শাহীনের বাংলোতে বসত আড্ডা, রাতে শোনা যেত ঢাকঢোলের আওয়াজ

আপডেট : ২৪ মে ২০২৪, ১২:৪৮ পিএম

ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ওরফে আনার হত্যার মূলহোতা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্বর্ণ চোরাকারবারি আক্তারুজ্জামান শাহীনের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার এলাঙ্গী গ্রামে। এলাঙ্গী গ্রামের মাঠের মধ্যে ২৭ বিঘা জমির ওপর আছে শাহীনের আলিশান বাংলো বাড়ি। বাংলোতে আছে সুইমিং পুল, ক্রিকেট, গলফ-সহ জিমের ব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে এসে এখানে প্রায়ই থাকতেন তিনি। এই বাংলোতে আসা-যাওয়া ছিল শাহীনের বন্ধু আনোয়ারুল আজীমের। সেখানেই দুজনের একান্তে আলাপ হতো। শুধু তিনি না, মাঝে-মধ্যে গাড়ি নিয়ে বাংলোতে অজ্ঞাত লোকজনকে আসা-যাওয়া করতে দেখেছে গ্রামবাসী।

শাহীন এলাঙ্গী গ্রামের আসাদুজ্জামান কাটু মিয়ার ছেলে। কাটু মিয়ার ৫ সন্তান। শাহীন সবার ছোট। শাহীন দেশে লেখাপড়া শেষ করে সিঙ্গাপুর যান। সেখানে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনা করেন। পড়া শেষে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার কিছুদিন পর ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ১০/১১ বছর আগে এলাঙ্গী গ্রামের মাঠের মধ্যে ২৭ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন বিশাল বাংলো বাড়ি। এই জমিতে এক সময় ছিল ইটের ভাটা। সেই ভাটা তুলে দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলো বাড়িটি চারপাশ ঘিরে ফেলেন শাহীন। বাড়িতে প্রবেশ করার মাত্র একটি রাস্তা। বাড়িটি চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা, চারপাশে ঝোপঝাড়। আছে সিসি ক্যামেরা। বিদেশি কুকুর, অনেক কর্মচারী, ভিআইপি আসবাব দিয়ে সাজানো। অনেক অর্থ খরচ করে বাংলোতে নিয়েছেন বিদ্যুতের লাইনও। আমেরিকা থেকে এলে প্রায়ই শাহীন থাকতেন এই বাংলোতে। মাঝেমধ্যে গাড়িতে করে আসা-যাওয়া করতেন তার সঙ্গের লোকজনও। তার রয়েছে নিজস্ব বাবুর্চি। রান্না করে চলত খাওয়া-দাওয়া ও ভূরিভোজ। এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এই বাংলোটিতে আর কেউ নেই।

এলাঙ্গী গ্রামের লিয়াকত আলী ও লোকমান হোসেন জানান, দীর্ঘ ১০/১১ বছর আগে আক্তারুজ্জামান শাহীন এই বাংলোটি নির্মাণ করেছেন। এর ভেতরে কী হয় আমরা বলতে পারব না। মাঝেমধ্যে দেখি গাড়িতে করে লোকজন আসা-যাওয়া করেন। গাড়ির মধ্যে কারা থাকেন তাদের দেখা যায় না। বাইরে থেকে অনেক সময় রাতে ঢাকঢোলের আওয়াজ শোনা যায়।

কোটচাঁদপুর শহরের স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শাহীন  মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কিছুদিন চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাকরিতে যান। অল্প কয়েক মাস চাকরির পর ছেড়ে দিয়ে  ঢাকায় ব্যবসা শুরু করেন। দেশে ও দেশের বাইরে নানা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে তার কী ব্যবসা ছিল, কেউ তা বলতে পারেন না। একসময় যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান, সেখানে ব্যবসা করেন বলে সবাই জানতেন। মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসতেন, আবার চলে যেতেন। তবে এলাকার রাজনীতিতে এবং নির্বাচন এলেই অর্থ ছড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন শাহীন।

শাহীনের ভাই কোটচাঁদপুর পৌর মেয়র সহিদুজ্জামান সেলিমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, শাহীন আমার ছোট ভাই। সে আমেরিকা থেকে মাঝেমধ্যে বাড়ি আসে। আমার পৌর নির্বাচনের সময় এসে বেশ কিছুদিন ছিল। আমার নির্বাচন শেষে আবার চলে যায় সে। সর্বশেষ গত রমজানের আগে একবার এসেছিল। এখানে আসার পর সে তার বাংলোতে থাকে। চলে যাওয়ার আগে বাড়ি এসে সবার সঙ্গে দেখা করে যায়। এমপি আনারের সঙ্গে শাহীনের বন্ধুত্ব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শাহীন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। লেখাপড়ার চলাকালে তাদের বন্ধুত্ব ছিল না। এখন আমেরিকার নাগরিক। আমেরিকা চলে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করার সময় থেকে বছর দশেক হবে তাদের বন্ধুত্ব হয়েছে। শাহীন কী ব্যবসা করত আমি জানি না। তিনি আরও বলেন, শাহীন এই বাংলো ছাড়াও আমেরিকা থেকে এসে  ঢাকার গুলশানের একটি ভাড়াবাড়িতে থাকে।  সে বর্তমানে বসুন্ধরায় নতুন বাড়ি করছে।

কালীগঞ্জে আ.লীগের দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলনসহ কর্মসূচির ডাক : কলকাতায় ঝিনাইদহ-৪ কালীগঞ্জ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার খবরে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা কালীগঞ্জবাসী। তার লাশ উদ্ধার না হওয়াতে মৃত্যু নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। গতকাল এমপির শহরের বাসভবন ও পাশেই দলীয় কার্যালয়ের সামনে সহস্রাধিক নারী-পুরুষ জনতার ভিড় জমে। তার মৃত্যুর খবরে কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বেলা ১২টার পর ভূষণ রোডের দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা, দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন পৌর আ.লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক ও পৌর মেয়র আশরাফুল আলম আশরাফ।

গা  ঢাকা দিয়েছে শিমুল ভূঁইয়ার পরিবার : ভারতে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম হত্যকান্ডে ভাড়া করা হয় খুলনাঞ্চলের শীর্ষ সন্ত্রাসী শিমুল ভূঁইয়াকে। শিমুল ভূঁইয়ার পরিবারের সদস্যরা গা  ঢাকা দিয়েছেন। খুলনার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে নারাজ। গা ঢাকা দিয়েছে শিমুল ভূঁইয়ার পরিবার।

জানতে চাইলে ফুলতলা থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, শিমুল ভূঁইয়া ও আমানউল্লাহ দুজন একই ব্যক্তি কি না সেটি কোনো সংস্থাই আমাদের কাছে তথ্য চায়নি। তবে এটি জাতীয় ইস্যু তাই কেউ তথ্য না চাইলে নিজে থেকে যাচাইয়ের আগ্রহ নেই।

শিমুল ভূঁইয়ার বাড়ি খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউনিয়নে। ওই এলাকার লোকজন জানান, ছবি দেখে এলাকার মানুষ নিশ্চিত হয়েছে আমানুল্লাহ সাঈদই শিমুল ভূঁইয়া। তাদের ধারণা, শিমুল ভূঁইয়ার ছোট ভাই শিপলু ভূঁইয়া দামোদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। সেই সুবাদে জন্মসনদ পরিবর্তন করা খুবই সহজ কাজ। এই সুযোগে জন্মসনদ পরিবর্তন করে জাতীয় পরিচয়পত্রে আমানুল্লাহ সাঈদ করা হয়েছে। শিমুল অনেক মামলায় ভিন্ন নাম ব্যবহার করেছেন এমনটিই জানান তারা।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী শিমুল ভূঁইয়া পরিবারের প্রায় সব সদস্যের নাম চরমপন্থি দলের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। পরিবারটির দুই প্রজন্ম ধরেই খুন-গুম, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত। এই পরিবারে খুনের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম হত্যাকান্ড।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, শিমুল ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে খুনসহ অন্তত দুই ডজন মামলা আছে। গণেশ নামের এক ব্যক্তিকে খুন করে যশোরের অভয়নগর থানার এক মামলায় আমানুল্লাহ সাত বছর জেল খাটেন। ইমান আলী নামের এক ব্যক্তিকে খুনের ঘটনায় ২০০০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জেল খাটেন।  জেল থেকে বের হয়ে রাজনৈতিক শেল্টার খুঁজতে থাকে ভূঁইয়া পরিবার। এই সময় আওয়ামী লীগে যোগ দিতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত