রাইসির মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংকট

আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ১২:৪২ এএম

ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েই কেবল অনিশ্চয়তার মেঘ ডেকে আনেনি, ঘটনাটি একটি নতুন বলিরেখা যোগ করেছে মধ্যপ্রাচ্যর উত্তেজনায়, যা ইতিমধ্যেই গাজা যুদ্ধের কারণে কাঁপছে। যদিও গত রবিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দেশটির একটি সুশৃঙ্খল অবস্থা দেখানোর প্রচেষ্টা নিয়ে বলেছেন, হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় রাইসির মৃত্যু ইরানের সরকার ব্যবস্থার ওপর কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রসঙ্গত, প্রেসিডেন্ট যদিও ইরান সরকারের প্রধান তবে সেদেশের সর্বোচ্চ নেতা হলেন দেশটির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্র্তৃপক্ষ।

তবে রাইসির মৃত্যু দেশটির পলিসি বা নীতিনির্ধারণে তাৎক্ষণিক প্রভাব না ফেললেও, ৮৪ বছর বয়সী খামেনির উত্তরাধিকারী বেছে নেওয়ার দৌড়ে একটি অযাচিত সমস্য তৈরি করবে।  একজন কট্টর রক্ষণশীল, ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২১ সালে রাইসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে হাসান রুহানির মতো পূর্বসূরিদের মতো টানটান নয় বরং তিনি খামেনির প্রতি অনুগত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত শীর্ষ পদটি গ্রহণ করার সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাকেই ভাবছিলেন অনেকে। জাপানের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিক্স-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো সাচি সাকানাশি বলেছেন, ‘খামেনি বছরের পর বছর সময় দিয়ে প্রেসিডেন্ট রাইসিকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন যাতে তিনি নামে এবং বাস্তবে উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ নেতা হতে পারেন, কিন্তু পুরো ব্যাপারটিই এখন আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।’ খামেনির পুত্র, মোজতবা খামেনিকেও এই পদে বিবেচনা করা হয়, তবে সাকানাশি বলেছেন রাজতন্ত্রকে হটিয়ে ইরানি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে বংশগত উত্তরাধিকারীর ধারণা কীভাবে গৃহীত হবে তা স্পষ্ট নয়। একটি বিকল্প হলো বিশেষজ্ঞদের পরিষদের সদস্য বাছাই করা, যা সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু বর্তমানে এমন কোনো প্রার্থী নেই যিনি স্পষ্টভাবে বাকিদের থেকে আলাদা। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রধান খেলোয়াড়। রাইসির নেতৃত্বে ইরান সম্প্রতিক সময়ে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক ময়দানে রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে নৈকট্য বাড়াচ্ছিল। দেশটির নতুন নেতৃত্ব ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বৈশ্বিক পরিসরের উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, একজন ক্ষমতাসীন ব্যক্তির মৃত্যুর ৫০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলি ভাইজ সামাজিক প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (পুরাতন টুইটার) লিখেছেন ‘এর মানে হলো দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, একজন উত্তরসূরি আবির্ভূত হতে পারেন, যিনি রাইসির মতো রক্ষণশীল এবং সিস্টেমের প্রতি অনুগত।’ রাইসি ২০২৫ সালে পুনরায় নির্বাচন করবেন বলে আশা করা হয়েছিল, কিন্তু তার আকস্মিক মৃত্যু নির্ধারিত সময়ের আগেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রতিযোগিতা চালু করে দিয়েছে। ইরানে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীদের প্রথমে সাংবিধানিক কাউন্সিল দ্বারা যাচাই করা হয়, যারা সরকারের নীতির সঙ্গে একমত না বলে বিবেচিত হন তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। ইরানি জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশার মধ্যেই রাইসির মৃত্যুর ব্যাপারটি ঘটল। ২০২২ সালে ইরানের হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে একজন মহিলার মৃত্যুর ঘটনায় দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হলে সরকার একটি সহিংস ক্র্যাকডাউনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আহ্বানকে দমন করে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে আসছে। ইরানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪০ শতাংশ।

গত মার্চ মাসে ইরানের সংসদীয় নির্বাচনকে বিবেচনা করা হয়েছিল রাইসির প্রতি জনগণের আস্থার পরীক্ষা হিসেবে। ওই নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যাক কম ভোটার ভোট দিয়েছিলেন, মাত্র ৪১ শতাংশ। অনেক ভোটার ফাঁকা ব্যালট জমা দিয়েছেন। আরেকটি নির্বাচন ইরানের মধ্যপন্থি ভোটারদের মধ্যকার নানান অসন্তোষকে আরও বেশি করে প্রকাশ করতে পারে হোক সেটা ভোট না দিয়ে, কিংবা ফাঁকা ব্যালটের মাধ্যমে।

রবিবারের হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রনীতিও রয়েছে। কারণ, এই দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট রাইসির সঙ্গে নিহত হয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আব্দোল্লাহিয়ান। তিনি সৌদি আরব ও অন্যান্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করছিলেন। হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়েহের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার ক্ষেত্রেও তিনি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন।

গত ৭ অক্টোবরের পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাইসি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফিলিস্তিনির স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে সমর্থন করেছিলেন। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীও ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে। ইরান ও ইসরায়েল এপ্রিল মাসে একে অপরের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক পাল্টা হামলা চালায়। মার্কিন নিউজ ওয়েবসাইট এক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যেন আর না বাড়ে, সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে পরোক্ষ আলোচনা করেছেন। প্রসঙ্গত, দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ইরানের কূটনীতিকদের শীর্ষ পর্যায়ে কোনো রদবদল হলে দুই দেশের এই অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ভেঙে পড়তে পারে।

লেখক : স্টাফ রাইটার, নিক্কেই

এশিয়া ডট নিক্কেই থেকে ভাষান্তর : সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত