দুটি বুলডোজার। চোখের নিমেষে ভেঙে যাওয়া কয়েকটি ঘর। শত শত মানুষের উচ্ছেদের আতঙ্ক। আর এই আতঙ্কের ফলে দফায় দফায় চারজন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের স্ট্রোক এবং একজনের আত্মহত্যা চেষ্টা। গত ১১ জুন গভীর রাতে ঢাকার বংশালে মিরনজিল্লা সুইপার কলোনি উচ্ছেদের কার্যকলাপ শুরু হলে লক্ষ্মী রানী নামে একজন নারীর স্ট্রোক হয়। হাসপাতালে নিতে যাওয়ার সময়ই তিনি মারা যান। এরপর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন আরও তিনজন। এখানেই শেষ না, উচ্ছেদভীতিতে একজন জনসম্মুখে ফাঁসি দিতে যাওয়ার সময় তাকে সম্প্রদায়ের মানুষ বাঁচান, এরপর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সুস্থ হয়ে ফেরার পরেও উচ্ছেদ আর আত্মহত্যা চেষ্টার যে ট্রমা তাকে আদৌ স্বাভাবিক জীবন দিতে পারবে কি না সেই প্রশ্ন থেকেই যায়!
২০০৮ সালে আমেরিকার অর্থনীতি সংকটের কারণে এক বিপুল সংখ্যক মানুষের উচ্ছেদ হয়। সেই সময় উচ্ছেদ নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন সমাজবিজ্ঞানী ম্যাথিউ ডেসমন্ড, তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে শহরের জীবন থেকে শুরু করে সমগ্র দেশে একটি উচ্ছেদের ঘটনা মানুষকে কেবল নিরাপত্তাহীনই করে তোলে না, বরং তা হয়ে ওঠে আরও বড় দারিদ্র্যের কারণ। শুধু তাই না, এক একটি জোরপূর্বক উচ্ছেদ কীভাবে মানুষকে আরও হতাশ করে তোলে, কীভাবে তাকে আরও ট্রমাটাইজড করে তাও তিনি দেখিয়েছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় সুইডেনে প্রায় ২৩ হাজার ২০৩ জন মানুষ উচ্ছেদ হয়, তার মধ্যে ১৯৩ জন আত্মহত্যা করেন। (তথ্যসূত্র : জার্নাল অব এপিডোমেলজি অ্যান্ড কমিউনিটি হেলথ, সুইডেন, জুলাই ২০১৫)। ২০১৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় বিহারের অরবিন্দ আশ্রম থেকে ৭ জনের একটি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হলে, সঙ্গে সঙ্গেই দুই বোন আর তাদের মা সাগরে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। (তথ্যসূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৪)। প্রতিটি উচ্ছেদের ঘটনায় মানসিক স্বাস্থ্যের এক ভয়ঙ্কর রূপ সামনে আসে। কখনো উচ্চ রক্তচাপ, ট্রমা, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, কখনো স্ট্রোক, উদ্বিগ্নতা এবং কখনো আত্মহত্যা। তাই উচ্ছেদ কেবল একটি সম্প্রদায়কে আশ্রয়হীনই করে তোলে না, বরং তাকে এক দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দেয়। মিরনজিল্লার উচ্ছেদকান্ড এর ব্যতিক্রম নয়। শত শত বছর ধরে যে কলোনিতে সুইপারদের বসবাস, সে কলোনিতে বহুতলা মার্কেট উঠবে বলে গাদাগাদি করে থাকার শেষ আশ্রয়টুকুও ঘুচিয়ে দেওয়া হলো নিমেষে। মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে তাদের খালি করতে বলা হলো ঘর। যে ঘরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের বাস, ঘরের ঘটি-বাটি, তোশক-বিছানায় শত বছরের সম্পর্কের স্পর্শ, তার সবকিছু ত্যাগ করার নোটিস দেওয়া হলো ১২ ঘণ্টার মধ্যে। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় যাপিত জীবনের সমস্ত সম্বল শেষ হওয়ার যে ভীতি, আতঙ্ক তার ফলাফল যদি হয় স্ট্রোকে মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যা প্রচেষ্টা, তাকে কাঠামোগত হত্যা বলা যায়। উন্নয়নের বুলডোজারের সামনে লক্ষ্মী রানী স্ট্রোক করে মারা যাননি, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
২০২৩ সালে ভারতের জি২০ সামিটের জন্য দিল্লি শহরের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে সুইপারদের প্রায় ১৬০০ ঘর উচ্ছেদ করা হয়েছিল। রাহুল নামে এক হরিজন তখন মানসিক অবসাদে পড়ে আত্মহত্যা করেন। অথচ সেই সামিট ছিল অর্থনীতি চাঙ্গা করার সামিট। বলাই বাহুল্য, রাহুল সেই সামিটের অংশ ছিলেন না! মিরনজিল্লা কলোনি উচ্ছেদের পেছনেও এ রকম ‘উন্নয়ন’, ‘আধুনিক’ ইত্যাদি শব্দ বসানো হচ্ছে বলা হচ্ছে আধুনিক কাঁচাবাজার হবে। শত শত মানুষকে উচ্ছেদ করে কাঁচাবাজার তৈরির যে চিন্তা, সেই চিন্তাটিই ভয়ংকর জনবিদ্বেষী এবং জনস্বার্থবিরোধী। ঢাকা শহরে এত মার্কেট, এত দোকান, এত কাঁচাবাজার। তবুও কেন হরিজন সদস্যদের উচ্ছেদ করেই কাঁচাবাজার নির্মাণ করতে হবে?
আমাদের এই ৫৩ বছর বয়সী রাষ্ট্রে ‘নাগরিকের সমান অধিকার’ সংবলিত একটি সংবিধান থাকা সত্ত্বেও তা বর্ণবৈষম্যের মতো সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত নয়! এখানে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক ঘৃণা বলবৎ বলেই হরিজনদের পৃথক কলোনি করে বাস করতে হয়। ৯০ দশকে এই মিরনজিল্লা কলোনিতে হরিজনরা নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচতেন, শূকর পালন করতেন। তাদের শূকর পালন বন্ধের মাধ্যমে ‘তথাকথিত সভ্য’ করা হয়েছে। অথচ তথাকথিত সভ্য নাগরিকের সুবিধা এবং মর্যাদা কোনোটাই দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পৃথক কলোনিতে বাস করার পরেও সেই কলোনি তাদের মালিকানাধীন হয় না! বরং যখন তখনই চলে আসে উচ্ছেদের নোটিস। বর্ণগত কারণেই তাদের নামে ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা চলে, এরা নোংরা, এরা কিশোর গ্যাং-এর সদস্য ইত্যাদি। সারা শহরকে যারা ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার রাখে, তারা কীভাবে ‘নোংরা’ হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রোপাগান্ডাওয়ালারা দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। সভ্য ও আধুনিক রাষ্ট্রটি আধুনিক উপায়ে বর্ণবৈষম্য ঠিকই টিকিয়ে রাখছে তাদের রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ চাকরিতে কোটা থাকলেও সে চাকরি তাদের না দেওয়া, চাকরি দিলেও স্থায়ী না করা এবং অস্থায়ী অবস্থায় চাকরির বয়স শেষ হওয়ার পর সরকারি কোনো পেনশনসহ বিভিন্ন গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুযোগ না দেওয়ার মাধ্যমে। অথচ আমাদের হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষরা ঠিকই ভোর হলে এই শহর পরিষ্কারে নেমে পড়েন, রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে হরিজন সম্প্রদায়ের শহীদদের একটি বেদিও রয়েছে এই মিরনজিল্লা কলোনিতে, যদিওবা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবান্বিত ইতিহাস পাঠে হরিজনকে রাখার ব্যাপারটা দেশের কোনো শাসনামলেই ঘটেনি। মিরনজিল্লাতেই হরিজন পল্লীর উচ্ছেদ ঘটনা প্রথম নয়। এর আগেও ২০১৯ সালে রেলের জমি সম্প্রসারণের জন্য গোপীবাগ টিটিপাড়াতে একই ভাবে হরিজনদের শতেক ঘর উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এবং পাঁচ বছর হলেও তাদের পুনর্বাসন হয়নি। হাইকোর্ট এই উচ্ছেদের ত্রিশ দিনের স্থিতাবস্থা নির্দেশনা দিয়েছে সেটি একটি সাময়িক অর্জন। কিন্তু পাশাপাশি এও ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেড় দশকের উন্নয়নের শাসনামলের অভিজ্ঞতা আমাদের জানিয়েছে, এখানে উচ্ছেদের রাজনীতি ঘোরে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে যেখানে যুক্ত থাকে কোটি কোটি টাকা। এই যখন তখন উচ্ছেদের আতঙ্ক থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের হরিজনদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে তাদের শত বছরের জায়গাটির একটি মালিকানার দলিল তাদের হাতে থাকা।
লেখক : নারী অধিকারকর্মী
