কিছুদিন আগে ভারতের মিডিয়া তো বটেই বাংলাদেশের মিডিয়া জুড়েও আম্বানিপুত্রের বিবাহের রোশনাই জ্বলজ্বল করছিল। রাজ-রাজড়াদের বিয়ে সবসময়ই ঝলমলে হয়। এইসব অনুষ্ঠান এক অর্থে তাদের জন্য বিনিয়োগও। এর মাধ্যমে তারা দেখান তারা কতটা ক্ষমতাশালী। এতে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের লাভ হয়, ক্ষমতা আরও সুসংহত হয়। যতই আধুনিক যুগ হোক, এই ধারার পরিবর্তন হয়নি। বরং বিশ্বায়নের যুগে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। আম্বানিপুত্রের বিয়ে নিয়ে মিডিয়ার বিপুল আগ্রহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে আমরা অনেক জানা-অজানা জিনিস জানতে পারি। এই বিয়েতে কত খরচ হলো, কত পদের বাদ্য বাজল, রোশনাই জ্বলল, আর ধনী লোকের কত কত পদের শখ থাকতে পারে তা জেনে আমরা, হতদরিদ্ররা, বগল বাজিয়ে নেত্য করলাম। আমরা জানতে পারলাম রিচ কিডরা শখের বশে হাতি পালেন, তাদের হাতিশাল জুড়ে থাকে অসংখ্যা অতিকায় হস্তি।
রিচ কিডরা এমনই হন। আমরা প্রায়শই কারও আচরণে খেপে গিয়ে বলি- দেশটা কি তোর বাপের? রিচ কিডরা আক্ষরিক অর্থেই তেমনটা ভাবেন। তাদের বাবারা নানা কায়দায় তাদের সামনে দেশ তো দেশ, গোটা দুনিয়া হাজির করেন। আমরা দেখি দুনিয়ার কোন প্রান্তে রিচ কিডেরা দামি ইয়টে করে ঘুরে বেড়ান, কে কার চেয়ে দামি গাড়ি কিনতে পারেন তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করেন, কেউ দুনিয়ার সবচেয়ে লাস্যময়ী মডেলের সঙ্গে সারা রাত বিশ্রম্ভালাপ করবেন বলে কোটি কোটি মুদ্রা ব্যয় করেন, আর হাতি পালার কথা তো বলাই হলো।
আর সবকিছুর বিশ্বায়নের মতো রিচ কিডেরও বিশ্বায়ন হয়। খালি যে ধনী দেশেই রিচ কিডরা ইত্যাকার শখে লিপ্ত থাকেন তাই না, আমাদের মতো গরিব দেশেও এদের দেখা যায়। এদের বাপেরা নানা কায়দায় দেশের সম্পদ লুটেপুটে আদরের রিচ কিডদের পদতলে সমর্পণ করেন। আর আমরা সিমেন্টের বিজ্ঞাপনের মফিজের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলি, ইওর রিচ কিড, মাই কান্ট্রি স্যার। ইউ আর প্রাউড স্যার।
কিন্তু হায়! হতভাগা বাংলাদেশিদের রিচ কিডও এদের সম্মান ডুবিয়ে দেন। কোথায় অন্য দেশের রিচ কিডরা বাঘের গলায় শেকল লাগিয়ে রাস্তায় হাঁটেন, বিরাট হাতিশাল করেন শখের বশে, সেখানে আমাদের রিচ কিড ধরা পড়েন ছাগল হাতে। কোরবানির হাটে ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগল নিয়ে ধরা পড়েন আমাদের নেকাবোকা রিচ কিড। আমরা যারা আগে থেকেই ওর বাপেদের বলির পাঁঠা হয়ে আছি, গর্বিত ছাগল (দের) দেখে আমাদের আবার লজ্জায় মাথা কাটা যায়।
তবে দিনশেষে আমাদের ছাগল রিচ কিড আসলে অনভিজ্ঞতায় ধরে পড়েন। একে তো বয়স কম, তায় সামাজিকভাবে বাপের স্বীকৃতি নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক মাধ্যমের চাপ। এত এত সম্পদ উপভোগের মজাটা কই যদি তা অন্যদের দেখিয়ে ভাবই না নিতে পারলাম!
এই ফাঁকে একটা গল্প বলি। ঢাকা শহরেরই এক কাহিনি, বানানো গল্পও হতে পারে। কোনো এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানি অতি ধনীদের জন্য একটা ব্যবসার প্রকল্প নিয়েছিল। সেই প্রকল্পে একেকটা কন্ডোমোনিয়াম বা দামি ফ্ল্যাট ২০ কোটি দরে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা করেন। জানতে পেরে আরেক রিয়েল এস্টেট কোম্পানি একই রকম প্রকল্প নেয়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে তারা ১৮ কোটিতেই ফ্ল্যাট বিক্রির ঘোষণা দেন। কিন্তু কী আশ্চর্য! তারা কোনো সাড়াই পাননি। অন্য প্রকল্পে ২০ কোটিতে ক্রেতার অভাব না হলেও বিস্ময়করভাবে তারা দুই কোটি কমিয়ে ক্রেতা পাচ্ছিলেন না।
তখন এক মার্কেটিং গুরু এসে উপদেশ দিলেন, আপনারা ফ্ল্যাটের দাম ২২ কোটি করে দিন। লে হালুয়া! দাম কমিয়েই বিক্রি হয় না, বাড়ালে কে কিনবে! অবিশ্বাস্যভাবে গুরুর উপদেশ কাজে দিল, ২২ কোটিতে কেনার হিড়িক পড়ে গেল। কিন্তু কেন? কারণ একটা পর্যায়ে গেলে পণ্যের কেবল উপযোগিতা থাকে না, পণ্য প্রদর্শনবাদে পরিণত হয়। সম্পদ বাড়তে বাড়তে যখন একটা পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন এর ডিমিনিশিং রিটার্ন শুরু হয়। রিচ কিড আর তার বাবারে প্রতিযোগিতায় কে কার থেকে বেশি দাম দিয়ে কিনতে পারেন সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়। নিশ্চিতভাবেই আম্বানির বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো এখানেও সামাজিক মর্যাদা কিনে নেওয়ার বিনিয়োগ আছে, কিন্তু হরেদরে রিচ কিড মানসিকতা বোঝার জন্য গল্পটা উপযুক্ত।
অবশ্য আমারে ছাগল কিডকে নিয়ে আমরা যতই বিব্রত হই, হরেদরে দুনিয়ার সব রিচ কিডরাই একটা শ্রেণি চরিত্র ধারণ করেন। এরা দুনিয়াকে বাপের তালুক ভাবেন। আমাদের আলোচ্য কিড সমন্ধেও আমরা শুনতে পাই তিনি রাতের বেলায় রাস্তায় দামি গাড়ির রেস করতেন। এই কিডদের কারণে দুই চারটা পথচারী বা রাস্তায় শুয়ে থাকা মানুষ মরেটরেও যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এমন আকছার হয়, মার্কিন মুলুকে তথা উন্নত দেশেও নাকি হয়। বাংলাদেশের আলাপ বা, এমনকি যেসব দেশে আইনের শাসন নিয়ে গর্ব করে সেসব দেশেও নাকি রিচ কিডরা আইনের হাত থেকে বেঁচে যান।
যেমনটা এই রিচ কিডের বৈমাত্রেয় ভগিনীর বেলাতেই দেখা যায়। তিনি কানাডায় বসে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি হাঁকাচ্ছেন, তা উনার সামাজিক মাধ্যমের ছবি থেকেই জানা যায়। প্রায় সবাই জানেন, দেশের রিচ কিডের বাপেরা সেই কানাডাতেই বেগমপাড়া বানিয়েছেন। ভারতীয় লুটেরারদের বেগমরা শুরুতে ওখানে থাকতেন বলে এই নাম। তাদের অনুসরণ করে বাঙালি বেগমরাও সেখানে দারুণ শান-শওকতের জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের স্বামীদের কেউ কর কর্মকর্তা, কেউ পুলিশ, কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ ব্যবসায়ী। পশ্চিমারা আগে সরাসরি উপনিবেশ করত আর এখন এসব লুটের টাকার সুরক্ষা দেয়, কানাডার বেগমপাড়া হোক বা সুইস ব্যাংকে। লন্ডনের মতো শহরে বেশিরভাগ বাড়ি কিনে নেন পূর্ব ইউরোপের অলিগার্করা। দুনিয়ার নানা প্রান্তের শ্রমজীবী মানুষের টাকা লুটে ধনী হওয়াদের অর্থের উৎস খুঁজতে যায় না উন্নত দেশের সরকাররা। কোনো কোনো পণ্ডিত বলে থাকেন, ছিঃ! এইসব ঘাঁটতে আছে? এগুলো তো প্রাইভেসি ব্রিচ। আপনি আর যাই করুন কারও প্রাইভেসি ব্রিচ করতে পারেন না। এই অধিকার কারও নেই। এই পণ্ডিতদের বেলায় পরে আসছি।
স্থানীয় ও বৈশ্বিক রিচ কিডরে আলাপে ফিরে আসি। আমরা এখন যে রিচ কিডের আলাপ দিচ্ছি তা দৈবাৎ ঝড়ে গাছ থেকে পড়ে যাওয়া আমের মতো। আমরা, তথা জনগণ ও মিডিয়া, জসীম উদ্দীনেরমামার বাড়ি কবিতার ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ, পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ’-এর মতো এদের নিয়ে উল্লাসে মত্ত থাকি। আরও অনেক শক্তপোক্ত রিচ কিডরা আমাদের আওতার বাইরেই থেকে যান।
হরেদরে সমস্ত রিচ কিডের পিতারাই নানাভাবে লুটেপুটে ধনী হন। তাহলে এরে ধরার কায়দা কী? এরা এতটাই শক্তিশালী যে, দেশের আইনও মোটামুটি এদের কেনা। আর তেমন বিপদ হলে বেগমপাড়ার মতো গোটা বিশ্ব তো আছেই। অসহায় জনগণের একটা উপায় হচ্ছে এদের সামাজিকভাবে বয়কট বা অপদস্থ করা। রাষ্ট্র আর আইন যেহেতু নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, মরিয়া জনগণ হয়তো এতটুকুই করতে পারে। তবে রাষ্ট্র নানা তরিকায় আবার দীর্ঘদিন একটা জিনিস বোঝাতে পেরেছে যে, অর্থ আর ক্ষমতাই সব। ফলে যে সামাজিক প্রতিরোধটা আসার কথা তাও ভোঁতা হয়ে যায়। সমাজের একটা বড় অংশের মানুষ লটারি পাওয়ার মতো স্বপ্ন খেতে থাকেন সুযোগ পেলে আমরাও লুটেপুটে নেব, আমাদের বাচ্চারা রিচ কিড হবে। কিন্তু হায়, ক্যাসিনোর নিয়মই এই যে, লাভ সবসময় হাউজের হবে, বেশিরভাগ জুয়াড়িরাই সর্বস্বান্ত হবেন। ফলত, যারা ব্যাপারটা টের পান, তারা এই লুটের র্যাটরেসের বলে প্রতিরোধই শ্রেয়- তা বুঝতে পারেন। অবশ্য প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এদের শক্তি ও সংখ্যা অপ্রতুল।
সে অনেক বড় আলাপ। একটা কথা প্রায়শই উঠে যে, রিচ কিডের পিতারা যদি লুটেরা হন দোষটা তাদের ঘাড়ে পড়বে কেন? আলাপটা সম্ভবত কুতর্ক ছাড়া আর কিছু না। আপনার এক লাখ টাকা বেতনের বাপ যখন কোটি টাকার গাড়ি, কয়েক কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট কেনেন, সেগুলো ভোগ করার আগে নিশ্চয়ই আপনি জানেন ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। তবুও অক্লেশে সেগুলোর সুযোগ নেন। ফলে, দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আর প্রাইভেসি নিয়ে পণ্ডিতদের যে আলাপটা করছিলাম-
এই পণ্ডিতদের অধিকাংশই কিন্তু দরিদ্রদের জীবন একদম মর্গের লাশের মতো কাটাছেঁড়া করেন। নানা পদের দারিদ্র্য বিমোচন তত্ত্ব, উন্নয়নের নামে এমন সব গল্প ফাঁদেন যাদের দুর্মুখেরা বলেন পোভার্টি পর্ন। অথচ, ধনীদের জীবনের বেলায় এইসব কাটাছেঁড়া চলে না। সেগুলো সম্পদের দেয়ালে আড়াল করা। সত্যিই যদি সমাজকে বোঝাপড়ার ব্যাপার হতো তবে গরিবের হাঁড়ির খবরের পাশাপাশি রিচ কিডদের গোপন জীবন নিয়েও তারা আগ্রহী হতেন। কারণ অসাম্যের সমাজ বুঝতে, দারিদ্র্য দূর করতে কেবল দরিদ্র নয়, ধনীদের পাঠ করাও জরুরি।
কার্ল মার্ক্স বলতেন, এই পণ্ডিতরা উচ্চনীতির কথা বলে আসলে একধরনের শ্লাঘা অনুভব করেন। সবকিছুকেই কাঠামোগত সমস্যার আলোকে দেখিয়ে, কথার জালে ফেলে নিজেদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতভাবে অন্যদের চেয়ে শ্রেয়তর ভাবেন। সাধারণের চেয়ে ওপরের স্তরে বসবাস করেন। জ্ঞানের দাঢ্য তাদের প্রবল। রিচ কিডদের সাজানো বাগানে তাই কেউ ঢিল ছুড়লে তাদের খুব ব্যথা হয়, উচ্চমার্গীয় তত্ত্বে আহা-উহু করেন। দুষ্টরা বলে, রিচ কিডদের নানা পাইক-পেয়াদার পাশাপাশি উনারাও দারোয়ানগিরি করেন। তবে যে যাই বলুক, রিচ কিডদের ছাগল হতে দেখা বিনোদনের। সদা শোষিত জনগণের জন্য ক্ষণকালের সার্কাস।
লেখক: সাংবাদিক ও অনুবাদক
[email protected]
রামমন্দিরে কীভাবে পানি ঢুকছে জানালেন ট্রাস্ট প্রধান
সাড়ে ১২ লাখে বিয়ে করেন ভারতীয়রা, শিক্ষায় খরচ অর্ধেক!
জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে আমি মারা যাব: প্রধানমন্ত্রী
গরমে গলে গেছে আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাস্কর্য!
পুত্রবধূর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে শাশুড়ির চাপ!