আগামীকাল ২ জুন মেক্সিকানরা তাদের দেশের সর্ববৃহৎ নির্বাচনে নতুন নেতা নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। এই নির্বাচনে স্থানীয় ও ফেডারেল পর্যায়ের ২০৭০০ পদের বিপরীতে নাগরিকরা ভোট প্রয়োগ করবেন, যার মধ্যে ৫০০ আসন প্রতিনিধি পরিষদের ও ১২৮ আসন সিনেটে। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে রক্ষণশীলরা আবারও পরাজিত হতে যাচ্ছে, যার বিপরীতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস ‘ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাডর’ (জনগণের কাছে যিনি ‘আমলো’ নামে পরিচিত) সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হতে যাচ্ছে। ওব্রাডরকে বলা হচ্ছে, মেক্সিকোর ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে এবার ওব্রাডর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন না, কিন্তু তার প্রভাব থাকছে।
নির্বাচনে দুই প্রধান জোট প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবতীর্ণ হচ্ছে। একটি হচ্ছে তিনটি দলের সমন্বয়ে রক্ষণশীল জোট যাদের বলা হচ্ছে ‘স্ট্রেন্থ অ্যান্ড হার্ট ফর মেক্সিকো’। অন্যটি মরেনা পার্টির নেতৃত্বাধীন বামপন্থি জোট, যাকে বলা হচ্ছে ‘লেটস কিপ মেকিং হিস্ট্রি’। রক্ষণশীল জোটের সঙ্গে যুক্ত ন্যাশনাল অ্যাকশন পার্টি (পিএএন), ইনস্টিটিউশনাল রেভল্যুশনারি পার্টি (পিআরআই) ও ডেমোক্র্যাটিক রেভল্যুশনারি পার্টি (পিআরডি)। বিংশ শতাব্দীতে পিআরআই ছিল মেক্সিকোর সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল যারা ক্ষমতায় ছিল একাধারে ৭১ বছর। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ‘লেটস কিপ মেকিং হিস্ট্রি’ সমর্থিত প্রার্থী মেক্সিকো সিটির সাবেক মেয়র ক্লডিয়া শিনবাউম ‘আমলো’-এর উত্তরাধিকার হিসেবে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। তিনি ক্ষমতাসীন দল মোরেনা নেতৃত্বে, গ্রিন ইকোলজিক্যাল পার্টি অব মেক্সিকো (ভার্ডে) ও লেবার পার্টি (পিটি) জোট সমর্থিত প্রার্থী। অন্যদিকে রক্ষণশীল জোট প্রার্থী সাবেক সিনেটর ও ব্যবসায়ী অটোমি আদিবাসী গোষ্ঠীর ছোচিট গালভেজ। বেশিরভাগ নির্বাচনী জরিপ অনুযায়ী, শিনবিউম ২০ পয়েন্টের ব্যবধানে গালভেজের তুলনায় এগিয়ে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন ‘আমলোর’ জনপ্রিয়তা শিনবিউম জয়ে ভূমিকা রাখতে পারে এবং আইন পরিষদে ক্ষমতাসীন জোটের আসন সংখ্যা বাড়তে পারে। তবে নির্বাচনে শিনবিউম বা গালভেজ যেই নির্বাচিত হোন না কেন, এই নির্বাচন মেক্সিকোর জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। কারণ এর আগে মেক্সিকোতে কোনো নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে প্রায় ১০০ মিলিয়ন মেক্সিকান অংশগ্রহণ করবে, যা একটি রেকর্ড। ২০১৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচনে প্রায় ১১ মিলিয়ন বেশি ভোটার অংশগ্রহণ করবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইএনই জানিয়েছে দেশব্যাপী এক লাখ সত্তর হাজার ভোটকেন্দ্রে মেক্সিকানরা ভোট প্রদান করবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ভোটার পরিচয়পত্র লাগবে। সারা পৃথিবীতে মেক্সিকোর একটি বড় অভিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে, যার সংখ্যা প্রায় ১১ মিলিয়ন। এদের মধ্যে যারা নিবন্ধিত ভোটার তারা অনলাইন, ডাকযোগে বা দূতাবাসে উপস্থিত হয়ে ভোট দিতে পারবেন।
মেক্সিকোভিত্তিক একজন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কার্লোস ব্রাভো রেজিডোর বলেন, নির্বাচনী জোটগুলো মেক্সিকোর রাজনীতির একটি বিশেষত্ব, পাশাপাশি তা রাজনৈতিক মঞ্চে আমলোর প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে। তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণভাবে একটা নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা লোপেজ ওব্রাডর-এর প্রভাব থেকে তৈরি’। তিনি ব্যাখ্যা করেন, লোপেজ ওব্রাডর এত জনপ্রিয় হয়েছেন যে, তার সমর্থিত প্রার্থীকে ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য একদা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো একত্রে জোট করতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলছিলেন, ‘পিআরআই, পিএএন ও পিআরডি-এর একত্রিত হওয়া একটি ঐতিহাসিক বিচ্যুতি। মেক্সিকোর গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এই দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছে।’ ‘এটা লোপেজ ওব্রাডর-এর প্রভাবের একটি দৃষ্টান্ত, এই তিনটি রাজনৈতিক দল ঐতিহাসিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী, যারা মেক্সিকোর রাজনৈতিক পটচিত্রে ডান, বাম ও মধ্যপন্থার প্রতিনিধিত্ব করত তারা লোপেজ ওব্রাডর-এর প্রার্থীকে পরাজিত করতে একত্রিত হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।’ বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী এবারের নির্বাচনের প্রধান ইস্যুগুলো হচ্ছে দুর্নীতি, সামাজিক কর্মসূচি ও নিরাপত্তা। অন্যদিকে এবারের নির্বাচনকে লোপেজ ওব্রাডর শাসনকালের ওপর গণভোট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার সমর্থিত প্রার্থী শিনবাউম পূর্ববর্তী শাসনকালের নীতি বিশেষ করে সামাজিক কর্মসূচি ও অবকাঠামো প্রকল্প অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। এর বিপরীতে রক্ষণশীল জোট সমর্থিত প্রার্থী গালভেজও নিজেকে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং শক্ত হাতে সহিংসতা ও দুর্নীতি বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন রক্ষণশীল জোটের অন্যতম শরিক দল পিআরআই ও পিএএন সম্পর্কে মেক্সিকান ভোটারদের নেতিবাচক ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন, ইতিহাসের আলোকে পরিবর্তনের ধারণা পিএএন ও পিআরআইর সঙ্গে যায় না। ২০০৬ সালে পিএএনের শাসনকালে বিতর্কিত ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ অভিযানে সামরিক বাহিনীর প্রভাব মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছিল, সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে পিআরআইর বিরুদ্ধে ১৯২৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। রেজিডোর আরও বলেন, এই প্রথাগত দলগুলোর ব্যর্থতাই ২০১৮ সালের নির্বাচনের লোপেজ ওব্রাডর-এর বড় বিজয়ের পেছনে ভূমিকা পালন করে। তবে এবারও সন্ত্রাস নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে মে, এ সময় ৩৪ সম্ভাব্য প্রার্থী নিহত হয়েছে। গত ১৭ মে তারিখে দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য চাইপাসে নির্বাচনী সমাবেশে বন্দুকধারীর গুলিতে ছয়জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে একজন মেয়র প্রার্থীও আছেন।
বর্তমান আমলে রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলোর সাফল্য থেকে এবারের নির্বাচনে তার সমর্থিত প্রার্থী ক্লডিয়া শিনবাউময়ের ওপর জনগণের একটি বড় অংশের বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। যার মূলে রয়েছে আমলোর জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি। বেশিরভাগ মেক্সিকান মনে করছেন, শিনবাউম আমলোর প্রবর্তিত সামাজিক নীতি অব্যাহত রাখতে পারবেন, দরিদ্র বিমোচনকে অগ্রাধিকার দেবেন। তবে তার আগে দেখার অপেক্ষা ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল।
(আলজাজিরা অবলম্বনে)
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
