বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রেডিয়েশন ভীতি

আপডেট : ৩১ মে ২০২৪, ০৪:০৭ এএম

প্রযুক্তি আমাদের জীবনে আশীর্বাদ ও অভিশাপ দুই-ই বয়ে নিয়ে আসে। মোবাইল প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে তেমনি এর আছে নানা ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। মোবাইল টাওয়ার থেকে বিকিরিত রেডিয়েশন তেমনি একটি। এই রেডিয়েশন ক্যানসারসহ নানা প্রাণঘাতী রোগের কারণ হতে পারে। এই কারণে, মোবাইল কোম্পানিগুলো আরও উন্নত সেবা দেওয়ার জন্য বেশি করে টাওয়ার বসাতে চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে রেডিয়েশনের ভয়ে এই সংখ্যা সীমিত রাখতে হয়। তবে বাংলাদেশে রেডিয়েশন-ভীতি নিয়ে দুই ধরনের মতামত পাওয়া গেছে।

দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, রেডিয়েশন-ভীতি যথার্থ নয় বলে প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের গবেষণায় স্বাভাবিকের চেয়ে রেডিয়েশনের মাত্রা বেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের কর্মকর্তারা বলেছেন, স্পেকট্রাম বা ফ্রিকোয়েন্সি এবং টাওয়ারের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে মোবাইল নেটওয়ার্কের গুণগত মান। তারা জানাচ্ছেন, সমস্যা হলো টাওয়ার স্থাপন নিয়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে  ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার নতুন সাইটে মানুষের আপত্তির কারণে পর্যাপ্ত টাওয়ার স্থাপন করা যাচ্ছে না।

অপারেটররা বলছেন, গত বছর ৫০০ টাওয়ারের চাহিদা থাকলেও মাত্র ৩০টি টাওয়ার বসানো গেছে। পুরনো টাওয়ার নিয়েও অনেক জায়গায় বিপাকে পড়েছেন তারা। ভবনমালিকের আপত্তি, রেডিয়েশন-ভীতি এসব কারণে প্রতি বছর গড়ে ২০০ পুরনো টাওয়ার সরিয়ে নিতে হচ্ছে। বিটিআরসির তথ্যমতে, গত এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোবাইল টাওয়ার ৪৫ হাজার ২৩১টি।

বিটিআরসি সম্প্রতি জানিয়েছে যে, তারা রেডিয়েশন পরিমাপ করে দেখেছেন যে এর মাত্রা আন্তর্জাতিক মানদ-ের বেঁধে দেওয়া বিপজ্জনক মাত্রার চেয়ে নিচে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশন প্রোটেকশন (আইসিএনআইআরপি) ও ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের আদর্শ মান অনুযায়ী, রেডিয়েশনের অনুমোদিত সীমা প্রতি বর্গমিটারে ২.১০৬ মিলিওয়াট (এমডব্লিউ/এম ২)। বিটিআরসি বিভিন্ন এলাকায় রেডিয়েশনের বিকিরণ পরিমাপ করে পেয়েছে গড়ে ০.৫৮ মিলিওয়াট থেকে ০.৭৭ মিলিওয়াট। এ ছাড়াও রেডিয়েশন সমস্যা এড়ানোর জন্য টাওয়ার শেয়ারিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এক টাওয়ার থেকে অন্য অপারেটররাও সেবা নিতে পারবে। এতে টাওয়ার সংখ্যা কম হলেও সেবাদানে বিঘœ ঘটবে না।

আবার, মোবাইল সেবাদাতা সংস্থাগুলো বলছে টাওয়ারের রেডিয়েশন থেকে মানবদেহে ক্যানসার, পুরুষের বন্ধ্যত্ব, শিশুর জন্মত্রুটি, ফসলি জমি নষ্ট হওয়া, গাছপালা মরে যাওয়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও এসবের শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাদের দাবি, এই অমূলক ভীতির কারণে সড়ক বিভাগে তাদের ছোট ছোট টাওয়ার স্থাপন করতে হচ্ছে যা একই সঙ্গে ব্যয়বহুল এবং এগুলোর মাধ্যমে কাক্সিক্ষত সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে করা এক গবেষণায় দেশের কিছু জায়গায় টাওয়ার-রেডিয়েশন আন্তর্জাতিক মানদ-ের চেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে। শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩৬১টি স্থানে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের নির্ধারিত মানদ-ের চেয়ে বেশি তো বটেই, এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়েও বেশি।’ তবে তিনি এও জানান যে, এই রেডিয়েশনের ক্ষতিকর প্রভাব থাকলেও মানবদেহের ওপর ঠিক কীরকম প্রভাব পড়ে তা নিয়ে এখনো বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাকি। তিনি অভিযোগ করেন, ‘বিটিআরসি রেডিয়েশন নিয়ে যে ফল প্রকাশ করেছে তাতে সঠিক প্যারামিটার অনুসরণ করা হয়নি। এটাকে স্ট্যান্ডার্ড বলা যায় না। মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের নীতিমালা অপারেটররা মানছেন না। এ ক্ষেত্রে বিটিআরসির ভূমিকা নীরব।’ তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণস্বাস্থ্যর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে, মোবাইল রেডিয়েশনের প্রভাব নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এর সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ জরুরি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত