উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীর ওপর ডালিয়া নামক স্থানে রয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ। এলাকার মানুষ তিস্তা নদীকে বন্যা, খরা ও ভাঙনের নদীও বলে। প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনে নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার তিস্তা নদীর সীমানায় বসবাসরত পরিবারদের হারাতে হয় ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ও সঞ্চয়ের টাকা।
তাদের এ কষ্ট দূর করতে নীলফামারীর ডিমলার ও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকার সাধুর বাজারে গড়ে উঠেছে একটি তৈরি পোশাক কারখানা। নদীর নামেই নামকরণ করা হয়েছে ‘তিস্তা গার্মেন্টস অ্যান্ড ফ্যাশন হাউজ’। এই তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন তিস্তাপাড়ের নারীরা। এখানে কাজ করছেন প্রায় ৩৫ জন নারী ও ১২ জন তরুণ যুবক। নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
কারখানার নারীরা জানান, কারখানাটি গত বছর জুলাই মাসে স্থাপনের কয়েক মাসের মাথায় এখানকার তৈরি পোশাক স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে ভারত, দুবাই, চীন ও রাশিয়ায়।
তিস্তা চর এলাকার বাসিন্দা সামিয়া আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার একটি গার্মেন্টসে স্বামীসহ চাকরি করতাম। সেখানে চাকরি করে বাসা ভাড়া, খাওয়া মিলে কোনোভাবে টাকা জমা হতো না। করোনার সময় দুজনের চাকরি চলে গেলে এক মেয়েসন্তান নিয়ে এলাকায় ফিরে আসি। তখন সঞ্চয়ের কিছু টাকা ও ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে তিন একর জমি ক্রয় করে চাষাবাদ শুরু করে সংসার চালাতে শুরু করি। কিন্তু গত বছরের বন্যায় আমাদের আবাদি ফসল নষ্ট হয়ে জমির অনেক ক্ষতি হয়।’ তিনি বলেন, ‘হঠাৎ জানতে পারি এলাকায় একটি তৈরি পোশাক কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। যোগাযোগ করে আমি এখানে চাকরি নিই। এখন ঢাকা ছেড়ে তিস্তার চরে নিজ বাড়ির পাশে চাকরি করে বেতনের সম্পূর্ণ টাকা জমা রাখছি ব্যাংকে। পাশাপাশি আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছে। কেটেছে অভাবের সংসার।’
আরেক নারী হাজেরা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিস্তা নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি, জায়গাজমি সব বিলীন হয়ে গিয়েছিল। পরে উপায় না পেয়ে পরিবার নিয়ে ছয় বছর আগে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি নিই। ২০২২ সালে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। এখন বাড়ির পাশে গার্মেন্টসে চাকরি করছি। পাশাপাশি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করছি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায়ও কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’
এদিকে কারখানার তৈরি পোশাকগুলো প্যাকেজিং করতে সহযোগিতা করছেন তিস্তা ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইমন আলী। তিনি বলেন, ‘বাবা নেই। মা ও ছোট বোনকে নিয়ে অভাবের সংসার কোনোমতে চলে। কারখানাটি হওয়ায় আমাদের অনেকটা অভাব দূর হয়েছে। তৈরি পোশাকগুলো আমি প্যাকেজিং করতে সহযোগিতা করি।’
স্থানীয় পোশাক ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন বলেন, ‘তিস্তাপাড়ে গার্মেন্টস কারখানা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় নারী ও পুরুষদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এ পোশাক কারখানা স্থানীয়দের অভাব-অনটন দূর করছে।’
তিস্তা গার্মেন্টস অ্যান্ড ফ্যাশন হাউজের সহকারী পরিচালক শাহজাহান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীভাঙন কবলিত এলাকা হওয়ায় বেশিরভাগ মানুষকে কর্মের সন্ধানে ঢাকায় যেতে হয়। আমাদের এই গার্মেন্টসের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মজীবীরা এলাকায়ই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের চিন্তাভাবনা রয়েছে, এ পোশাক শিল্পকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে তিস্তা তীরবর্তী মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার।’
পোশাক কারখানার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিস্তাপাড়ে হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এ গার্মেন্টস কারখানাটি তৈরি করা হয়েছে। এই এলাকায় অভাবী পরিবারের পাশাপাশি বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।’
