এক জাদুকর পেয়ে গেছে ঢাকা মোহামেডান। সাদা-কালো জার্সিতে একটা সময় মাঠ মাতিয়েছেন, মোহবিষ্ট করে রেখেছেন দেশজুড়ে অগুনতি সমর্থককে। বুটজোড়া তুলে রেখে বেছে নেন কোচিং পেশা। কিছুদিন এদিক-সেদিক থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেই ভোজবাজির মতো পাল্টে দিয়েছেন দলটাকে। আলফাজ আহমেদের ছোঁয়ায় গেল দুটি মৌসুম মোহামেডান খেলছে ভয়ডরহীন ফুটবল। তাতে ভর করে গেল মৌসুমে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগসহ তিনটি আসরে রানার্সআপ সাদা-কালোরা। সেই জাদুকর আসছে মৌসুমেও সামলাবেন মোহামেডানশিবির। তবে সেই শিবিরে হানা দিয়েছে আবাহনী। ছিনিয়ে নিয়ে গেছে চার ফুটবলার। অকুতোভয় আলফাজ অবশ্য তাতে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি দেখছেন না; বরং আগামী মৌসুমেও শিরোপা এনে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করতে চান জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়ক।
গত লিগ শেষের আগেই শোনা যাচ্ছিল গুঞ্জন। দুই মৌসুমে মোহামেডানের হয়ে আলো ছড়ানো উইঙ্গার শাহরিয়ার ইমন ও সেন্টারব্যাক হাসান মুরাদে চোখ পড়েছে আবাহনীর। লিগ শেষ হতে না হতেই গুঞ্জন সত্যি হয়। বাড়তি হিসেবে লেফটব্যাক কামরুল ইসলাম ও লেফট উইঙ্গার জাফর ইকবালকেও নিজেদের করে নেয় আবাহনী। শাহরিয়ার ইমন ও হাসান মুরাদের না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দলীয় শক্তিতে প্রভাব পড়ার কথা মোহামেডানের। দুজনই নিজ নিজ পজিশনে অসাধারণ ফুটবল খেলে নজর কেড়েছেন জাতীয় দলের কোচ হাভিয়ের কাবরেরার। আলফাজ নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন এই দুজনের ক্ষেত্রে, ‘দেখুন, আমার কাজ কোচিং করানো। দল গঠনের দায়িত্ব আমার না। কারণ আমি তো পকেটের টাকা দিয়ে খেলোয়াড় ধরে রাখতে পারব না। এই দুজন দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে এখন যেহেতু নেই, যারা থাকবে, তাদের নিয়েই আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে।’ আলফাজ অবশ্য এখনো এই দুজনের আশা পুরোপুরি ছাড়ছেন না। তার কথাতেই পরিষ্কার দুই পারফরমারকে রেখে দিতে জোর চেষ্টাই করছেন মোহামেডানের কর্তারা।
কামরুল ও জাফর ইকবালের ক্লাব ছাড়াটা খুব বেশি ভাবাচ্ছে না আলফাজকে, ‘ওদের জায়গায় আমাদের খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। তা ছাড়া যারা গেছে, তাদের জায়গায় বেশ কজন খেলোয়াড়কে আমরা নিয়েছি। বলতে পারেন আগের স্কোয়াডের ৯০ ভাগই থেকে গেছে। তাদের নিয়ে এবারও আমাদের লক্ষ্য থাকবে চ্যাম্পিয়নশিপ।’
গেল মৌসুমে মোহামেডানের সেরা পারফরমারদের অন্যতম ছিলেন উইঙ্গার আরিফ হোসেন ও মিডফিল্ডার মিনহাজুর আবেদীন রাকিব। এই দুজনকে রেখে দিয়েছে মোহামেডান। এ ছাড়া পরীক্ষিত গোলকিপার সুজন হোসেনের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেছে মোহামেডান। এ ছাড়া জাতীয় দলের সাবেক উইঙ্গার, গেল মৌসুমে রহমতগঞ্জে খেলা জুয়েল রানাকে ফিরিয়েছে তারা। ব্রাদার্সের হয়ে খেলা বাফুফের এলিট অ্যাকাডেমির উইঙ্গার শান্তকে নিয়েছে সাদা-কালোরা। শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব থেকে রাইটব্যাক রাজিবকে নেওয়া হয়েছে হাসান মুরাদের বিকল্প হিসেবে। আলফাজের মতে, স্থানীয়দের মতো বিদেশি চূড়ান্তেও খুব পিছিয়ে নেই মোহামেডান। গেল মৌসুমে মোহামেডানকে লিগ, স্বাধীনতা কাপ ও ফেডারেশন কাপের রানার্সআপ শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা ছিল চার ভিনদেশির। মালির ফরোয়ার্ড সুলেমান দিয়াবাতে তো ঘরের ছেলেতেই রূপ নিয়েছেন। এ ছাড়া উজবেক প্লে-মেকার মোজাফফরভকে গেল মৌসুমে সেরা পারফরমারদের অন্যতম বলা যেতেই পারে। দুই নাইজেরিয়ান ইমান্যুয়েল সানডে ও ইমুন্যুয়েল টনিও ধারাবাহিক ছিলেন পুরো মৌসুম। তাই এই চারজনের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেছে মোহামেডান। এ ছাড়া রহমতগঞ্জের হয়ে খেলা ঘানার উইঙ্গার আর্নেস্ট বোয়েটাংকে চূড়ান্ত করেছে তারা। ছয়জন বিদেশি নিবন্ধনের সুযোগ থাকলেও আপাতত এই পাঁচজন নিয়েই পথচলা শুরু করবেন আলফাজ।
এদিকে স্কোয়াড চূড়ান্ত করার আগেই অবশ্য আলফাজের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেছে মোহামেডান। গেল মৌসুমের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই হয়েছে নতুন চুক্তি। তাতে কতটা খুশি? জানতে চাইলে আলফাজ বলেন, ‘দেখুন, বিদেশিদের সঙ্গে আমাদের একটা ব্যবধান সবখানে থেকে যায়। ক্লাবগুলো স্থানীয়দের কখনোই বেশি বেতন দিতে চায় না। আর আমাকে তো মোহামেডানের ঘরের ছেলেই ধরা হয়। তাই চুক্তির অর্থ নিয়ে আমার কোনো কথা নেই।’
মাঝারি সারির একটি দল নিয়ে লড়াই করা আলফাজের সামর্থ্যটা জানা বলেই নির্দ্বিধায় তার সঙ্গে চুক্তি বাড়িয়েছে মোহামেডান। সেটাই বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন এই কোচ, ‘আমাকে যে দলটাই দেওয়া হোক না কেন, শিরোপায় চোখ রেখে ফুটবলারদের তৈরি করতে হবে আমাকে। এরপর দেখা যাক কী হয়।’
চেষ্টার যে সর্বোচ্চটাই দেবেন আলফাজ, সেটা আর নতুন করে বলার কিছু নেই।
