সুপার সাব জাহিদে কিংসের ট্রেবল

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ০৭:০৬ এএম

বুধবার সকালেও হয়তো জাহিদ হোসেন ভাবেননি মহা-ফাইনালে খেলার সুযোগ পেয়ে যাবেন। ম্যাচ বিরতিতে বসুন্ধরা কিংস কোচ অস্কার ব্রুজন টেকটিক্যাল কৌশলের অংশ হিসেবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মাঠে নামান তরুণ এই ডিফেন্ডারকে। সেই সুযোগটা দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে বসুন্ধরাকে জাহিদ এনে দেন অতিপ্রত্যাশিত ট্রেবল। ময়মনসিংহের রফিকউদ্দিন ভুঁইয়া স্টেডিয়ামে ফেডারেশন কাপের রোমাঞ্চকর ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে তার গোলে মোহামেডানকে ২-১ ব্যবধানে হারায় বসুন্ধরা। স্বাধীনতা কাপ, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের পর ফেডারেশন কাপ জিতে ২০১২-২০১৩ মৌসুমে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের পাশে বসল বসুন্ধরা। পেশাদার যুগে এই ঘটনা ঘটল দ্বিতীয়বারের মতো।

অথচ এই ফাইনালটা জিততে পারত মোহামেডানও। তাতে তারা বসতে পারত চিরশত্রু আবাহনীর পাশে। জেতা হতো ১২টি শিরোপা। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের ৬৩ মিনিটে নাইজেরিয়ান ইমানুয়েল সানডের গোলে লিড পেয়েছিল গত আসরের চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান। সেই লিড ধরে রেখে নব্বই পার করার লক্ষ্য ছিল তাদের। তবে সেটা হতে দেননি বসুন্ধরার ব্রাজিলিয়ান তারকা মিগেল ফিগেইরা। ৮৭ মিনিটে একক প্রচেষ্টায় চোখ ধাঁধানো গোলে ম্যাচটা তিনি নিয়ে যান অতিরিক্ত সময়ে। আর ১০৫ মিনিটে মোহামেডান গোলরক্ষক সুজন হোসেনের মুহূর্তের ভুলের সুযোগে পুরনো দলের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করে ফেলেন জাহিদ। বাকিটা সময় সেই লিড ধরে রেখে এই মৌসুমে শতভাগ সাফল্য কুড়িয়ে নেয় বসুন্ধরা।

৪-১-৪-১ ফরম্যাশনে খেলতে নেমে বসুন্ধরা শুরুতে চেয়েছিল গোল আদায় করে নিতে। তবে তাদের আক্রমণগুলো ঠিক পাকছিল না। একটু গুছিয়ে মোহামেডানও গিয়েছে আক্রমণে। তবে গোলটা অধরা থাকে দুদলেরই। গোল না হলেও উত্তেজনার পারদ বারবার চড়েছে প্রথমার্ধে। ম্যাচের ২৭ মিনিটে মোহামেডানকে বাঁচান গোলরক্ষক সুজন। ডান দিক থেকে রাকিব হোসেনের আড়াআড়ি পাসে ডরিয়েলটন গোমেজের টোকা পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে কোনোমতে পা দিয়ে আটকে দেন মোহামেডান গোলরক্ষক। ৩৬তম মিনিটে আবারও আক্রমণে যায় কিংস। এবার রাকিবের কাটব্যাকে ভালো জায়গা পেয়েও গোল করতে পারেননি সোহেল রানা জুনিয়র। তার এলোমেলো শট চলে যায় অনেক বাইরে। একটু পর মিগেলের বাঁকানো ফ্রি কিক আয়ত্তে নেন সুজন।

ম্যাচের ৩৯ মিনিটেই দশ জনের দলে পরিণত হতে পারত বসুন্ধরা কিংস। শুরু থেকেই শরীরী ফুটবল খেলা বিশ্বনাথ প্রথম হলুদ কার্ড দেখেছিলেন আগেই। ৩৯ মিনিটে আক্রমণে ওঠা ইমানুয়েল সানডেকে বাজেভাবে ফাউল করলেও রেফারির বদান্যতায় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেননি কিংস ডিফেন্ডার। রেফারির এই সিদ্ধান্তের জোর প্রতিবাদ করেছেন মোহামেডানের খেলোয়াড়রা। তাতে অবশ্য লাভ হয়নি। দুই মিনিট পর মোজাফ্ফরভের পাস ধরে সুলেমান দিয়াবাতেকে বল বাড়িয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন ইমানুয়েল সানডে। অধিনায়কের ফিরতি পাসে তার নেওয়া শট এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বাইরে যায়। একটু পর দিয়াবাতের কাছের পোস্টে নেওয়া শট আটকে দেন কিংস গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণ। 

নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া বিশ্বনাথকে মাঠে রাখার ঝুঁকিটা দ্বিতীয়ার্ধে নিতে চাননি কিংস বস ব্রুজন। তাকে তুলে নিয়ে তিনি নামান তরুণ জাহিদ হোসেনকে। বিরতি থেকে ফিরে কিংসের ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ডরিয়েলটন গোলের ভালো সুযোগ নষ্ট করেন রাকিবের অ্যাসিস্ট পেয়ে। ৫৮ মিনিটে মোহামেডান কোচ আলফাজ আহমেদ একটা ভালো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। আসিফের জায়গায় তিনি আক্রমণের শক্তি বাড়াতে মাঠে পাঠান শাহরিয়ার ইমনকে। এই ফরোয়ার্ড নামতেই মোহামেডান খোলস ছেড়ে অন্য রূপে। প্রথমে এই তরুণের দূরপাল্লার শট কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন কিংস কিপার শ্রাবণ। তিন মিনিট পর ইমনের আলতো টোকায় ডানপায়ের জোরালো শট নিয়েছিলেন মোজাফফরভ। সেটাও শ্রাবণের কৃতিত্বে পোস্টে থাকেনি। মিনহাজ রাকিবের কর্নার থেকে দিয়াবাতের হেড ফের রুখে দেন এই কিপার। তবে ৬৩ মিনিটে আর পারেননি শ্রাবণ। ইমনের পাস ধরে দুই জনকে কাটিয়ে জায়গা করে নিয়ে বাঁ পায়ের অসাধারণ শটে জাল খুঁজে নেন ইমানুয়েল সানডে। পিছিয়ে পড়ে মরিয়া আক্রমণে যায় কিংস। তবে পাঁচ ডিফেন্ডারে সাজানো মোহামেডান রক্ষণভাগে বারবার সেগুলো বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। ৮১ মিনিটে রবিনহোর দূরপাল্লার শট সুজন ফিরিয়ে দেন। পাল্টা আক্রমণ থেকে দিয়াবাতে পারেননি শ্রাবণকে হারাতে। আরেকবার বুক চিতিয়ে মোহামেডান অধিনায়ককে হতাশ করেন এই গোলকিপার। ৮৪ মিনিটে আরেকটি ভালো সুযোগ এসেছিল। তবে শট জায়গা মতো নিতে পারেননি রবিনহো। মোহামেডান যখন টানা শিরোপা জয়ের ক্ষণ গুনছে, ঠিক তখনই স্বরূপে আবির্ভূত হন মিগেল। ৮৭ মিনিটে প্রায় মাঝ মাঠ থেকে একক চেষ্টায় বল নিয়ে আক্রমণে ওঠার পথে চারজনকে কাটান এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। এরপর বাঁ পায়ের অসাধারণ শটে বল জালে জমা দেন। ম্যাচ বাঁচানো গোলের পর এই ব্রাজিলিয়ানের জার্সি খুলে করা বুনো উদযাপনটা ছিল দেখার মতো।

নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হওয়ায় খানিকটা হতোদ্যম হয়ে পড়ে মোহামেডান। সেটা কাটিয়ে দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে বাঁ দিক থেকে সানডের ডান পায়ের শট ঠেকিয়ে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময় নিয়ে যান শ্রাবণ। প্রচ- গরমের কারণে দুদলই অতিরিক্ত সময় শুরু করে ধীরলয়ে। আক্রমণে যাওয়ার চেয়ে বল নিয়ন্ত্রণের মনোযোগ ছিল তাদের। তবে ১০৫ মিনিটে জাহিদের নায়ক বনে যাওয়ার ক্ষেত্রটা তৈরি করেন কিংস অধিনায়ক রবিনহো। তার ডান পায়ের শট বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে কর্নারের বিনিময়ে ঠেকান সুজন। মিগেলের কর্নার ঠিকঠাক আয়ত্তে নিতে পারেননি সুজন। সেটা লুফে নিতে লাফিয়েছিলেন মোহামেডান কিপার। তবে সেই মুহূর্তে দিয়াবাতেকে হালকা পুশ করেন কিংস ডিফেন্ডার ববুরবেক। দিয়াবাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গিয়ে পড়েন সুজনের শরীরে। সেই মুহূর্তেই বলটা গ্লাভস ফসকায় সুজনের। যা পেয়ে ডান পায়ের নিখুঁত ভলিতে গোল করেন জাহিদ।

সেই গোলের প্রতিবাদে মাঠের বাইরে চলে আসেন মোহামেডানের খেলোয়াড়রা। কোচ-ম্যানেজাররা খেলোয়াড়দের বাইরে নিয়ে এসে রেফারিদের সঙ্গে বিতন্ডায় জড়িয়ে যান।  প্রায় ১২ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। এরপর রেফারির সিদ্ধান্ত মেনে খেলতে নেমে গোল পেতে পারত মোহামেডান। তবে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের শেষ মিনিটে পোস্ট গলে বেরিয়ে গেল মোহামেডানের শিরোপা। মার্কার ইয়াছিন আরাফাতকে ফাঁকি দিয়ে সানডের পাসে কোনাকুনি শট নিয়েছিলেন শাহরিয়ার ইমন। তবে তা দূরের পোস্টে হাওয়া লাগিয়ে বাইরে গেলে স্বাধীনতা কাপের ফাইনালের মতো শনিবারও তাদের সঙ্গী হয় হারের হতাশা।

এটা কিংসের তৃতীয় ফেডারেশন কাপ জয়। এর আগেও দু’বার ট্রেবলের সম্ভাবনা জাগিয়ে পারেনি। পঞ্চম লিগ জয়ের মৌসুমে সেই আক্ষেপ ঘুচল দেশসেরাদের। তবে এই অর্জনটা একটু হলেও ম্লান হয়েছে রেফারির জসিম আক্তারের প্রশ্নবিদ্ধ বাঁশিতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত