রাফা ক্রসিংয়ের একপাশে গাজা, অন্যপাশে মিসরের সিনাই উপদ্বীপ। এই সীমান্তপথ দিয়েই খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানিসহ জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সব সামগ্রীর সরবরাহ প্রবেশ করত গাজায়। তবে ৭ অক্টোবরের পর থেকে সীমান্তপথটি বন্ধ করে দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। মাঝে মাঝে ত্রাণের গাড়ি প্রবেশের জন্য খুললেও গত সাত মাসের অধিকাংশ সময় বন্ধই থেকেছে রাফা ক্রসিং। এদিকে পুরো উপত্যকা জুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে রাফা শহরে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি, অনেকে ক্রসিংয়ের কাছাকাছি এলাকায় তাঁবু গেড়ে অস্থায়ীভাবে বসবাসও করছিলেন। এক মাসেরও বেশি সময় আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু রাফায় সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। নেতানিয়াহুর এই ঘোষণার পরপরই এতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পর্যন্ত একাধিকবার রাফায় সামরিক অভিযান চালানোর ব্যাপারে নেতানিয়াহুকে নিষেধ করেছিলেন। ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান শুরু হলে রাফায় বেসামরিক নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং যুদ্ধে মিসরে ছড়িয়ে পড়বে এমন আশঙ্কা থেকেই এই নিষেধ করেছিলেন বাইডেন। কিন্তু নেতানিয়াহু, তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা ও আইডিএফ সেই নিষেধে কর্ণপাত করেননি। যুদ্ধবিরতির সর্বশেষ একটি প্রস্তাবে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী সংগঠন হামাস রাজি হওয়ার পরই গাজার দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ শহর রাফায় আগ্রাসন চালিয়েছে ইসরায়েল। প্রতিবেশী মিসরের সঙ্গে গাজার যোগাযোগের পথ রাফা ক্রসিং দখলে নিয়েছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ)।
গত সপ্তাহে ইসরাইলের ট্যাংক বহর মিসর সীমান্ত লাগোয়া রাফা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। রাফাতে ইসরায়েলি হামলায় উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ডেনিস ফ্রান্সিস মন্তব্য করেছেন এই হামলার অর্থ ‘আরও মানবিক বিপর্যয়’। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯ জন সিনেটর ইসরায়েলের প্রতি লেহি আইন ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করতে বাইডেন প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এটি এমন একটি আইন যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত সংস্থাগুলোর সহায়তাকে সীমাবদ্ধ করে।
এর আগে হামাসের সঙ্গে একটি নতুন যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যে রাফায় নৃশংসতা বৃদ্ধি করে তেল আবিব। এই অঞ্চলটিতে আইডিএফের এক হামলায় অন্তত ১২ ফিলিস্তিনি নিহতের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেপথ্য ইঙ্গিতে মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেই রাফায় হামলা আরও বাড়ায় ইসরায়েলি বাহিনী। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন বলতেন, তার দেশের ১ নম্বর কৌশলগত সম্পদ কোনো অস্ত্র নয়, এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র নয়; বরং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের জোগানদাতা ও কূটনৈতিক অভিভাবক। কিন্তু মাত্র ছয় সপ্তাহের ব্যবধানে ওয়াশিংটন এমন দুটি পদক্ষেপ নিল, যা পুরোপুরি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গেল। গত মার্চ মাসে নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভেটো দেওয়া থেকে বিরত থাকে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ইসরায়েল প্রস্তাবটি আটকে দিতে চাইলেও ব্যর্থ হয়। আর এখন তো ওয়াশিংটন অস্ত্রের চালান আটকে দিল। বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলের ৩ হাজার ৫০০ বোমার চালান আটকে দিয়েছে। এই অস্ত্র ইসরায়েল গাজার দক্ষিণের শহর রাফা আক্রমণে ব্যবহার করবে, সেই বিবেচনায় অস্ত্রের চালানটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জো বাইডেনের পরামর্শ বারবার উপেক্ষা করে আসছিলেন নেতানিয়াহু। এই উপেক্ষার মূল্য কী হতে পারে, সেটাই এখন ভাবনার বিষয়। রাফায় এখন ১০ লাখের বেশি শরণার্থীর আশ্রয় শিবির। ইসরায়েলের প্রতি জো বাইডেন তার লৌহদৃঢ় সমর্থন থেকে সরে আসছেন না। কিন্তু ইসরায়েল রাফা হামলার জন্য যে হুমকি দিয়ে চলেছে, সেটা সফল করতে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করবেন না। বড় বিষয় হলো, এই সিদ্ধান্তগুলো এমন একজন রাজনীতিবিদ নিয়েছেন, যিনি ব্যক্তিগত ভাবে ইসরায়েলের খুব নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক। বাইডেন সেই যুগের একজন ডেমোক্র্যাট, যখন দুই সহস্রাব্দের নির্বাসন ও শাস্তির পর মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিদের বাড়ি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গতি পেতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের উদারপন্থিদের চোখও তখন রহস্যজনক ভাবে বন্ধ ছিল। গোল্ডা মেয়ার থেকে শুরু করে ইসরায়েলের প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাইডেনের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব অবস্থাটা এখন কী দাঁড়াল? চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে বাইডেনই প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করলেন। বাইডেন কেন এটা করলেন? কারণ, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের একটি অংশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন তিক্ততা তৈরি করেছেন, যেটা আগে দেখা যায়নি। ইসরায়েলের প্রতি যে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজের নিরেট সমর্থন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেভাবে ছাত্র আন্দোলন আছড়ে পড়েছে, সেটা বিস্ময়করই। আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা গ্যালাপের মার্চ মাসের জরিপ বলছে, ৫১ শতাংশ ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন দিয়েছে, ২৭ শতাংশ সমর্থন দিয়েছে ফিলিস্তিনের পক্ষে। কিন্তু ডেমোক্র্যাট ও তরুণ জনগোষ্ঠী-দুই ক্ষেত্রেই ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সমর্থন অনেকটাই বেড়েছে। জরিপের এই তথ্য বাইডেন ও তার নির্বাচনী প্রচারণা দলকে চিন্তার মধ্যে ফেলেছে। এই অংশের দ্ব্যর্থহীন সমর্থনই ২০২০ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরাজিত করতে ভূমিকা রেখেছিল। গাজাবাসীর দুর্ভোগ সেই ভোটারদের সমর্থন অনিশ্চিত করে তুলেছে। হোয়াইট হাউজ নেতানিয়াহুর কাছে পরিকল্পনা চেয়েছিল, বেসামরিক জনসাধারণকে হতাহত না করে কীভাবে রাফায় অভিযান করতে পারে ইসরায়েল। কিন্তু নেতানিয়াহু সেই পরিকল্পনা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। সেই কারণে ইসরায়েলকে থামানোর জন্য অস্ত্রের চালান আটকে দেওয়ার সরাসরি পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন।
এমনকি রাফা বাইডেনের জন্য শক্তি পরীক্ষার জায়গাও হয়ে উঠেছে। বাইডেন রাফাকে বিপদরেখা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। নেতানিয়াহু যদি সেই বিপদরেখা অতিক্রম করেন, তাহলে বাইডেন দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত হবেন। কিন্তু নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত রণেভঙ্গ দিতে অস্বীকার করেছেন। জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ছাড়া আমরা একাই লড়ে যাব। প্রয়োজনে আমরা আমাদের নখ দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাব।’ নেতানিয়াহু চার্চিলের মতো আওয়াজ তুলতে চাইছেন। কিন্তু তার কথাগুলো দুর্বলের কণ্ঠস্বর, সবলের নয়। ওয়াশিংটন চায়, নেতানিয়াহু যেন রাফা অভিযান থেকে সরে আসেন। কিন্তু জোট সরকারের অতি ডানপন্থি মিত্ররা তাকে আরও কঠোর হতে বলছেন, রাফা অভিযানের মাধ্যমে হামাসের বিরুদ্ধে পুরোপুরি বিজয়ের জন্য বলছেন। এই নিরানন্দ নাটকে বাইডেন ও নেতানিয়াহুই কেবল কুশীলব নন; হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনাওয়ারেরও নিজস্ব হিসাব-নিকাশ আছে, নেতা হিসেবে টিকে থাকার সংকল্প রয়েছে। খুব ঘনিষ্ঠভাবে যারা সিনাওয়ারকেও পাঠ করেছেন তারা বিশ্বাস করেন, নির্দোষ মানুষের জীবন রক্ষা করা তার অগ্রাধিকার নয়; বরং যত বেশি গাজাবাসী নিহত হবেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে তার শত্রু ইসরায়েলের অবস্থান ততই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেই পরিস্থিতি তাকে বিজয়ী দাবি করতে সহায়তা করবে। সম্প্রতি হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নেওয়ার ঘোষণার পেছনে সিনাওয়ারের এই ভাবনায় কাজ করেছে। সিনাওয়ারা সাময়িক কোনো যুদ্ধবিরতি চান না, তিনি চান স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। আর তার জন্য সিনাওয়ারা অপেক্ষা করতেও রাজি। গাজা নিয়ে কোনো চুক্তি হচ্ছে না। কেননা, নেতানিয়াহু কিংবা সিনাওয়ারা কেউই বিশ্বাস করেন না, চুক্তি করলে তাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়। যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা অ্যারন ডেভিড মিলার বলেছেন, এই সংঘাত বন্ধে একটি পক্ষেরই কেবল সত্যিকারের তাড়া আছে, সেই পক্ষটি হলেন জো বাইডেন।
ওপরদিকে রাফায় হামলাকে ইসরায়েলের কৌশলগত ভুল, রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং মানবতার দুঃস্বপ্ন বলে আখ্যা দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এমন অবস্থায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে ইসরায়েল ও হামাসকে আরও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। হামাস ইসরায়েলে হামলা চালানোর সময় থেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে গাজার দুটি ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। খোলা থাকে কেবল রাফা ক্রসিং। উপকূলও ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সমুদ্রপথে এই অঞ্চল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব না। গাজার বিমানবন্দরও ২০০১ সালে ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েল। এমন অবস্থায় রাফা ক্রসিং হয়ে উঠেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষদের গাজা ছেড়ে যাওয়া এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর একমাত্র স্থলপথ। একে তখন গাজার লাইফলাইনও বলা হয়েছিল। এখন সেই পথেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইসরায়েল। গত ৬ মে হামাস মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নিলেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এতে সায় দেয়নি। বরং তারা রাফায় অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে। ইসরায়েল এই রাফা শহর ও রাফা ক্রসিং নিয়ে যা করছে তা অসলো শান্তি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দুঃখজনক হলেও চরম সত্য কথাটি হচ্ছে, গাজার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত শহরটি এখন ইসরায়েলের যুদ্ধ ময়দান।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
[email protected]
