টানা পাঁচ মৌসুম লিগ শিরোপা জেতা হয়নি। গেল দুই মৌসুমে জুটেনি ঘরোয়া কোনো শিরোপা। তাতে ঐতিহ্যবাহী আবাহনী লিমিটেডের অহমে আঘাত লেগেছে। তাই এবারের দলবদলে বেশ তৎপর তারা। যদিও দল গঠনের পরিকল্পনা ও বাস্তবতার অঙ্কটা পুরোপুরি মেলাতে পারেনি ধানম-ি জায়ান্টরা। ভাঙতে পারেনি টানা পাঁচ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসের ঘর। কিংসে হানা দিতে না পেরে আবাহনীর ভাঙছে অন্যদের ঘর। বড় আঘাতটা দিয়েছে চিরশত্রু মোহামেডান শিবিরে। গেল মৌসুমে লিগসহ তিনটি আসরের রানার্স-আপ মোহামেডানের চারজন পারফরমারকে এর মধ্যেই চূড়ান্ত করে ফেলেছে আবাহনী। পাশাপাশি জাতীয় দলের এক নম্বর গোলকিপার মিতুল মারমা শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন আবাহনীতে। পুরনো বিদেশিদের একজনও থাকছে না এবার। নতুনদের মধ্যে কেবল চূড়ান্ত করেছে এক পুরনো ও বিশ্বস্ত মুখ। ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার রাফায়েল আগুস্তোকে এক মৌসুম বাদে ফেরাতে যাচ্ছে ছয়বারের লিগজয়ীরা।
২৯ মে শেষ হওয়া প্রিমিয়ার লিগে আবাহনী হয়েছে তৃতীয়। ১৮ ম্যাচের ৯টিতে মাত্র জয় পেয়েছে তারা। চার ম্যাচে হার আর পাঁচ ম্যাচ ড্র। ৩২ পয়েন্ট নিয়ে তাদের থাকতে হয়েছে চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস ও মোহামেডানের নিচে। সাদা-কালোদের চেয়ে তারা পিছিয়ে ছিল তিন পয়েন্টে। লিগের মতোই দুটি টুর্নামেন্টে আবাহনীর আকাশি-হলুদ রঙ চটে গেছে। স্বাধীনতা কাপ ও ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনালে দুবারই তাদের হারতে হয় বসুন্ধরা কিংসের কাছে। স্বাধীনতা কাপে তারা ধরাশায়ী হয় ৪-০ ব্যবধানে। ফেডারেশন কাপে ৩-০ গোলে। লিগেও দুবারের দেখায় কিংসের কাছে হারের হতাশা পেতে হয় আবাহনীকে। অর্থাৎ মৌসুমে চারবারের দেখায় প্রতিবারই হার পরিণতি মেনে নিতে হয় তাদের। গত মৌসুমে মোহামেডানের কাছেও লজ্জা পেতে হয়েছে আবাহনীকে। লিগে দুবারের দেখায় প্রথমটি ২-২ ড্র করলেও শেষটায় হারতে হয় ২-১ ব্যবধানে। ফেডারেশন কাপের গ্রুপপর্বে দুদলের দেখা হয়েছিল। সেখানেও সাদা-কালোদের জয় ২-১ ব্যবধানে। এছাড়া লিগে ফর্টিজের মতো দলের কাছে হার এবং রহমতগঞ্জ, পুলিশ, চট্টগ্রাম আবাহনীর মতো দলগুলোর কাছে পয়েন্ট খোয়াতে হয়েছে।
এতটা মøান মৌসুম পেশাদার যুগে আর কাটায়নি আবাহনী। এই ধাক্কাতেই ঘুম ভেঙেছে আবাহনীর থিংকট্যাংকদের। তবে একটু দেরি করে। ততদিনে বসুন্ধরা কিংস নিশ্চিত করে ফেলে তাদের সেরা পারফরমারদের। আবাহনীর এক শীর্ষ কর্তা কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই বলেছেন, ‘আমরা খুব করে চেয়েছিলাম কিংস থেকে রাকিবকে ফিরিয়ে আনতে। একটা ভালো প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে ও কিংসের কাছ থেকে চুক্তির টাকা বাড়িয়ে নিয়েছে। বলতে পারেন এই একটা লক্ষ্যই অপূর্ণ থাকছে আমাদের।’ বসুন্ধরার বাতিলের তালিকায় থাকা লেফটব্যাক ইয়াছিন আরাফাতকে নিচ্ছে আবাহনী।
কিংসে হানা দিতে না পারলেও মোহামেডানে মোক্ষম আঘাত দিয়েছে আবাহনী। গত মৌসুমে দলের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে বড় অবদান রাখা ফরোয়ার্ড শাহরিয়ার ইমন, জাফর ইকবাল, সেন্টারব্যাক হাসান মুরাদ ও লেফটব্যাক কামরুল ইসলামকে নিশ্চিত করেছে তারা। তবে এবারের দলবদলে আবাহনীর বড় সিদ্ধান্ত ফর্মে থাকা গোলকিপার মিতুল মারমাকে নেওয়া। জাতীয় দলের কোচ হাভিয়ের কাবরেরার পছন্দের তালিকায় সবার ওপরে থাকা মিতুল গেল মৌসুমে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের ঘর সামলেছেন। যদিও দল হিসেবে শেখ রাসেলের অবস্থান খুব ভালো ছিল না। মাত্র ১৯ পয়েন্ট নিয়ে তারা হয়েছে ষষ্ঠ। তারপরও মিতুল ঠিকই নিজেকে প্রমাণ দিয়েছিলেন তেকাঠির নিচে। যার পুরস্কার তিনি আবাহনী থেকে পেয়েছেন লোভনীয় চুক্তিতে। এছাড়া শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব থেকে আবাহনী নিশ্চিত করেছে জাতীয় দলের সেন্টারব্যাক শাকিল আহমেদ ও গোলকিপার মাহফুজ হাসানকে। গত মৌসুমে খেলা স্থানীয়দের অধিকাংশকেই এবার ছেড়ে দিয়েছে আবাহনী। পুরনোদের মধ্যে এখন পর্যন্ত আবাহনীতে থাকা নিশ্চিত কেবল জাতীয় দলের মিডফিল্ডার মোহাম্মদ হৃদয়ের।
ভালোমানের স্থানীয়দের পাশাপাশি আবাহনী চাচ্ছে উঁচুমানের বিদেশি এনে বসুন্ধরা কিংসকে টেক্কা দিতে। দলটির ম্যানেজার কাজী নজরুল ইসলাম জানান, এর মধ্যেই তারা রাফায়েল আগুস্তোকে ফেরানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ এই তিন বছর আবাহনীকে সার্ভিস দিয়েছেন রাফায়েল। তবে শেষ মৌসুমটি মোটেই ভালো কাটেনি তার। চোটের সঙ্গে পুরোটা সময় লড়াই করে খেলতে হয়েছে তাকে। তাই গত মৌসুমে রাফায়েলকে রাখেনি আবাহনী। ৩৩ বছর বয়সী রাফায়েল বর্তমানে ব্রাজিলের সিরি-ডি’র দল বাঙ্গুর হয়ে খেলছেন। আবাহনীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন আহমেদ তার বিষয়ে বলেন, ‘চোটের কারণেই রাফায়েলকে গত মৌসুমে আমরা নিইনি। তবে আমাদের ফুটবল কমিটি তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছে এখন অবস্থার ভালোই উন্নতি হয়েছে। তাই তাকে আমরা রাখছি। বাদ বাকি বিদেশিদের নিয়ে কাজ করছে কমিটি।’
গত লিগের সর্বাধিক গোলদাতা সেন্ট ভিনসেন্টের স্ট্রাইকার কর্নেলিয়াস স্টুয়ার্টকে ধরে রাখতে পারেনি আবাহনী। ‘আমরা তাকে চেয়েছিলাম ধরে রাখতে। তবে সে ইন্দোনেশিয়া লিগে খেলতে চেয়েছে। কেউ না চাইলে তো জোর করে ধরে রাখা সম্ভব নয়’ জানান ম্যানেজার নজরুল। এছাড়া গত মৌসুমের মাঝমাঠের দায়িত্বে থাকা ব্রাজিলিয়ান জোনাথন ফার্নান্দেজও ফিরে গেছেন পুরনো ডেরা বসুন্ধরা কিংসে।
সব মিলিয়ে আসছে মৌসুমে নতুন এক আবাহনীকে দেখা যাবে মাঠে। স্থানীয়দের মতো বিদেশি সংগ্রহেও ক্লাবটি জোর দিয়েছে নতুনে। খলনলচে পাল্টে এবার ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টায় তারা।
