এক নজরে এবারের বাজেট

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪, ০৯:১০ এএম

জাতীয় সংসদে ৫৩তম বাজেট পেশ করেছেন নতুন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। বৃহস্পতিবার আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন তিনি। এদিন বিকেল ৩টায় সংসদে 'সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার' শীর্ষক বাজেট বক্তব্য দেন তিনি।

গত অর্থবছরের চেয়ে এবারের বাজেটের আকার বাড়ছে চার দশমিক ছয় শতাংশ। এটি দেশের ৫৩তম, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৫তম ও অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর প্রথম বাজেট।

বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকছে পাঁচ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাকি দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকবে। দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ইতোমধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাত শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছয় দশমিক ৭৫ শতাংশ হতে পারে।

কোন খাতে কত বরাদ্দ

আগামী বাজেটে ১৫টি খাতে সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। খাতভিত্তিক বরাদ্দ হলো—

  • জনপ্রশাসন খাতে এক লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা
  • স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৭ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা
  • প্রতিরক্ষা খাতে ৪২ হাজার ১৪ কোটি টাকা
  • জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ৩৩ হাজার ৫২০ কোটি টাকা
  • শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে এক লাখ ১১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা
  • স্বাস্থ্য খাতে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা
  • সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে ৪৩ হাজার ২০৮ কোটি টাকা
  • গৃহায়ন খাতে ছয় হাজার ৯২৯ কোটি টাকা
  • বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম খাতে ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩০ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা
  • কৃষি খাতে ৪৭ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা
  • শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবা খাতে পাঁচ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা
  • পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ব্যয় ৮২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা
  • সুদ খাতে এক লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
  • অন্যান্য খাতে আট হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা।


দাম বাড়তে-কমতে পারে যেসব পণ্যের

এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে অনুযায়ী নিম্নোক্ত পণ্যের দাম বাড়তে ও কমতে পারে—

দাম বাড়বে: মোবাইলের এসএমএস-কলরেট, সিগারেট, এয়ারকন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটর, কাজু বাদাম, আইসক্রিম, পানির ফিল্টার, এলইডি বাল্ব, গাড়ি কনভার্সন খরচ, ফার্নেস অয়েল, লুব অয়েল, মিনারেল লুব অয়েল ও বেজ অয়েল, ফিলিং স্টেশন স্থাপন, সিএনজি কনভার্সন কিট ও সিলিন্ডার, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইকুইপমেন্ট, ইপিজেডের আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি ও নির্মাণ সামগ্রী, কার্বনেটেড বেভারেজ, এমিউজমেন্ট পার্ক, থিম পার্ক ও পর্যটন।

দাম কমবে: চাল, ভোজ্যতেল, চিনি, গুঁড়ো দুধ, চকলেট, ল্যাপটপ, মোটরসাইকেল, ডেঙ্গুর চিকিৎসাসামগ্রী, আমদানিকৃত কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও সার্কিট, ক্যানসার চিকিৎসা সরঞ্জাম, কার্পেট, সুইচ-সকেট, ইলেকট্রিক মোটর, লোহা জাতীয় পণ্য (রড, বার ও এঙ্গেল), উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও মিথানল।

নিত্যপণ্যে উৎস কর অর্ধেক করার প্রস্তাব

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নিত্যপণ্যের ওপর উৎস কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টা, ভোজ্য তেল, লবণ এবং চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহকারীরা ঋণপত্রের ওপর দুই শতাংশ উৎস কর দেন। এ হার আগামী অর্থবছর থেকে এক শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভুগতে থাকা গ্রাহকরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

আগামী অর্থবছরে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিচ্ছে সরকার। কালো টাকা থাকা নাগরিকরা তাদের আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়েই তাদের অঘোষিত সম্পদকে বৈধ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, দেশের প্রচলিত আইন যা-ই থাকুক না কেন, কোনো করদাতা ফ্ল্যাট, জমির পাশাপাশি নগদ অর্থসহ স্থাবর সম্পত্তির জন্য ১৫ শতাংশ কর দিলে কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

এ ছাড়া, শেয়ার বাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে বাজেটে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী কোনো প্রশ্ন ছাড়াই কালো টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা যাবে।

করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়েনি

করমুক্ত আয়কর সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা বহাল রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, আয়ের প্রথম সাড়ে ৩ লাখ টাকার ওপর কোনো কর দিতে হবে না। পরবর্তী ১ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ৩ লাখ টাকায় ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকায় ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ ও বাকি আয়ের ওপর ২৫ শতাংশ আয়কর দিতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ছে

প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আট দশমিক এক শতাংশ বাড়িয়ে ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল ৩৮ হাজার ৫১ কোটি টাকা।

বরাদ্দ কমল যেসব খাতে

বিদ্যুৎ-জ্বালানি

প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। এবার এই খাতে ৩০ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা গত অর্থবছরে ছিল ৩৪ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা।

শিক্ষা খাত

আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাতে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় ১ দশমিক ৬৯ শতাংশের কথা বলা হয়েছে।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির এক দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল দুই দশমিক ০৮ শতাংশ।

যোগাযোগ খাত

প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ গতবারের চেয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা কমেছে। বাজেটে সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান পরিবহন উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮০ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ কমলো চার হাজার ৬৯৩ হাজার কোটি টাকা।

গাড়ি আমদানিতে শুল্ক দিতে হবে এমপিদেরও

সংসদ সদস্যদের (এমপি) বিদেশ থেকে গাড়ি আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক-কর বর্তমানে অব্যাহতি আছে। এ সুবিধা কমিয়ে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে সরকার। তাদের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি সুবিধা কিছুটা কমিয়ে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রভিশনাল হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার এপ্রিল পর্যন্ত আট দশমিক চার শতাংশ ছিল।

বাজেট ঘাটতি

আগামী অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

ব্যাংক থেকে ঋণ

প্রস্তাবিত আগামী অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের। ব্যাংকিং খাত ছাড়াও নন-ব্যাংকিং খাত থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে দেখা গেছে, উল্টো এই খাতে সাত হাজার ৩১০ কোটি টাকা দিচ্ছে সরকার।

প্রভিডেন্ট ফান্ডে কর বাড়ানোর প্রস্তাব

প্রভিডেন্ট, গ্র্যাচুইটি, সুপারঅ্যানুয়েশন ও পেনশন তহবিল থেকে অর্জিত আয়ের ওপর কর হার আগের ২৭ দশমিক পাঁচ শতাংশে ফিরিয়ে নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বর্তমানে এই করের হার ১৫ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী অর্থ বিলে এই প্রস্তাব করেন। বিলটি সংসদে কার্যকর হলে করহার ২৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ হবে। অন্যথায় তা বর্তমান ১৫ শতাংশই থাকবে।

আইসিটি খাতে ক্যাশলেস শর্তে ৩ বছরের করছাড়

আইসিটি খাতে ক্যাশলেসের শর্তে ১৯ ধরনের ব্যবসায় তিন বছরের জন্য কর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করেছে সরকার। ব্যবসাগুলো হলো—এআই বেজড সল্যুশন, ব্লকচেইন বেজড সল্যুশন, রোবোটিক্স প্রসেস আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার সেবা, সাইবার নিরাপত্তা সেবা, ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণ ও ডেটা সায়েন্স, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও কাস্টমাইজেশন, সফটওয়্যার টেস্ট ল্যাব, ওয়েব লিস্টিং এবং ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, আইটি সহায়তা এবং সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ, জিআইএস, ডিজিটাল অ্যানিমেশন, ডিজিটাল গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ডেটা এন্ট্রি এবং প্রক্রিয়াকরণ, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং ই-পাবলিকেশন, আইটি ফ্রিল্যান্সিং, কল সেন্টার এবং ডকুমেন্ট রূপান্তর, ইমেজিং ও ডিজিটাল আর্কাইভিং।

মোবাইলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশ

মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা আরও ২ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সরকার।

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আসবেন সরকারি চাকরিজীবীরা

আগামী অর্থবছর থেকে নিয়োগ পাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের অবসর পরবর্তী পেনশন সুবিধার পরিবর্তে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বিক্ষোভের মধ্যে অর্থমন্ত্রী এ ঘোষণা দিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত