একসনা ইজারায় স্থায়ী পাকা মার্কেট

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৪, ০২:৪৫ এএম

চুকনগর বাজারে ৫৬ শতক জমি ৮৮ জন ব্যক্তির কাছে একসনা ইজারা দিয়েছে খুলনা জেলা পরিষদ। ইজারা কাগজে-কলমে দেখানো হলেও এর শর্ত ভেঙে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হচ্ছে। বিশেষ করে অস্থায়ী বা আধা পাকা দোকানঘর নির্মাণের নিয়মে ব্যত্যয় ঘটেছে। ছাদযুক্ত স্থায়ী পাকা মার্কেট নির্মাণ করে ১২৬টি দোকানঘর করা হচ্ছে।

অভিযোগ আছে, মার্কেটে অবস্থান অনুসারে দোকানঘরপিছু ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা বাগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ১২৬টি ঘর থেকে অন্তত ২০ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি পক্ষ। অথচ জেলা পরিষদকে দেওয়া হচ্ছে যৎসামান্য জমি ইজারার মূল্য, আয়কর ও ভ্যাটের টাকা। একনামে একাধিক দোকানঘরও ইজারা দেওয়া হয়েছে। ইজারা পাওয়ায় বাদ পড়েননি পরিষদের সদস্যরাও। এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার সংযোগস্থল চুকনগর বাজার। এ বাজারের যতিন-কাশেম সড়কের পাশে স্বাধীনতার আগে ৫৬ শতক জমির ওপর নির্মিত হয় ডাকবাংলো। বাংলোটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়লে ওই জমিতে ২০২০ সালে সেলামিমূল্যে ‘চুকনগর সুপার মার্কেট’ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে জেলা পরিষদ। কিন্তু চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি জেলা পরিষদ প্রকল্পটি বাতিল করে। একই সঙ্গে ওই জমি ইজারা দেওয়ার জন্য জেলা পরিষদ সম্পত্তি বিধিমালা-২০১৭ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রকল্প বাতিলের পর গত ৭ মার্চ খুলনা জেলা পরিষদ ষষ্ঠ সভার আয়োজন করে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৮৮ জনের মধ্যে ১০৬ থেকে ১৪২ বর্গফুট আয়তনের জায়গা একসনা ইজারা দেওয়া হয়। এর আগে ১৯ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সংস্থাটি। বিজ্ঞপ্তিতে ইজারার ৪ নম্বর শর্তে উল্লেখ করা হয়, ইজারাদারকে জেলা পরিষদের নির্ধারিত হারে ইজারামূল্য ও বিধি অনুযায়ী আয়কর ও ভ্যাট দিতে হবে। সবচেয়ে ছোট আয়তনের ১০৬ বর্গফুটের দোকানঘরের আয়কর ও ভ্যাটসহ ইজারামূল্য ৭ হাজার ৬৩২ টাকা। আর সবচেয়ে বড় ১৪২ বর্গফুট আয়তনের দোকানঘরের আয়কর ও ভ্যাটসহ ইজারামূল্য ১০ হাজার ২২৪ টাকা।

বিজ্ঞপ্তির সাত নম্বর শর্তে উল্লেখ করা হয়, লিজপ্রদত্ত জমিতে কোনো স্থায়ী বা পাকা অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। তবে লিজগ্রহীতা জেলা পরিষদের অনুমতি নিয়ে সেমিপাকা দোকানঘর বানিয়ে ব্যবসা চালাতে পারবেন। অথচ শর্ত ভেঙে ওই জমিতে ছাদযুক্ত মার্কেট নির্মিত হচ্ছে। সেখানে দোকানঘর হচ্ছে ১২৬টি।

অভিযোগ উঠেছে, ছাদযুক্ত মার্কেটের দোকানঘরপিছু ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা বাগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শুধু জমির ইজারার কাগজ ছাড়া গৃহীত টাকার ডকুমেন্ট দেওয়া হচ্ছে না। ১২৬টি দোকানঘর থেকে অবৈধ বাণিজ্য হবে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। জেলা পরিষদের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পরিষদের সম্পত্তি সংস্থার চেয়ারম্যান, সদস্য বা কর্মচারীর নামে বা বেনামে অথবা তার আত্মীয়র নামে ইজারা নেওয়া বা ভাড়া নেওয়া যাবে না। কিন্তু ইজারাপ্রাপ্তদের তালিকায় পরিষদের কয়েকজন সদস্যদের নাম রয়েছে।

অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে, তারা হলেন জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান চৌধুরী মোহাম্মদ রায়হান ফরিদ, জেলা পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সরোজিত কুমার রায়, ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জি এম আব্দুল্লাহ, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. রবিউল ইসলাম গাজী, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এমডিএ হালিম বাবু, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সাবিনা ইয়াসমিন, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য দিলীপ হালদার, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সাইফুল ইসলাম, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এমডি মফিজ উদ্দীন, সংরক্ষিত ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নাহার আক্তার, ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হাসনা হেনা ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফারহানা নাজনীন। ইজারার তালিকায় অনেকের নাম দুবারও রয়েছে। তারা হলেন ইন্দ্রজিৎ দেব, কবিতা আঢ্য, জয়দেব আঢ্য, শেখ মো. আলাউদ্দিন, নিত্য গোপাল সিকদার, রূপা রানী সিকদার, তামীম হাসান, মো. আতিকুজ্জামান, জুঁই সাহা ও জ্যোস্না সিকদার।

ডাকবাংলোর পাশে ৪০ বছর বসবাস করেন অলোকা রানী। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, ৪০ বছর ধরে দেখছি এখানে বড় বড় গাছ। ডাকবাংলোয় বড় বড় অফিসাররা এসে থাকতেন। এখন পুরনো বাংলো ভেঙে মার্কেট হচ্ছে। মার্কেটের সামনের প্রত্যেকটি দোকানঘর ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

চুুকনগরের ব্যবসায়ী মাসুদ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘ডাকবাংলোর জায়গায় তার চাচা শেখ কেরামত ও শেখ নুরুজ্জামানের নামে দুটি দোকারঘর ছিল। তাই নতুন মার্কেটে দোকানঘর পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার আছে। অথচ তারা দোকানঘরই পাননি। সংশ্লিষ্টরা দুটি ঘরের জন্য ৩০ লাখ টাকা চেয়েছেন। এত টাকা জোগাড় করতে না পারায় তারা দোকানঘর পাননি।’

আটলিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান প্রতাপ কুমার রায় দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘ইজারা প্রদানে চরম অনিয়ম হয়েছে। জেলা পরিষদের ইজারার তালিকায় দেখা গেছে ৯০ ভাগ দোকানঘর ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, নড়াইল, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট জেলা ও খুলনা সদরের লোকজন পেয়েছেন।’ তিনি বলেন, বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলে কাগজে-কলামে বাইরের ওইসব লোকজনের কাছে দোকানঘর ইজারা দেখানো হয়েছে। এখন চুকনগরের কিছু প্রভাবশালীদের মাধ্যমে ছাদযুক্ত মার্কেট বানিয়ে উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে।

প্রতাপ কুমার রায় জানান, একসনা ইজারায় ছাদযুক্ত ঘর নির্মাণ করা যায় না। ব্যবসায়ীরা স্বল্পমূল্যে জমি ইজারা নিয়ে অস্থায়ী বা টিনশেড ঘর করে ব্যবসা করবেন। অথচ ছাদযুক্ত মার্কেট করে প্রতিঘর থেকে ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ১২৬টি দোকানঘর থেকে অবৈধভাবে অন্তত ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এ টাকার কোনো নথি দেওয়া হচ্ছে না। শুধু জমির ইজারামূল্যের টাকার রসিদ দেওয়া হচ্ছে। এতে স্বল্প আয়ের ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। এই বরাদ্দ জনস্বার্থবিরোধী।

আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দীন জানান, স্থানীয় মানুষ দোকানঘর পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, এটা সত্য। শর্ত ভেঙে ছাদযুক্ত দোকানঘর নির্মাণ করে বাণিজ্য করা হচ্ছে, এটাও অন্যায়।

চুকনগর বাজার কমিটির সভাপতি প্রহ্লাদ ব্রম্ম দেশ রূপান্তরকে জানান, স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী মানুষ মার্কেট নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত নন। জেলা পরিষদই মার্কেট নির্মাণ করে দোকান বরাদ্দ দিচ্ছে।

খুলনা জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান চৌধুরী মোহাম্মদ রায়হান ফরিদ বলেন, ‘সব অফিস জানে। তবে ইজারা পেতে পরিষদের সদস্যরা আবেদন করেছেন। তবে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।’

পরিষদের সংরক্ষিত সংসদ সদস্য ফারহানা নাজনীন বলেন, এ সম্পর্কে তিনি জানেন না। জেনে বলতে পারবেন।

খুলনা স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক মো. তবিবুর রহমান বলেন, ‘জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আছেন। তারা এসব বিষয়ের দেখাশোনা করবেন ও ব্যবস্থা নেবেন। সরকারের পক্ষ থেকে যদি আমাকে তদন্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়, তখন আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

খুলনা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজা রশীদ বলেন, ৮৮ জনের মধ্যে জমি ইজারা দেওয়া হয়েছে। অন্য বিষয়গুলো তার নজরে আসেনি। বিদেশ থেকে ফেরার পর এখনো চেয়ারম্যান অফিস করেননি। তিনি অফিসে এলে আলোচনা সাপেক্ষে তদন্ত কমিটি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত