষণের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকলেও বন্যার কারণ পুরোই মানুষের সৃষ্ট। বৃষ্টির পর পানি নিষ্কাশনের সুবিধার অভাবে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা, বাঁধ উপচে বা ভেঙে হচ্ছে হড়কা বানের মতো ঘটনা। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের (এনডব্লিউএস) তথ্য মতে, গত দুই দশকের কাছাকছি সময়ে একটি ভারী বৃষ্টি হলেও বিশ্বের অনেক শহরে জলাবদ্ধতা ও অনেক এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিচ্ছে। অথচ তিন থেকে চার দশক আগে একই পরিমাণ বৃষ্টিপাতে বন্যা দেখা যায়নি। এর অন্যতম কারণ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন বা সরে যাওয়ার পথগুলো নানা ভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পানি নামতে বেশি সময় লাগছে বলেই বন্যা অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। অল্প জায়গা দিয়ে বেশি পানি যাওয়ায় তীব্র স্রোতে বিধ্বস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি-স্থাপনা। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর অনুসারে, গত এপ্রিল মাসে ১৭ তারিখে ৭১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করা হয় মরুর দেশ আরব আমিরাতে। একই সময় এর প্রতিবেশী দেশ ওমানেও ভারী বর্ষণে আকস্মিক বন্যার কবলে পড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সে সময় বৃষ্টি হয় সৌদি আরবেও। দেশটিতে ৩০ এপ্রিলও ভারী বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দেয় কয়েকটি এলাকায়। এর মধ্যে চীনেও ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে হয় দেশটির কয়েক কোটি মানুষকে। ১৭ এপ্রিলে পাকিস্তানেও তীব্র বর্ষণজনিত বন্যায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সে সময় ভারী বর্ষণ হয় আফগানিস্তান ও ইরানে। এর কয়েকদিন পরেই ভারী বৃষ্টিপাতে নজিরবিহীন বন্যা দেখা দেয় কেনিয়ায়। দেশটির মানুষ এখনো বন্যার পানির সঙ্গে লড়াই করছে। সপ্তাহখানেক আগে ভারী বর্ষণে শুরু হওয়া বন্যায় এখনো ডুবে আছে ব্রাজিলের পুরো একটি প্রদেশ। বন্যা দেখা দিয়েছে ইন্দোনেশিয়াতেও। দেশটির মধ্যাঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির হয়েছে। এরমধ্যে গত শুক্রবার ভারী বর্ষণে দেখা দেওয়া আকস্মিক বন্যায় শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে আফগানিস্তানে। 

যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও দেশটির সেন্টার ফর গ্রিনিং ফাইনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের পরামর্শক আবহাওয়াবিদ আদ্রিয়ান চ্যাম্পিওনে এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, হাল আমলে বৃষ্টির পরে কেন আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। আন্ডারস্ট্যান্ডিং সামার ফ্ল্যাশ ফ্লাডিং নামক এক গবেষণা নিবন্ধে তিনি দাবি করেছেন, মূলত যথাসময়ে ও বাধামুক্তভাবে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হতে না পারার কারণেই আধুনিক সময়ে ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাড বা হড়কা বান হয়ে থাকে। বিশেষ করে শহর এলাকার বন্যার জন্য অপরিকল্পিত স্থাপনা ও বাঁধই দায়ী। শহরের নালা বা নর্দমাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তো কথাই নেই। আগে সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় এমন ধরনের বন্যা হতো ভারী বৃষ্টির পরে। তিনি বলেন, একটা বিষয় খেয়াল করে দেখবেন হড়কা বান গ্রামাঞ্চলে কম হয়। এর কারণ, গ্রামে বৃষ্টির পানি নেমে যেতে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়ে না। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও সেই পানি জলাশয়ে জমা হয়। খালের মাধ্যমে নেমে যায় বড় কোনো নদীতে। ফলে ভারী বৃষ্টিতে কিছু ফসলের ক্ষতি হলেও প্রাণহানি হয় না বললেই চলে। 

কোথায় বন্যা, ক্ষতি কত : গত শুক্রবার আকস্মিক বন্যায় আফগানিস্তানে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যার ফলে বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। তালেবান কর্র্তৃপক্ষ এ পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, শুধুমাত্র বাঘলানেই ৩১৫ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার কারণে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে আফগানিস্তানে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

মে মাসের শুরুতে ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য রিও গ্রান্দে দো সুলে রেকর্ড বন্যায় চার লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে ১২৬ জনের আর নিখোঁজ রয়েছেন আরও ১৪১ জন। স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মাঝখানে বন্ধ থাকার পর শুক্রবার বৃষ্টি আবার ফিরে এসেছে।

আর আগে এপ্রিলের শেষভাগে চীনের গুয়াংডং প্রদেশে ভারী বর্ষণের কারণে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। বন্যার প্রকোপে বাস্তুহীন হয়ে পড়েছে দেশটির সবচেয়ে জনবহুল এই প্রদেশের হাজার হাজার মানুষ। কাছাকাছি সময় পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় ভারী বর্ষণের কারণে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ২২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত কয়েকদিনে প্রাণহানির এই ঘটনা ঘটেছে । বন্যায় পূর্ব আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটিতে অনেক বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে গত ২৪ ঘণ্টায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে করে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি জমে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। মদিনার আল ইসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে উপত্যকা এবং বিভিন্ন প্রাচীরে পানি উপচে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতেও স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হয়। এক দিনের বৃষ্টিতে প্রায় ডুবে যায় মরু শহর দুবাই। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যায় তলিয়ে যায় বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যস্ততম দুবাই বিমানবন্দর। ব্যাহত হয়েছে কয়েক’শ ফ্লাইট। বন্যায় প্লাবিত হয় রাজধানী আবুধাবিতে প্রবেশের সব সড়ক। আমিরাতের বন্যার সময় মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ ওমানে বন্যার কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন মানুষ। ভারী বর্ষণে দেশটির উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বেশ কিছু অংশে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। ওই সময়ে বন্যা হয় পাকিস্তানেও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত