কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হজের রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু মাস। এ মাসগুলোতে যারা নিজেদের ওপর হজকে অপরিহার্য করবে তাদের কর্তব্য, সব অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা। সব গোনাহ ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা এবং সব ধরনের ঝগড়া-বিবাদ থেকে মুক্ত থাকা।’ সুরা বাকারা : ১৯৭
হজের মৌসুমে আমরা এ আয়াতের ওপর অনেক আলোচনা শুনে থাকি। আল্লাহতায়ালা এ আয়াতে যে কয় মাসের কথা বলেছেন তা শুরু হয়েছে। মাসগুলো হচ্ছে শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজ। যদিও হজের মূল কাজ হয় জিলহজ মাসে। কিন্তু এর সময় শুরু হয় শাওয়াল থেকেই। তাই এ তিন মাসকে বলা হয় হজের মাস।
যারা হজ করতে ইচ্ছুক তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হলো হজের মাসয়ালা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। মাসয়ালা ভালোভাবে জেনে ও বুঝে না নিলে নানা ধরনের ভুল-ভ্রান্তির আশঙ্কা থাকে। এমনকি কখনো কখনো এমন এমন ভুল হয় যে, আমলটিই বরবাদ হয়ে যায়। এ কারণে যে কোনো আমলের আগে সে সংক্রান্ত মৌলিক মাসয়ালাগুলো জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হজযাত্রীরা হজ পালনের জন্য ইতিমধ্যে সৌদি আরব গমন করছেন। মুসলিম বিশ্বে এখন হজের মৌসুম। মসজিদে মসজিদে হজের আলোচনা হবে। যারা এ বছর হজে যাবেন এসব আলোচনা দ্বারা শুধু তাদেরই উপকার হবে এমন নয়, বরং সবারই উপকার হবে এবং তা সবারই প্রয়োজন। যারা হজে যাচ্ছেন হজের মাসয়ালা জানা তাদের জন্য বেশি জরুরি, কিন্তু যারা যাচ্ছেন না তাদের জন্যও উপকারী।
হজ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদিসগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়া হলে দেখা যাবে, হজের মধ্যে অনেক নৈতিক ও চারিত্রিক শিক্ষা আছে। এটি ইসলামের সব ইবাদতের বৈশিষ্ট্য। নামাজ বলুন, রোজা বলুন, জাকাত বলুন, হজ বলুন সব কিছুতেই রয়েছে অনেক চারিত্রিক শিক্ষা।
আমরা রোজার আলোচনায় শুনেছি, রোজার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের অনেক বড় চারিত্রিক শিক্ষা দিয়েছেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা কথা এবং মিথ্যা কর্ম (অসৎ কর্ম) পরিত্যাগ করতে পারে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ সহিহ বুখারি : ১৯০৩
কত কঠিন কথা! রোজার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের এই নৈতিক ও চারিত্রিক শিক্ষা দান করেছেন। যদি আমরা রোজার মাধ্যমে এই শিক্ষা অর্জন করতে না পারি তাহলে রমজানের ফরজ আদায় হলেও রমজানের পূর্ণাঙ্গ ফায়দা ও ফজিলত হাসিল হবে না। ঠিক তেমনি হজের বিষয়টি।
আমরা যদি হজের বিধানাবলি এবং এর শিক্ষা ও তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাব, হজের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের অনেক গুণ ও যোগ্যতার অধিকারী করতে চেয়েছেন।
হজের অনেক বড় শিক্ষা ধৈর্যের শিক্ষা। হজে খুব বেশি প্রয়োজন হয় ধৈর্যের। যেহেতু হজের সফর দীর্ঘ হয় এবং হজের সফরে এমন অনেক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা অন্তরে রাগের জন্ম দেয়, তাই সবরের প্রয়োজন হয়। সবরের মাধ্যমে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। ওপরের আয়াতে আল্লাহতায়ালা বিশেষভাবে তিনটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। ১. কোনো অশ্লীল কথা ও কাজে লিপ্ত হবে না। ২. কোনো গুনাহে লিপ্ত হবে না। ৩. কারও সঙ্গে কোনো ঝগড়া-বিবাদ করবে না।
তিন ক্ষেত্রেই প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন। আলেমরা ধৈর্যের যে মৌলিক তিনটি ক্ষেত্র নির্দেশ করেছেন এর একটি হচ্ছে, গোনাহ থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ধৈর্যের অনেক বড় প্রকার। সুতরাং অশ্লীল কথা, কাজ ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকার জন্য সবর ও সংযমের খুব প্রয়োজন।
মনে করুন, মাহে রমজানে এক মাস যে সংযমের অনুশীলন হয়েছে হজের সফরে আমার-আপনার ব্যবহারিক পরীক্ষা হয়ে যাবে। হজ-ওমরাহর সফরে বিশেষভাবে পরীক্ষা হয় পর্দা ও দৃষ্টির। এ দুই ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকা উচিত। তৃতীয় বিষয় ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত না হওয়া।
ঝগড়া ইসলামের দৃষ্টিতে বড় নিন্দনীয়। কোনো ভদ্র মানুষ কখনো ঝগড়া করতে পারে না। আর এটা সব সময়ের বিধান। তবে হজের সময় এ নির্দেশটি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। কারণ হজের সময় ঝগড়া-বিবাদের অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ জন্য কোরআন মাজিদ হজের সফরে ঝগড়া থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ বিশেষভাবে দিয়েছে। কোরআন মনে করিয়ে দিচ্ছে, তুমি তো আল্লাহর ঘরের মেহমান। তার ঘরের মেহমানের জন্য কি সাজে কারও সঙ্গে ঝগড়া করা? যদি কোনো মুসলিম কোরআনের এ নির্দেশ পালন করার জন্য প্রতিজ্ঞা করে, আমাকে যত কষ্ট দেওয়া হোক, যত দুর্ব্যবহারই করা হোক, আমার সঙ্গে যত ওয়াদাখেলাপি করা হোক, কোরআন যখন বলেছে, হজের মধ্যে কোনো ঝগড়া নেই; সুতরাং আমি কারও সঙ্গে ঝগড়া করব না। যদি কোনো মুসলিম এ প্রতিজ্ঞা করে তাহলে হজের মাধ্যমে যে ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণ তার অর্জিত হবে তার কি কোনো তুলনা হতে পারে?
হজের সফরের আরেক অনুষঙ্গ হচ্ছে, আল্লাহর ভালোবাসা নিয়ে সফর করা। এখন তো সফর অনেক সহজ, আগের যুগে সফর অনেক কঠিন ছিল। পথ অনেক দীর্ঘ ও দুর্গম ছিল। মানুষ দু-তিন মাসের পথ পাড়ি দিয়ে আসত বায়তুল্লাহর জিয়ারতের জন্য। একমাত্র আল্লাহতায়ালার ভালোবাসা তাদের এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে উদ্বুদ্ধ করত। তো আমরাও যখন সফর করব, তখন আল্লাহর ভালোবাসা, আল্লাহর প্রতি সমর্পণ ও উৎসর্গের প্রেরণা নিয়ে সফর করব। তাহলে আল্লাহর সঙ্গে আমাদের গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। এভাবে হজ পালন করতে পারলে রাসুলের দেওয়া সুসংবাদের ধারক-বাহক হওয়া যাবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি এই ঘরের হজ করে এবং অশ্লীল ও শরিয়তবিরোধী কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখে, সে ব্যক্তি পাপ থেকে এমন পবিত্র হয়ে বেরিয়ে আসে, যেন সেই দিনই তার মা তাকে নবজাত শিশুরূপে প্রসব করছে।’ সহিহ বুখারি : ১৮১৯
লেখক : প্রিন্সিপাল, পদুয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, ফেনী
