বিপর্যয়ে কি থামবে সংঘাত

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৪, ১২:০১ এএম

লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গ্রুপ হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, এই যুদ্ধ হবে ওই এলাকার জন্য একটি বিপর্যয়। কিন্তু লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তে প্রতিদিন গোলাগুলি, বোমাবর্ষণের যে আতঙ্ক তার থেকে মুক্তির পথ হিসেবে সর্বাত্মক যুদ্ধকেই শ্রেয় মনে করেন সীমান্তের বাসিন্দারা। সীমান্তের ইসরায়েলি এলাকায় কেরেইট শায়নার বাসিন্দা ডেভিড ক্যামার এটাই মনে করেন।

লেবানন-ইসরায়েল সীমান্ত থেকে বিবিসির লুসি উইলিয়ামসনের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে হিজবুল্লাহর ছোড়া রকেটে তার বাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রকেটের আঘাতে দেয়াল গুঁড়িয়ে গেছে। টেলিভিশনটি বিধ্বস্ত হয়েছে। আঙিনায় থাকা গাড়িটিও আগুনে শেষ হয়ে গেছে। কেরেইট শায়নার যেখানে ক্যামারের বসতি তার ওপরের পাহাড়ে হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকা শুরু। তিনি বলছেন, এখানে তার জন্ম। প্রতিদিন, প্রতিরাত বোমা পড়ছে। এখানে থাকলে যে কেউ পাগল হয়ে যাবে।

তবু রকেটের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে ক্যামার বাড়িতে আছেন। তার বয়স ৭১। তিনি বলছেন, বাড়ি ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।

যদিও গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তাদের সমর্থনে হিজবুল্লাহর রকেট বৃষ্টি শুরু হলে কেরেইট শায়না এলাকা থেকে অধিকাংশ বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ইসরায়েল পাল্টা লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থানে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে তাদের কয়েকজন কমান্ডারকে হত্যা করেছে। তার জবাবে চলতি মাসে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সীমান্ত এলাকা জুড়ে বড় আকারে ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দুপক্ষের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলার হুমকি বেড়েছে। অন্তত ৬০ হাজার বাসিন্দাকে সীমান্ত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সপ্তাহের শুরুতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের হাইপা শহরে দেশটির সামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোর ড্রোন ফুটেজ প্রকাশ করেছে।

পরিস্থিতি যখন সর্বাত্মক যুদ্ধ ডেকে আনছে তখনো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতিতে রাজি হচ্ছেন না। তিনি হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে লেবানন সীমান্তেও হামলা অব্যাহত রেখেছেন। অথচ হাইপা শহরে মেয়রের কার্যালয়ের কাছে পড়ছে হিজবুল্লাহর রকেট।

যদিও এ সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলের সামরিক মুখপাত্র বলেছেন, এই লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। রিয়ার অ্যাডমিরাল ডানিয়েল হাগারি ইসরায়েলি টিভিকে বলেন, ‘আমরা হামাসকে ধ্বংস করে দিতে পারি বা হামাসকে অদৃশ্য করে দিতে পারি এমন ধারণা জনগণের কাছে বিভ্রান্তিকর।’

অন্যদিকে লেবানন সীমান্ত থেকে ৯০ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যারা রয়ে গেছেন, তারাও আতঙ্কের মধ্যে থাকতে থাকতে ক্ষুব্ধ। ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে লেবাননের জাবালা এল বতম এলাকার বাসিন্দা ফাতিমা বেলহাস ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের শব্দে ভয়ে কেঁপে ওঠেন। তিনি বলেন, কিন্তু বোমাবর্ষণ হলেও এলাকা ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করতে পারেন না তিনি। কারণ তিনি কোথায় যাবেন। তার কোনো আত্মীয় নেই, কারও কাছে গিয়ে থাকারও উপায় নেই। কারণ তার তো টাকা নেই। ফাতিমা বলেন, ‘তার চেয়ে বরং বাড়িতে থেকেই মর্যাদা নিয়ে মারা যাওয়া অনেক ভালো হতে পারে। আমরা তো প্রতিরোধ করতে করতেই বেড়ে উঠেছি। ফিলিস্তিনিদের মতো তো আর বিতাড়িত হব না।’

লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তের এই সংঘাত সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নিলে ওই অঞ্চলের সংকট ভিন্ন মাত্রা পাবে। জাতিসংঘ মহাসচিবের ভাষায়, ‘এমন বিপর্যয় আমাদের কল্পনাতীত।’

ইসরায়েলের কিবাতজ মালিকয়া এলাকার টম পেরি মনে করেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগের যথার্থতা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি নেতারা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের কোনো কৌশল নেই। তারা সবাই ব্যর্থ। সেনাবাহিনী ও নেতারা। এমন নেতার আমাদের দরকার নেই। তাদের পদত্যাগ করা উচিত।’

সংঘাত শেষ হলে ইসরায়েলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত