ইজারার নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে গ্রাম ঘেঁষে শতাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের মহাযজ্ঞ চলছে। মাসখানেক ধরে উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের চরকালীপুরা গ্রাম ঘেঁষে চলছে বালু উত্তোলন। কোরবানির ঈদ ঘিরে সম্প্রতি পাঁচ থেকে ছয় দিন বন্ধ থাকলেও আবার সেখানে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবারও চরকালীপুরা গ্রাম ঘেঁষে বালু উত্তোলন করতে দেখা গেছে। বালু উত্তোলনের কারণে নদীর পাড়ে ভাঙন দেখা দেওয়ার আতঙ্কে আছেন গ্রামবাসী। সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ বসতভিটা আর ফসলি জমি মেঘনায় বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার চরকালীপুরা, নয়ানগর, রমজানবেগ ও ষোলআনি গ্রামসংলগ্ন মেঘনার বালুমহাল ইজারা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ বালু মহালের ১২৮ একর জুড়ে মেঘনা বক্ষে বালু উত্তোলন করা যাবে। বালু মহালটি ইজারা পেয়েছে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। মাসখানেক ধরে রাতে ওই মহালের পাশের চরকালীপুরা গ্রাম ঘেঁষে শতাধিক ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করছে রাজধানীর দিলকুশার ওই ইজারাদার প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, মেঘনা তীরের এ গ্রামের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। বর্ষার পানিতে তলিয়ে আছে ফসলি জমি। দিনে গ্রাম লাগোয়া ডুবে থাকা ওই জমি থেকে কিছুটা দূরেই ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর রাতের আঁধারে জমি ঘেঁষেই বালু উত্তোলনের কর্মযজ্ঞ চলে। প্রশাসনের লোকজন ও সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেলে দ্রুত ড্রেজারগুলো দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়। গ্রামবাসী দাবি করেন, ওই বালু মহালের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মেঘনায় বালু উত্তোলনের কাজ দেখভাল করে আসছেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনসুর আহমেদ খান জিন্নাহ।
চরকালীপুরা গ্রামের জুলহাস প্রধান (৫৫) বলেন, ‘বর্ষা আইলেই নদী ভাঙনের ভয়ে আমাগো বুক কাপে। এহন আবার গ্রামের কাছেই ড্রেজারে বালু কাটতাছে। আমাগো উপজেলা চেয়ারম্যান জিন্নাহ বড় একটা কোম্পানির সঙ্গে মিলে এ বালু উত্তোলন করতাছে। যেভাবে ড্রেজার লাগাইছে, তাতে গ্রামের জমি ও বসতভিটা এ বর্ষাতেই ভাইঙ্গা যাইব। আমাগো প্রতিবাদ করার সাহস নাই। তাই অহন আল্লার কাছে বিচার দিয়া রাখছি। আল্লাহ বিচার করবো তাগো।’
গ্রামের আব্বাস প্রধানের স্ত্রী নার্গিস আক্তার (৫০) বলেন, এ গ্রামের একেবারে নদী ঘেঁষে রয়েছে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প। ১২ বছর আগে এ আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে ১২০টি পরিবারের। এ ছাড়া এ গ্রামে আরও ২০০টি পরিবার বসবাস করে আসছে বংশ পরম্পরায়। ৩ শতাধিক পরিবারের আশ্রয় এ গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দার রোজগারের একমাত্র উপায় মেঘনায় মাছ শিকার। এক কথায় অধিকাংশ পরিবার হতদরিদ্র। গ্রামের ওই নারী বলেন, আমাগো চোখের সামনেই গ্রামের জমিগুলোর পাশেই বালু উত্তোলনের জন্য ড্রেজার লাগাইছে। চোখে দেখতাছি, তয় বাঁধ সাধতে পারি না। কিছু কইতে গেলেই মারতে আসে। এমনে বালু কাটলে তো এ বর্ষায় আমাগো ঘরবাড়িই ভাইঙ্গা লইয়া যাইবো রাক্ষুসি মেঘনা।’
গ্রাম ঘেঁষে ড্রেজারের বালু উত্তোলনের কথা অস্বীকার করেছেন গজারিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনসুর আহমেদ খান জিন্নাহ। তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে ইজারা পেয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট স্থানেই বালু কাটা হচ্ছে। আপনারা সরেজমিন ঘুরে দেখে যান। এটা আপনাদের গ্রাম না। এটা আমার গ্রাম, আমার ইউনিয়ন। আমার জন্মস্থান।’
বালু উত্তোলন কাজে ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না জানতে চাইলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, ‘জড়িত থাকলে কি হইছে। ব্যবসা তো সবাই করে। তবে আমার গ্রাম বিলিয়ে দিয়ে ব্যবসা করব না।’
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. আবুজাফর রিপন সাংবাদিকদের বলেন, ‘সীমানা অতিক্রম করে বালু কাটার কথা শুনেছি। গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু কাটা না হয়।’
