‘আমরা এখন যা করছি তা এই বিশ্বকাপের জন্য নয়। এই বিশ্বকাপকে টার্গেট করে কিছু করলে হবে না। আপনাকে সামনের বিশ্বকাপকে টার্গেট করে কিছু করতে হবে’, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কথাগুলো বলেছিলেন নাজমুল হোসেন পাপন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি এখন ক্রীড়ামন্ত্রী, বছর দুয়েকে বিসিবির কোষাগারও নিশ্চয়ই আরও স্ফীত হয়েছে। দেখতে দেখতে সেই পরের বিশ্বকাপও এখন দোরগোড়ায় তবে প্রস্তুতি সেই একই রকম। বরং এবারের প্রতিপক্ষরা যেন আরও আটঘাট বেঁধে তৈরি।
শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস এবং নেপাল; যুক্তরাষ্ট্র এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজে হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নবম আসরে এই চার দলই ‘ডি’ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ। ২০ দলের আসরে প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল উঠবে সুপার এইট পর্বে। অর্থাৎ আসরে এগিয়ে যেতে হলে গ্রুপ পর্বে অন্তত ৩ ম্যাচে জিততেই হবে বাংলাদেশকে। আইসিসির টি-টোয়েন্টি দলের র্যাংকিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা আছে চারে, শ্রীলঙ্কা আটে আর বাংলাদেশ নয়। নেদারল্যান্ডসের অবস্থান ১৫তম, নেপালের ১৭তম। অন্তত র্যাংকিংয়ের অঙ্ক বলে নেপাল এবং নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বাংলাদেশের জেতা উচিত। কিন্তু আসলেই কি তাই?
২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডসকে হারিয়েছিল মাত্র ৯ রানে। এরপর ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে রীতিমতো বলে কয়ে হারিয়েছে ডাচরা। তাদের কোচ রায়ান কুক একটা সময় বাংলাদেশ দলের ফিল্ডিং কোচ ছিলেন। খেলোয়াড়দের কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আর অ্যানালিস্টের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে এমন ভাবে ছক কষেছিলেন যে ইডেনের মতো পরিচিত কন্ডিশনের মাঠেও বাংলাদেশ হেরেছিল। ডাচ বিশ্বকাপ দলের পল ভ্যান মিকারেন, ম্যাক্স ও ডুডের মতো ক্রিকেটাররা বাংলাদেশে বিপিএল খেলে গেছেন। বাস ডি লিডি জিম্বাবুয়ের টি-টোয়েন্টি লিগ খেলে আসার পর এখন ইংলিশ কাউন্টি খেলছেন। নিজেদের মাটিতে আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডকে নিয়ে তিনজাতি টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে প্রস্তুতি নিচ্ছে ডাচরা। তাদের অধিনায়ক স্কট এডওয়ার্ডস মূলত অস্ট্রেলিয়ান, দাদিমার জাতীয়তার সূত্রে পেয়েছেন ডাচ পাসপোর্ট। বিগব্যাশ লিগে মেলবোর্ন রেনেগেডসের হয়ে এই উইকেট-রক্ষক ব্যাটসম্যান খেলেছেন দুটো ম্যাচ। মিকারেনও আইএলটি-২০ খেলেছেন। সব মিলিয়ে সামর্থ্যটা একেবারে কম নয় ডাচদের। দুই বছর পর দেখা হলে ৯ রানের ব্যবধানটা তারা ঘুচিয়ে ফেলতেই পারে।
রোস্টন চেজ, ম্যাথু ফোর্ড, ওবেদ ম্যাকয় নামগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বদৌলতে বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে অচেনা নয়। প্রতি বছরই তারা বিপিএলের সময় ক্রিকেটের বিনোদন ফেরি করতে এদেশে আসেন এবং চার ছক্কা মেরে এক কাঁড়ি টাকাও নিয়ে যান। এদের সঙ্গে জনসন চার্লস, আন্দ্রে ফ্লেচার, ওশান থমাসসহ ক্যারিবিয়ানের ১৫ জনকে নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দল এসেছিল নেপাল সফরে। ৫ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজটা তারা জিতেছে ঠিকই তবে সেটা ৩-২ ব্যবধানে। বুকে হাত রেখে যদি কোনো পাঁড় বাংলাদেশ সমর্থককেও বলতে বলা হয় এই রকম একটা দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৩-২ ব্যবধানে জিততে পারবে কি না, সেই উত্তর দিতে গেলেও বুক কাঁপবে। সিরিজের প্রথম ম্যাচেই হিমালয়পুত্ররা ২০৪ রান তাড়া করে জিতেছিল ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে, এইতো এপ্রিলের শেষেই। সিরিজটা হয়েছে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ক্যারিবিয়ানের অভিজ্ঞতা নিতে নেপাল দল পৌঁছে গেছে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের উইন্ডওয়ার্ড আইল্যান্ডে, সেখানকার ক্রিকেট দলের বিপক্ষে তারা ৩ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছে ২-১ ব্যবধানে। প্রথম ম্যাচে তারা জিতেছে ১৯৬ রান তাড়া করে। এপ্রিলেই এসিসি প্রিমিয়ার কাপে খেলে গ্রুপ পর্বের ৪ ম্যাচ জেতার পর সেমিফাইনালে হেরে পরবর্তী সময়ে তৃতীয় হয়েছে নেপাল। এই আসরেই নেপালের দীপেন্দ্র সিং কাতারের বিপক্ষে এক ওভারে মেরেছেন ৬ বলে ৬ ছক্কা। এরই মধ্যে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে নেপালের তারকা লেগস্পিনার সন্দ্বীপ লামিচানে, আইসিসির বেঁধে দেওয়া সময়সীমার ভেতরে তাকেও দলভুক্ত করতে পারে নেপাল ক্রিকেট কর্র্তৃপক্ষ। সেটা হলে গ্রুপের সম্ভাব্য সহজতম ম্যাচটাই বাংলাদেশের জন্য হয়ে যেতে পারে কলঙ্কের অধ্যায়, যেটা হয়েছিল ২০১৪ সালে দেশে হংকংয়ের কাছে হেরে।
শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ আফ্রিকার লক্ষ্য তো আর শুধু গ্রুপ পর্ব নিশ্চিত করা নয়, আরও দূরে। শ্রীলঙ্কায় ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা, চারিথ আসালাঙ্কা ও জানিথ লিয়ানাগের নেতৃত্বে ৩টা দল করা হয়; লাল, হলুদ, সবুজ। ১ মে থেকে ১১ মে, এই তিন দল নিজেদের ভেতর মোট ৬টা ম্যাচ খেলে। জাতীয় দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ও খেলোয়াড় বাছাইয়ের জন্যই এই তিন দলের ম্যাচের আয়োজন করে ক্রিকেট শ্রীলঙ্কা। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে প্রস্তুতি ক্যাম্পে শ্রীলঙ্কা উড়িয়ে এনেছিল পাকিস্তানের পেস কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরামকেও।
প্রোটিয়াদের বেশিরভাগ ক্রিকেটারই খেলছেন আইপিএলে। এইডেন মার্করাম, হেনরিক ক্লাসেনরা তো আইপিএল খেলেই তৈরি হচ্ছেন বিশ্বকাপে এসে একই রকম ‘হাই ভোল্টেজ অ্যাকশন’-এর। যারা আইপিএল খেলছেন না তাদের বেশিরভাগই শুক্রবার থেকে জ্যামাইকায় শুরু হতে যাওয়া তিন টি-টোয়েন্টির সিরিজে খেলবেন। ওটোনিয়েল বার্টম্যান, রেজা হেনড্রিকস, বিয়র্ন ফরচুন, রায়ান রিকেলটনরা খেলবেন ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে।
গ্রুপের চার প্রতিপক্ষই কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং সামর্থ্য এই দুটোই যাচাই করে দেখতে মুখোমুখি হচ্ছে সমশক্তি কিংবা নিজেদের অবস্থানের চেয়ে ওপরের দলের সঙ্গে। ব্যতিক্রম কেবল বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে ৩ দিনের প্রস্তুতি ক্যাম্প আর জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ৫টা টি-টোয়েন্টিতে বাজে ব্যাটিংয়ের একের পর এক উদাহরণ সৃষ্টি করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আমেরিকাতে আগেভাগে গিয়ে ৩টা ম্যাচ খেলার কথা থাকলেও ঝড়বৃষ্টিতে শেষ পর্যন্ত কয়টা ম্যাচ মাঠে গড়ায় সেটাই প্রশ্ন। বছর দুয়েক আগে যে মানুষটা বলেছিলেন লক্ষ হচ্ছে পরের বিশ্বকাপ, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দেখে তার মুখেই শোনা গেছে, ‘ব্যাটিংটা ভয় ধরাচ্ছে’। এভাবেই সবসময় পরের বিশ্বকাপকে সামনে রেখেই এগিয়ে যায় বাংলাদেশ, অদেখা ভবিষ্যতের ভাবনায় বিকিয়ে যায় বর্তমান। আর ব্যবধান কমিয়ে আনে প্রতিপক্ষ।
