বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাধারণত আনফান্ডেড, ফান্ডেড, ডিফাইন্ড বেনিফিটস (ডিবি) ও ডিফাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস (ডিসি) এই ৪ ধরনের পেনশন পদ্ধতি চালু রয়েছে। আনফান্ডেড পেনশনে কোনো কর্মীকে চাঁদা দিতে হয় না। ফলে এজন্য কোনো তহবিলও সৃষ্টি হয় না। ফান্ডেড পেনশনে কর্মী বা প্রতিষ্ঠান বা উভয়কে চাঁদা দিতে হয়। ডিবি পদ্ধতি সরকারি কর্মচারীদের জন্য। ডিসি পদ্ধতিতে কর্মী বা প্রতিষ্ঠান থেকে একটি তহবিলে অর্থ জমা হয় এবং সেখান থেকেই ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। শুরুর দিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সব পেশাজীবী সংগঠন একে সাধুবাদ জানিয়েছিল। সে সময় ইতিবাচক মন্তব্য করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী ঘরানার শিক্ষক নেতারা। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে চাইছেন না। আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা। শিক্ষক নেতারা বলছেন, সরকারের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। সরকারের এ উদ্যোগটি সর্বসাধারণের জন্য ভালো। তাদের আপত্তি হচ্ছে, ‘প্রত্যয়’ নামে নতুন যে স্কিম ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি নিয়েই তাদের অনুযোগ। নতুন এ স্কিমে অবসরের পর এককালীন অর্থ পাওয়া যাবে না। একইসঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বৈষম্যের শিকার হতে হবে। এজন্য তারা এ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে চান না। পেনশন পেতে চান আগের নিয়মে। তবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘প্রত্যয়’ স্কিমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবসরের পর মাসিক ভাতা পাবেন। আগে প্রভিডেন্ট ফান্ডে সংস্থার দেওয়া অর্থ কর্মচারীর ‘কন্ট্রিবিউশন’, এরচেয়ে কম হলেও প্রত্যয় স্কিমে প্রতিষ্ঠানকে কর্মীর সমপরিমাণ টাকা জমা দিতে হবে। এমন শর্ত থাকায় পেনশনার অধিক লাভবান হবেন। সোমবার এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত হয়েছে ‘সর্বজনীন পেনশনের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাখ্যান বুয়েট শিক্ষকদের’ প্রতিবেদন। সর্বজনীন পেনশন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনকে বৈষম্যমূলক দাবি করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষক সমিতি। রবিবার মৌন মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকরা। এ সময় ‘বৈষম্যমূলক’ প্রজ্ঞাপনের বাস্তবতা তুলে ধরে অবিলম্বে সেটি বাতিলের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। মানববন্ধনে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘এটি কখনোই সর্বজনীন পেনশন স্কিম হতে পারে না। যদি সবাইকে একই পেনশন স্কিমের আওতায় আনা হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের কোনো অভিযোগ থাকবে না।’ এখানেই একটি বড় ধরনের প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার হবেন এমন যুক্তি দেখিয়ে এর বিরোধিতা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা।
অবসরকালীন নিশ্চয়তা একই রকম না থাকলে আগামীতে মেধাবীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আসতে নিরুৎসাহিত হবেন শিক্ষকদের এই যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। যেহেতু নতুন ধারণা, সবাইকে সময় দিতে হবে বিষয়টি বুঝতে। তখন সর্বস্তরের জনগণ এতে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করবে। তবে সব সরকারি পেশাজীবী বাধ্যতামূলক পেনশন স্কিমের আওতায় নেই, তাদেরও নিয়ে আসা যায় কি না, সেটাও ভেবে দেখা দরকার। আসলে অনেক বেশি প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষ যেন এই সুবিধা পান সেটা নিশ্চিত করা দরকার। যদি এই পেনশন সত্যিকার অর্থেই জনগণের কল্যাণের হয়, তাহলে সেটি গ্রহণ না করার কোনো কারণ নেই। এ বিষয়ে আপত্তি কেন উঠছে, কেনই বা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা সরকারেরই দায়িত্ব। আজ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন এর বিরুদ্ধে। ভবিষ্যতে বিষয়টি যাতে কোনো রাজনৈতিক দল লুফে না নেয়, সেদিকেও সচেতন থাকা জরুরি। যত দ্রুত সম্ভব, এ নিয়ে বিতর্ক বন্ধ হওয়া দরকার। বিষয়টি যেন সত্যিকারেরই সর্বজনীন হয়, এটাই প্রত্যাশা।
