ছাত্রলীগের কথা না শুনলে হলছাড়া!

আপডেট : ১৮ মে ২০২৪, ০৬:৩১ এএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে এক ছাত্রকে মারধর করে হলছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। মারধরের পাশাপাশি তাকে শিবির কর্মীর তকমা দিয়ে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী ওই শিক্ষার্থী। গত বুধবার গভীর রাতের ওই ঘটনায় পরদিন বৃহস্পতিবার হল প্রাধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। তবে অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন মারধরের ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

এদিকে হত্যার হুমকির পর ক্যাম্পাস ছেড়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যতদিন পর্যন্ত তাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না ততদিন পর্যন্ত তিনি ক্যাম্পাসে ঢুকবেন না। এ ঘটনা ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের হলছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

বুধবার রাতের ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম সবুজ বিশ্বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী সোহরাওয়ার্দী হলের অনাবাসিক শিক্ষার্থী। আর তাকে মারধরের অভিযোগ ওঠা ছাত্রলীগ নেতা হলেন ওই হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আতিকুর রহমান আতিক এবং তার সহযোগী ৮ থেকে ১০ জন ছাত্রলীগ কর্মী। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর অনুসারী।

গত বুধবার রাত ২টার দিকে সবুজ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হন। পরে গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে শারীরিক নির্যাতন এবং শিবির আখ্যা দিয়ে হত্যার হুমকির ঘটনা জানিয়ে বিচার ও নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেন।

লিখিত অভিযোগে সবুজ বিশ্বাস বলেন, ‘গত ১৬ মে রাত ২টার দিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আতিকুর রহমান আতিকসহ তার ৮ থেকে ১০ জন অনুসারী আমাকে কক্ষ থেকে বের করে হলের ছাদে নিয়ে বেধড়ক মারধর করেন এবং শিবির আখ্যা দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। পরে নিজেকে সনাতন ধর্মাবলম্বী দাবি করলে আরও বেশি মারধর করেন। আমি প্রাণ রক্ষার্থে দৌড়ে হল ত্যাগ করি। এমতাবস্থায় নিজের নিরাপত্তা শঙ্কায় পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।’

ভুক্তভোগী সবুজ বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারা ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে আমাকে বেধড়ক মারধর করে হল থেকে বের করে দিয়েছেন। মারধরে পায়ের বিভিন্ন অংশ ফেটে গেছে। সেই সঙ্গে শিবির আখ্যা দিয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। ঘটনা শুনে পরিবারের লোকজন আমাকে ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়িতে যাওয়ার জন্য বলেছেন। এ ছাড়া বর্তমানে ক্যাম্পাসে অবস্থান করাটাও আমার জন্য নিরাপদ নয়। তাই আমি বাড়িতে চলে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যতদিন পর্যন্ত আমাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না, ততদিন পর্যন্ত আমি ক্যাম্পাসে আসব না।’

হলের আবাসিক শিক্ষার্থী না হয়েও হলে অবস্থান করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এক বড় ভাই আমাকে এই হলে তুলেছেন। আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না।’ তবে কোন বড় ভাই হলে তুলেছেন, সে বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

বুধবার রাতের ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সবুজ বিশ্বাসের সঙ্গে হলের একই কক্ষে অবস্থান করা (রুমমেট) মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন রাত ২টার দিকে আতিক ভাইসহ বেশ কয়েকজন এসে সবুজকে রুম থেকে বের করে নিয়ে যান। পরে মসজিদের ছাদে নিয়ে গিয়ে তাকে মারধর করেন। এর আগে আতিক ভাইয়েরা আমাদের রুমে এসেছিলেন, সেদিন তাকে চিনতে না পেরে সবুজ তার সঙ্গে একটু খারাপভাবে কথা বলেছিলেন। তার জেরে সবুজকে মারতে পারে বলে ধারণা করছি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘অভিযোগটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন। আমি তাকে (সবুজ বিশ্বাস) চিনি না। ওই শিক্ষার্থী হল ছাত্রলীগের সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদের অনুসারী। মূলত নিয়াজের অপকর্ম লুকানো ও ধামাচাপা দেওয়ার জন্য আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হলের যে ঘটনা, সেটি আমি জানার সঙ্গে সঙ্গে উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলি। লিখিত অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। সবুজ ওই হলের আবাসিক কোনো শিক্ষার্থী নয়। আবাসিকতা ছাড়া হলে থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। ওই ঘটনা দুপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করে দেওয়া হয়েছে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী হলের প্রাধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘সবুজ লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। হল প্রশাসন দুপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

এর আগে গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখ্শ হলে মধ্যরাতে এক শিক্ষার্থীকে ঘুম থেকে তুলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আসন থেকে বিছানাপত্র নামিয়ে দেন। ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী লাদেন রহমানের ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি জানাজানি হলে বৃহস্পতিবার দুপুরে হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মধ্যস্থতায় ওই শিক্ষার্থীকে আবার আসনে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্তরা মাদার বখ্শ হলে ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মেসকাত হাসান ও তার অন্তত ১০ অনুসারী। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিবের অনুসারী।

এ ঘটনা ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের হলছাড়া করার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

গত বছরের শেষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলেই আসন পাওয়ার পরদিনই এক আবাসিক শিক্ষার্থীর বিছানাপত্র নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পরে খবর পেয়ে হল প্রশাসন আবার ওই শিক্ষার্থীকে ওই আসনেই তুলে দেয়। ভুক্তভোগী আবির হোসাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

একই বছরের জুনে দলীয় কর্মসূচিতে না যাওয়ায় সোহরাওয়ার্দী হলেরই দুই শিক্ষার্থীর বিছানাপত্র নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রলীগের দুই নেতার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থী হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জোনায়েদ আহমদ ও একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জোবায়েদ হোসেন।

তার আগের বছর এপ্রিলে শের-ই-বাংলা হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে রাতে সিট ছেড়ে দেওয়ার আলটিমেটাম দেওয়ার পর সকালে জিনিসপত্রসহ হল থেকে বের করে দেন ছাত্রলীগের এক নেতা।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম আকিব জাভেদ। তিনি ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত