ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক বিবেচনায় তলানিতে। তবে জনপ্রিয়তার কথা যদি বলেন, সেখানে ক্রিকেটের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই। সাফল্য নেই বলেই এখন ফুটবলপ্রেমীরা মাঠমুখী হন না। তবে সাফল্যের দামামা বেজে উঠলেই শিহরণ জাগে অনেকের। খুব মন চায় মাঠে ছুটে যেতে, ফুটবলের আনন্দে মেতে উঠতে। আর তাই তো দেশের ক্লাব সংস্কৃতিতে ফুটবলের অবস্থান শিখরে। বিনিময়ে কী মিলবে, সেটা মুখ্য হয়ে ওঠে না। ক্লাবকর্তারা গন্ডায় গন্ডায় টাকা খরচা করেন ফুটবল দল গঠন ও লালন-পালনে। তাই তো ফি মৌসুমে বাজেট কেবল বাড়েই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের মাঝারি সারির দলের পেছনে খরচা হয়ে যায় সাত থেকে আট কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্তর চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের দলের পেছনে গড় খরচা পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকা। ক্লাবগুলোর যখন বড় অঙ্কের বাজেট জোগাতে হাপিত্যেস ছোটে সেখানে বিস্ময়কর ব্যতিক্রম বাংলাদেশ পুলিশ ফুটবল ক্লাব। কম বাজেটেও যে ভালো ফল মেলে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পুলিশ। আসছে ফুটবল মৌসুমে একই তরিকায় হেঁটে নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্য তাদের।
করোনায় বাতিল হয়ে গিয়েছিল ২০১৯-২০২০ মৌসুম। সেবার শীর্ষ লিগে প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল পুলিশের। অতিমারীর কারণে সেবার নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ মেলেনি। পরের মৌসুম থেকে টানা চারটি মৌসুমে পুলিশ খেলেছে শীর্ষ লিগে এবং তাদের উন্নতিও চোখে পড়ার মতো। ২০২০-২১ মৌসুমে ১৩ দলের প্রিমিয়ার লিগে তারা হয়েছিল নবম। ২০২১-২২ লিগে একধাপ উন্নতি হয় তাদের। তবে ২০২২-২৩ প্রিমিয়ার লিগে চমক দেখিয়ে তৃতীয় হয় পুলিশ এফসি। তারা পেছনে ফেলে মোহামেডান, শেখ জামাল, শেখ রাসেলের মতো বিগ বাজেটের দলগুলোকে। গত মাসে শেষ হওয়া মৌসুমে পুলিশ লিগ শেষ করে চারে থেকে। তাদের ওপরে কেবল চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস, মোহামেডান ও আবাহনী। এবারও তাদের নিচে শেষ করে শেখ জামাল, শেখ রাসেলের মতো বড় বাজেটের দলগুলো।
দলটা একেবারেই তারকাসমৃদ্ধ নয়। তবে ফি বছর পুলিশ ঠিকই উপহার দিচ্ছে তারকা। তাদের জার্সিতে নিজেদের প্রমাণ দিয়ে অনেকেই গত কয়েক বছর পৌঁছে গেছে জাতীয় দলে। অথচ জানেন, এই ক্লাবটা সারা বছর ফুটবল দল চালাতে খরচ করে অনেক কম টাকা। শুনলে অবাক হবেন, একাধিক বিদেশি কোচ, বিদেশি খেলোয়াড়দের বেতন দিয়ে, স্থানীয়দের নির্ধারিত সময়ে পারিশ্রমিক দিয়ে, দলের খেলোয়াড়দের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে পুলিশের ফি বছর খরচ হয় পাঁচ কোটি টাকারও কম! অন্যান্য ক্লাবের কর্তাদের কাছে যা এক বড় বিস্ময়। সেটাই বছরের পর বছর করে দেখাচ্ছেন পুলিশের কর্তারা এবং খেলোয়াড়রাও নিজেদের উজাড় করে খেলে এনে দিচ্ছেন সাফল্য। সাফল্য বলতে যদি শিরোপাকে মাপকাঠি ধরা হয়, সেটা প্রত্যাবর্তনের পর এখনো পাওয়া হয়নি ঠিক। তবে লিগে ক্রমোন্নতি, পরপর দুটি ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনাল খেলাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার জো নেই। তো, কী করে তারা এত কম বাজেটে ফলাফল আনতে পারছেন? প্রশ্নটি ছিল পুলিশ ফুটবল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) শেখ মো. রেজাউল হায়দারের কাছে, তিনি রহস্যভেদ করলেন এভাবে, ‘শুরু থেকেই আমরা সংস্থার ভেতর থেকে খেলোয়াড় বাছাই করে দলে নিয়েছি। শুরুর দিকে সংখ্যাটা কম হলেও সর্বশেষ মৌসুমে ১৬ জন কনস্টেবল দলের নিবন্ধিত হিসেবে ছিল। আমাদের নিজস্ব মাঠ, আবাসন ব্যবস্থা, জিম, সুইমিং, যানবাহনের সুবিধা রয়েছে। তাছাড়া পুলিশের নিজস্ব হাসপাতাল থাকায় চোট পাওয়া খেলোয়াড়দের চিকিৎসাটাও আমরা করাতে পারি বিনামূল্যে। কিছু বিদেশি ও স্থানীয় খেলোয়াড় নিতে হয়। এছাড়া খাবার ও সরঞ্জামাদির খরচা যোগ করলে ফি বছর আমাদের বাজেটটা অন্যদের তুলনায় অনেক কম থাকে। ওপরের সারির ক্লাবগুলোর সঙ্গে যদি তুলনা করেন, সেটা আমার মনে হয় ছয় ভাগের এক ভাগ।’
আসছে মৌসুমেও কনস্টেবলদের মধ্য থেকে আরও চার-পাঁচজনকে নিবন্ধন করার কথা জানালেন এই কর্মকর্তা। তবে লক্ষ্যটা যেহেতু নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার, বিদেশিদের পেছনে বাজেটটা এবার বাড়বে পুলিশের। হায়দার বলেন, ‘আসলে আমাদের সীমিত বাজেটের মধ্য দিয়েই দল গড়তে হয়। চাইলেও আমরা অনেক টাকা খরচ করতে পারি না। তারপরও আমরা চেষ্টা করব এমন দল গড়তে যেন এক-দুইয়ের মধ্যে থাকতে পারি।’ তিনি জানালেন গত তিন মৌসুমে দলের দায়িত্ব পালন করা রুমানিয়ান কোচ আরিস্তিকা চিওয়াবাকে এবার তারা রাখছেন না। শোনা যাচ্ছে এই কোচকে নিতে যাচ্ছে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব।
পুলিশের কনস্টেবল ঈশা ফয়সাল এখন বনে গেছেন বড় তারকা। জাতীয় দলের লেফটব্যাক পজিশনে কোচ হাভিয়ের কাবরেরার প্রথম পছন্দ। স্বাভাবিকভাবেই ঈশার বাজারদর বেড়েছে অনেক। তারপরও তিনি পুলিশের চাকরি ছাড়েননি। এ রকম আরও অনেকেই আছেন, যারা চাইলেই ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার চুক্তিতে খেলতে পারেন অন্য ক্লাবে। কেন তারা মামুলি কনস্টেবলের চাকরি ছাড়েন না তার একটা ব্যাখ্যা দিলেন হায়দার, ‘দেখুন, একজন ফুটবলার খুব বেশি হলে ৩০ থেকে ৩২ বছর পর্যন্ত সেরাটা খেলতে পারবে। তারপরই তার ফর্ম পড়তির দিকে যেতে থাকে। আমাদের যারা কনস্টেবল, তাদের বেতন-ভাতা মাসে খুব কম বলা যাবে না। সব সুবিধা যোগ করলে অঙ্কটা ৩৫ হাজার টাকার মতো। এখন একজন খেলোয়াড়ের যখন খেলার সামর্থ্য থাকবে না, তখনো তাদের চাকরিটা থেকে যাবে।’
ক্লাবের ম্যানেজার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবু তাহের জানান, ‘শেষ দুই মৌসুমে যেহেতু তিন আর চারের মধ্যে ছিলাম, সামনে এক-দুইয়ের লক্ষ্য নির্ধারণের বিকল্প নেই। আমরা সেভাবেই এগোচ্ছি।’
‘তেলও কম ভাজাও মুচমুচে’ ভীষণ প্রচলিত এই বাগধারাটি পুলিশ ফুটবল ক্লাবের জন্য বড্ড জুতসই। ছোট বাজেটে বড় সাফল্য পাওয়ার তরিকাটা অন্য ক্লাবগুলো কিন্তু তাদের কাছ থেকেও আমদানি করতে পারে।
