ইসরায়েলের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় জড়িত অলাভজনক সংস্থাগুলোতে অনুদান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে অ্যাপলের বর্তমান ও সাবেক কর্মী এবং শেয়ারহোল্ডারদের একটি দল কর্র্তৃপক্ষকে খোলা চিঠি দিয়েছেন। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক আক্রমণ এবং পশ্চিম তীরে বেআইনি বসতি সম্প্রসারণে জড়িত সংস্থাগুলোতে অ্যাপল অনুদান দেয় বলে অভিযোগ আসার পর তারা প্রতিবাদ হিসেবে এই চিঠি দেন। চিঠিতে অ্যাপলকে ‘দখলকৃত অঞ্চলে বেআইনি বসতি সম্প্রসারণ ও আইডিএফকে সমর্থন করে এমন সব সংস্থার অনুদান প্রদান বন্ধ করার জন্য দ্রুত তদন্ত করার’ দাবি জানানো হয়েছে।
বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের মতো অ্যাপলের কর্মীরাও বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থায় অনুদান দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বেনেভিটি নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই অনুদান দেওয়া হতে পারে। যে সব দাতব্য সংস্থা অ্যাপলের ডলার-ম্যাচিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুদান পেয়েছে তাদের একটি ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য আইডিএফ’। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সংক্ষেপে আইডিএফ বলা হয়। ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য আইডিএফ’ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সৈন্যদের পক্ষে অনুদান সংগ্রহ করে এবং ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণে অবদান রাখে। এমন আরও কয়েকটি গোষ্ঠী হলো: হাইওভেল, ওয়ান ইসরায়েল ফান্ড, জিউইশ ন্যাশনাল ফান্ড এবং ইসরায়েলগিভস। অ্যাপলকে এ-বিষয়ে মন্তব্য করার অনুরোধ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।
আমেরিকান অ্যাডভোকেসি গ্রুপ সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটসের সিনিয়র স্টাফ অ্যাটর্নি ডায়ালা শামাস বলেন, ‘দুঃখের কথা হলো, পশ্চিম তীরে ও গাজায় বেআইনি কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ্যে সমর্থনকারী অলাভজনক সংস্থাগুলোর ওপর খুব একটা নজরদারি করা হয় না।’ এই ধরনের ক্যাম্পেইন যারা পরিচালনা করে, তাদের তিনি ‘সবচেয়ে খারাপ কাজ করা’ সংস্থা বলে বর্ণনা করেছেন।
‘নট অন আওয়ার ডাইম অ্যাক্ট’ নামে নিউইয়র্কে এ-বিষয়ে একটি আইনি প্রস্তাবও রয়েছে; যার লক্ষ্য হলো, যে সব অলাভজনক সংস্থা বেআইনি বসতি গড়ার জন্য তহবিল সংগ্রহ করে, তাদের সুবিধা ও ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করা এবং তাদের আইনি দায়বদ্ধতার আওতায় আনা, যেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করার মতো কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করা ঠেকানো যায়। কিন্তু শামাসের মতে, ‘একটি সংস্থার অলাভজনক মর্যাদা থাকুক বা না থাকুক, যুদ্ধাপরাধে সহায়তা করা বেআইনি।’ তিনি বলেন, ‘অ্যাপলকে নিশ্চিত করতে হবে যে, তারা এমন কোনো সংস্থায় তহবিল পাঠাচ্ছে না বিশেষ করে এখন, যখন পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বেআইনি কার্যকলাপ সম্পর্কে প্রমাণ বা তথ্যের অভাব নেই।’
অ্যাপলের প্রতিবাদী কর্মীরা ইতিমধ্যেই ‘অ্যাপলসফরসিজফায়ার’ নামে সংগঠিত হয়েছেন। এর আগে ফিলিস্তিনি জনগণকে সমর্থন করে কেফিয়্যা, পিন, ব্রেসলেট বা পোশাক পরার ‘সাহস দেখানোর কারণে’ অ্যাপল স্টোরের কর্মীদের শাস্তি দেওয়া হয়, এমনকি বরখাস্তও করা হয়। এই সংগঠনের কর্মীরা কোম্পানির এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। চিঠিতে ১৩৩ জন স্বাক্ষরকারী নিজেদের অ্যাপলের ‘শেয়ারহোল্ডার এবং বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মীদের দল’ বলে অভিহিত করেছেন।
এই বছরের শুরুর দিকে কয়েক ডজন কর্মীকে বরখাস্ত করে গুগল; যারা প্রজেক্ট নিম্বাস নামে পরিচিত একটি ক্লাউড কম্পিউটিং প্রকল্পে কোম্পানির জড়িত থাকার প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল। কেননা, প্রজেক্ট নিম্বাস ইসরায়েলি সরকার এবং সামরিক বাহিনীকে সার্ভিস দেয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটার কর্মচারীদের একটি খোলা চিঠিতেও ফিলিস্তিনি জনগণকে সমর্থনের কারণে কোম্পানি তাদের সঙ্গে যে আচরণ করছে, তার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
পশ্চিম তীরে বেআইনি দখলদারিত্বে সহায়তা করা এনজিওগুলোকে অনুদান প্রদানের বিষয়টি সম্প্রতি নজরে এসছে। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনসাধারণ নিহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। সৈন্যদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রতি নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তা ছাড়া বহু আইডিএফ সদস্য নিজেরাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাড়িঘর-দোকানপাট লুটপাট এবং বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের চিত্র পোস্ট করেছে, যা তাদের জঘন্য কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট প্রমাণ। আর অ্যাপল তাদের সহায়তা করে অপকর্মে সহায়তা করছে।
কারণ, ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য আইডিএফ’ অ্যাপলের অনুদান তালিকায় থাকা দাতব্য সংস্থাগুলোর একটি। আইডিএফ সদস্যদের তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত এবং যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে তারা ৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে বলে দাবি করেছে। অ্যাপলের অনুদান তালিকায় থাকা আরও কয়েকটি সংস্থা ইসরায়েল যুদ্ধে তহবিল গঠনে সহায়তা করছে। গত ডিসেম্বরে ‘দ্য গার্ডিয়ান’র একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ইসরায়েলগিভস যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই মাসের মধ্যে সামরিক, আধাসামরিক এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকে ত্বরান্বিত করতে ৫.৩ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অনুদান পেয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, এই অর্থের বেশিরভাগই মার্কিন দাতাদের কাছ থেকে এসেছে। বেআইনি বসতিগুলোপ সমর্থন করতে নির্দিষ্ট আকারে তহবিল সংগ্রহের ক্যাম্পেইনও করছে তারা এবং সেই ক্যাম্পেইনে এমন সব ইহুদি সেটেলারও রয়েছেন, যারা ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংস হামলায় সরাসরি জড়িত।
অ্যাপলের অনুদান তালিকায় থাকা কয়েকটি সংস্থা ধর্মীয় চরমপন্থাকে সমর্থন এবং ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে আন্তর্জাতিক আইনে বেআইনি বিবেচিত কর্মকাণ্ডকে সহযোগিতা করে বলে ধারণা করা হয়। যেমন: ‘ওয়ান ইসরায়েল ফান্ড’ তার ওয়েবসাইটে ‘দ্য অ্যারাব টেকওভার অব জুডিয়া অ্যান্ড সামারিয়া: হু ইজ বিহাইন্ড ইট; হোয়াট ক্যান বি ডান?’ শিরোনামের একটি আলোচনা আপলোড করেছেযেখানে আন্তর্জাতিক আইনে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে বিবেচিত অঞ্চলকে ইহুদিদের ধর্মীয় অঞ্চল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটি হলো হাইওভেল। এটি একটি খ্রিস্টান জায়োনিস্ট সংগঠন। তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে যে, এই সংগঠনের এর লক্ষ্য হলো, যে-অঞ্চলকে ‘অনেকেই ভুলভাবে যাকে পশ্চিম তীর বলে উল্লেখ করে’ সেই ‘প্রতিশ্রুত ভূমিকে পুনর্দখল’ কার্যক্রম বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। ‘ইহুদি ন্যাশনাল ফান্ড’ দাতব্য সংস্থার মর্যাদা কীভাবে পাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে এ নিয়ে বেশ কয়েকবার সমালোচনা হয়েছে। কেননা, তারা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘পদ্ধতিগত বৈষম্য’ এবং পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নকে অব্যাহত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের মতো অ্যাপলও তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে যে, জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাসহ তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার কাঠামোকে সম্মান করে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা যে ধারাবাহিক আইডিএফ-এর নৃশংসতার নিন্দা করে আসছে, তা তারা আমলে নিচ্ছে বলে মনে হয় না।
লেখক : মুরতাজা হুসেইন, জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতি বিষয়ক সাংবাদিক; স্যাম বিডল, সাবেক বৈমানিক, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রতিবাদে মার্কিন বিমান বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন।
দা ইন্টারসেপ্ট ডট কম থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক
