মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বাজেটে উপকূলীয় অর্থনীতি বিবেচনায় আসুক 

আপডেট : ৩১ মে ২০২৪, ০৪:১১ এএম

বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার, এর মধ্যে সুন্দরবন ১২৫ কিলোমিটার, নদীর মোহনা ও ছোট-বড় দ্বীপমালা ২৭৫ কিলোমিটার, সমতল ও সমুদ্র সৈকত ৩১০ কিলোমিটার। টেকনাফের নাফ নদীর মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১৪টি উপকূলীয় জেলায় বিস্তৃত বাংলাদেশের উপকূলেই দেশের প্রধান দুটি সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা। বিশ্বের সেরা গহিন গরান বন সুন্দরবন এবং বিশ্বের অন্যতম অখ-িত (আনব্রোকেন) সমুদ্র সৈকত বা বেলাভূমি কক্সবাজার অবস্থিত। দেশের শতকরা ২৫ ভাগ জনগণ যেমন এই উপকূল অঞ্চলে বসবাস করে তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির কমবেশি প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ অবদানও এই অঞ্চলেরই। অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চল, এর অবকাঠামো এবং বসবাসকারী জনগণের অর্থনৈতিক জীবন নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্বিপাক, বৈষম্য, অবহেলা আর অমনোযোগিতার শিকার। অথচ এটা ঠিক বঙ্গোপসাগরের তীরে ও বিশ্বের সেরা গহিন গরান বনের নীড়ে গড়ে ওঠা গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশ যেন প্রকৃতির এক বিচিত্র বিলাস। তার মাথার ওপর হিমালয় পর্বত, সাইবেরিয়ার হিমবাহ ঠেকিয়ে চলে অবিরত, পায়ের নিচে বঙ্গোপসাগর তার ধোয়ায় পা প্রতিনিয়ত। সে কারণেই কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর দাঁড়িয়েও চরম নয় তার আবহাওয়া, নাতিশীতোষ্ণতার, মৌসুমি বায়ুর বরমাল্য বরিষণে বাংলা সতত সবুজ শস্যশ্যামল। 

প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল প্রকৃতির বিরূপ আচরণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ শিকার সবসময়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে এটা প্রতিভাত হয়ে ওঠে যে, জাতীয় অর্থনীতির অন্তঃসলিলা শক্তির (রেজিলিয়েন্ট পাওয়ার) উদ্বোধন যার হাতে সেই সবচেয়ে বেদনায় বিবর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চল যেন শুধু দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা সূত্রে সমুপস্থিত, আকালের দিনে নাকালের মোহনায়, এবং একমাত্র মিডিয়ায়।

পাঁজি-পুঁথি ও সরকারি পরিসংখ্যান ঘেঁটে জানা যায় যে ১৭৯৭ থেকে শুরু করে এই সেদিন ২৭ মে, ২০২৪ তারিখে সর্বশেষ রিমাল পর্যন্ত মোট ৪৯৬ বার মাঝারি ও মোটা দাগের জলোচ্ছ্বাস, গোর্কি, হারিকেন, সিডর, আইলা, নার্গিস, মহাসেন, ফণি, বুলবুল ও আমফান, ইয়াস, রিমাল বাংলাদেশের উপকূলকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ১৭৩ বছরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে ৩২৯টি, এসেছে গড়ে ৫-১০ বছর পর পর, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে বিগত ৫৩ বছরে ১৭৪টি ঝড় বা জলোচ্ছ্বাস ঘটেছে ঘন ঘন। বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। 

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পড়ে, তাপমাত্রার পরিবর্তনপ্রসূত তারতম্য সূত্রে সমুদ্রের তলদেশ স্ফীত হয়ে ওঠার ফলে পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে চলেছে বিশ্বের প্রায় সব সমুদ্র উপকূল বেষ্টনীতে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বাংলাদেশের জন্য তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের অশনি সংকেত দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল, বিশেষ করে অদূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল সামান্য জলোচ্ছ্বাসের ছুতানাতাতেই তলিয়ে যাচ্ছে, তা উদ্ধারে বশংবদ কোনো কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। সুন্দরবনের প্রাণিবৈচিত্র্য বিপন্ন হতে চলেছে এর প্রভাবে। এবার রিমালের অকস্মাৎ জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের মৃত হরিণ ভেসে এসেছে লোকালয়ের নদীতে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরস্থ তিন শতাধিক সুপেয় পানির জলাধার (যা বন্যপ্রাণীদের একমাত্র পানীয় অবলম্বন) লোনা পানিতে একাকার হয়ে যাওয়ায় সেখানকার প্রাণিসম্পদ আজ নিদারুণ সংকটে।

সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত, মাছের ঘের, বিধ্বস্ত হয়েছে বাড়িঘর। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বেশ কিছু উপজেলা।  ঘূর্ণিঝড় রিমালে উপকূলীয় এলাকার ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৫ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে, আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ঘরবাড়ি। বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রশাসন জানাচ্ছে, রাস্তার ওপর গাছ পড়ে থাকায় অনেক এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা চালানো যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে ঝড়ের প্রভাব পুরোপুরি না কমায় শুরু করা যাচ্ছে না উদ্ধার অভিযান। বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য মাছের ঘের, ফসলি জমি তলিয়ে গেছে পানির নিচে।

অতীব দুঃখজনক এই যে, সামান্য ঝড়ে এতগুলো বেড়িবাঁধ ধসে পড়ত না। বাঁধ ভেঙেছে আমতলী, পরশুনিয়ার বাঁধ। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বাঁধ টপকে পানি ঢুকেছে লোকালয়ে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে খুলনার দাকোপ, পাইকগাছা ও কয়রার ৩৬ স্থানে বাঁধে ভাঙন ধরেছে। লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয়েছে বহু এলাকা। ভেঙে গেছে ঘরবাড়ি। ভেসে গেছে মাছের ঘের।

উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পর্কে ২০১৬ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত ‘বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে মার্চে’ শীর্ষক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা থেকে উপকূলীয় এলাকার জমি ও ঘরবাড়ি রক্ষায় ছয় জেলায় নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ৬২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এ কাজে ব্যয় হবে ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পের নাম ‘উপকূলীয় বেড়িবাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প, ফেজ-১’। প্রকল্পের আওতায় খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার ১৭টি পোল্ডারে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হবে। ২০২০ সালের ১৪ জুলাই সংবাদমাধ্যমে ‘টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকার ৮ হাজার কোটি টাকার ৪টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম। চলতি অর্থবছরে (২০২০) প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এছাড়া উপকূল উন্নয়ন বোর্ড গঠনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। ‘উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে জরুরি করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হবে এই বিষয়ে ২০১৯ সালের ১২ মে একটি জাতীয় দৈনিকে বলা হয় ভয়ানক আতঙ্কের কথা হলো, দেশের উপকূলীয় এলাকার ৮ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালে আইলার পর উপকূল এলাকার এসব বাঁধের অনেক জায়গা ভেঙে গিয়েছিল, অনেক জায়গা বানের তোড়ে ভেসে গিয়েছিল; কিন্তু তার বড় অংশ এখনো যথাযথভাবে মেরামত হয়নি। তার মানে গোটা উপকূলীয় এলাকা এখন অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, কোমেনের আঘাতে ১৯ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেগুলো মেরামত এখনো শেষ হয়নি। সরকারের হিসাবে দেশে ১৯ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই উপকূলীয় এলাকায়। উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে চলে আসার পর টানা কয়েক বছর ফসল হয় না। মিঠাপানির মাছ ও অন্যান্য প্রকৃতিবান্ধব কীটপতঙ্গের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে উপকূলের বেড়িবাঁধ সুরক্ষিত রাখায় অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। উদ্বেগের বিষয়, বেড়িবাঁধের রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ সব সময়ই অপ্রতুল। পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের অধীনে থাকা বেড়িবাঁধের ওপর স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘেঁষতে দেয় না। কিন্তু অনেক জায়গাতেই দেখা গেছে, বাঁধে সামাজিক বনায়ন করা হলে কিংবা এলাকাবাসী ঘরবাড়ি তুললে বাঁধ অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে। নিজেদের স্বার্থেই এলাকাবাসী বেড়িবাঁধকে সুরক্ষিত রাখতে উদ্যোগী হয়। এ কারণে বাঁধগুলোর সুরক্ষার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিস্বার্থের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানো যেতে পারে। আমাদের দেশে দুর্যোগের আগে নানা রকমের প্রস্তুতি নেওয়া এবং দুর্যোগের পরপর সব ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। এ ছাড়া সরকারি বরাদ্দের অর্থ নয়ছয়ের চেষ্টাও দেখা যায়। জোয়ারের পানি ঠেকানোর রিংবাঁধ নির্মাণ, বাঁধ মেরামত, সংস্কার প্রভৃতি নামে প্রতি বছর নেওয়া হয় বিভিন্ন প্রকল্প। এসব প্রকল্পে অর্থ নয়ছয়ের ঘটনাও ঘটে। বর্ষা এলে বাঁধ ভেঙে যায়। নতুন প্রকল্পের নামে শুরু হয় নতুন বরাদ্দ। এভাবে বছরের পর বছর উপকূলীয় বাঁধের সংস্কারের নামে চলে অর্থের অপচয়। এই মনোভঙ্গিরও অবসান জরুরি।

লক্ষ করার বিষয় যে, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ তদারকি, গুণগতমান পরীক্ষা ও একে টেকসইকরণে দায়িত্বশীল বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং কারিগরি  নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা রয়েছে। একইসঙ্গে রয়েছে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব।

উপকূলীয় অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়ন স্বার্থে বেড়িবাঁধ টেকসই আকারে নির্মাণসহ সুন্দরবন সুরক্ষা এবং উপকূলীয় জনপদ, জীবন ও জীবিকা ও কৃষি অর্থনীতির দুর্দশা লাঘব-উত্তর বিকাশকে গুরুত্ব দিতে প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রদত্ত বরাদ্দ ও ইতিমধ্যে ঘোষিত উদ্যোগ ও নির্দেশনা যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর কড়া নজরদারি, আগামী অর্থবছরে বিশেষ বরাদ্দদান ও তা বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা।

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ‘উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করতে হবে। উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলে, অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশ জিডিপি সরবরাহকারী উপকূলীয় অঞ্চলের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকান্ড, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে উপর্কূল,  সুন্দরবন ও লোকালয় রক্ষার সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়াস প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করবে। 

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব। উপকূলীয় কৃষি অর্থনীতির গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত