জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মুক্তির খবরে আমি অত্যন্ত খুশি। ইন্টারনেট-স্বাধীনতার একজন গ্লোবাল আইকন হিসেবে অ্যাসাঞ্জ যে দীর্ঘ কারাবাস এবং অকল্পনীয় প্রতিকূলতার মাঝে যেভাবে লড়াই করে গেছেন, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তাকে সেলাম জানাই। আমরা এখন যে ইন্টারনেট যুগে বাস করছি, সেখানে সারাক্ষণ নিজে সেল্ফ সেন্সরশিপে থাকা, অপরকে নজরদারিতে রাখা, ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে নিজে বিপদে পড়া, এবং অন্যকে জেল-জরিমানা, হেনস্তা করা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশে পরিণত হয়েছে। তবে, সব সমাজের জন্যই বিষয়টি এমন নয়। অর্থাৎ সুইডেনের ইন্টারনেট অভিজ্ঞতা আর শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা এক হবে না। অনেক মিল থাকতে পারে কিন্তু একই হবে না।
ইন্টারনেট বিষয়ক আইন, অর্থনীতি, স্থানিক ইতিহাস, স্থানিক রাজনীতি, স্থানিক পলিসি এবং প্রয়োগের এক জটিল সংমিশ্রণে বিভিন্ন সমাজে এবং সংস্কৃতিতে ইন্টারনেট-স্বাধীনতা তার স্থানীয় নিজস্ব চেহারা পেয়েছে। ইন্টারনেটকে যতই গ্লোবাল মনে করা হোক না কেন, এই নিজস্বতাকে স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ। আবার গ্লোবালকেও যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করাটাও জরুরি; কারণ ইন্টারনেট নিজেই গ্লোবালি লোকাল। একটি প্রপঞ্চের ভিত্তিমূলক চালকগুলো সম্পর্কে অবহিত না থাকাটা বিপজ্জনক। ইন্টারনেট-স্বাধীনতা বিষয়ক বিভিন্ন সমাজের অভিজ্ঞতা কেন ভিন্ন সে সবের উত্তর জটিল হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, তা আমি মনে করি না।
‘গ্লোবাল সাউথ’ শব্দটি সাধারণত ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা এবং ওশেনিয়ার অঞ্চলগুলোকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যা সাধারণত নিম্নতর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রাম দ্বারা চিহ্নিত। নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, ঔপনিবেশিকতার প্রভাব গ্লোবাল সাউথে গভীর। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো শুধুমাত্র সম্পদ শোষণ করেনি, তারা সাংস্কৃতিক আধিপত্যও আরোপ করেছে, যা দেশীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের ক্ষয়/পরিবর্তন/বদল ঘটিয়েছে। ফলে ইন্টারনেটকে নব-ঔপনিবেশিক অনুশীলনের হাতিয়ার না ভাবার তো কারণ নেই। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, গ্লোবাল সাউথ সাংস্কৃতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং অভিযোজনের চেষ্টা করে যায়। স্থানীয় সোশ্যাল মিডিয়া, যেমন বাংলাদেশের ব্লগোস্ফিয়ার (২০০৫ থেকে) এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গ্লোবাল সাউথ রাজনৈতিক গতিশীলতা এবং সামাজিক আন্দোলনের জন্য একটি হটস্পটও। স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে শুরু করে মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের জন্য সমসাময়িক আন্দোলন পর্যন্ত, এই অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধ এবং সক্রিয়তা বিদ্যমান। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন এমনি একটি তৎপরতা। বিশ্বায়ন, অভিবাসন এবং আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্কগুলো এমন একটি জটিল সম্পর্কের জাল তৈরি করে যা স্থানীয় বাস্তবতাকে প্রভাবিত করে। গ্লোবাল সাউথ একটি একক সত্তা নয় বরং বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং অভিজ্ঞতার একটি মিশ্রণ যা বৈশ্বিক চিত্রে অবদান রাখে।
ফলে আমরা যেই হাইব্রিড সমাজে বাস করছি যেখানে প্রযুক্তি এবং সামাজিক জীবন একে অপরের সঙ্গে যেমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত আবার সেটি গ্লোবাল সাউথের অন্তুর্ভুক্তও বটে। ফলে অপরাপর রাষ্ট্রের তুলনায় নিজ রাষ্ট্রের নিজের ক্ষমতা, নাগরিক অধিকার এবং নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ এসব মিলেই বিশেষ অঞ্চলে ইন্টারনেট-স্বাধীনতার চেহারা প্রকাশ পায়। যেমন ইন্টারনেটে ভয়ের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো পরবর্তী ভয়ের জন্য অপেক্ষায় থাকা। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশল। এর প্রভাব অনলাইন আড্ডা থেকে অফলাইন আড্ডাতেও তীব্রভাবে প্রভাব রেখেছে। সেল্ফ সেন্সরশিপে আমরা এতটাই দক্ষ হয়ে গিয়েছি যে আমাদের ভাষা থেকে জরুরি শব্দগুলো প্রথমে নিশ্চুপ এবং পরে নেই হওয়া শুরু করেছে। অনলাইন অপিনিয়ন লিডার যারা আছেন, তাদের অধিকাংশের ভাষা এবং তাই চিন্তাও এত সংকীর্ণ যে বিশেষ রাজনৈতিকতার বাইরে এদের বক্তব্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, এই অঞ্চলে ইন্টারনেট-স্বাধীনতার বিষয়টির এক রকমের এনজিওকরণ হয়েছে। সেটিও যেন শিখতেই হয়েছে অন্যের কাছ থেকে। আমি সাধারণভাবে ইঙ্গিত করছি পশ্চিমের কাছ থেকে। যদিও বিগত এক দশকে গড়-পশ্চিমা লিবারেল আইডিওলজির বড় বড় ফাঁকগুলো আরও উন্মোচিত হয়েছে। আমাদের স্থানীয় প্রবক্তাদের কণ্ঠেও হতাশার সুর বেশ স্পষ্ট। যেন সবই, মানে ভালোমন্দ এবং হতাশাও আমাদের ঐ গড়-পশ্চিমা থেকেই শিখতে হবে। আবার ইন্টারনেট-স্বাধীনতার বিষয়টির দলীয়করণও হয়েছে। এটি আমরা নিজেরাই আবিষ্কার করেছি।
যদিও ইন্টারনেট-স্বাধীনতার বহু স্থানীয় তৎপরতার ইতিহাস এখানে রয়েছে। এই অঞ্চল থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। কেবল পুরুষ নন, নারীও রয়েছেন। ইন্টারনেট-স্বাধীনতার স্থানিকতার প্রতি আমাদের যে ঔপনিবেশিকতা, সেসবকে আমার পোস্ট-কলোনিয়াল হ্যাংওভার বলেই মনে হয়। আমরা ঘটিয়েছি এখানে অনেক কিছুই। আমরা চূড়ান্ত প্রতিকূলতার সম্মুখীনও হয়েছি। যদিও আমরা চুপ মেরে গেছি। এই চুপ মেরে যাওয়াটি শাঁখের করাত। এর একটি অংশ স্থানীয় রাজনৈতিকতা আর অপরটি ক্রমশ মনে করতে থাকা যে আমাদেরটি ততটা কিছু হয়নি। আমি মনে করি গ্লোবাল ইন্টারনেট-স্বাধীনতা বিষয়ক যত তৎপরতা হয়েছে, সে সবের তুলনায় এখানে প্রতিকূলতা কম নয়। যদিও সেইসব প্রতিকূলতা কি আদৌ প্রতিকূলতা কি না, সে সবের জন্যও যেন আমরা বসে আছি ‘বাইরের’ কারোর সার্টিফিকেটের জন্য। অনুমান করি পরিস্থিতি অনুযায়ী সেসবও কাজে দেয় অনেক।
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মুক্তির পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তার রাষ্ট্র। এই দুনিয়ায় ইন্টারনেট-স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার জন্য যে শক্তিশালী রাষ্ট্রের দরকার হয়, তা যেন আবারও মনে করিয়ে দিল ঘটনাটি। আমি নিশ্চিত অস্ট্রেলিয়া, এবং বর্তমান প্রধান ব্যক্তিটি যদি জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মুক্তির বিষয়ে তৎপর না হতেন, তাহলে বিষয়টির কোনো রকম সুরাহা হতো না। ফলে অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের এই ভূমিকার প্রশংসা করতেই হয়। এসবের মধ্যে আমি আবারও যেন দেখতে পাই গড়-পশ্চিমা লিবারেল, আইন ও অধিকার ব্যবস্থাপনার ‘জয়’-এর গল্প। হয়তো অচিরেই এই ‘জয়’-কে কেন্দ্র করে স্থানীয় কোনো অধিকার সংস্থা তৎপর হবেন। এতে আমি দোষেরও কিছু দেখি না। এরকম অধিকার সংস্থার অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে ইন্টারনেট ফ্রিডম বিষয়ে। এবং মনে রাখা দরকার যে এনারা বিগত এক দশকে ম্রিয়মাণই হয়েছেন।
ফলে কৌতূহল হয় খুব, এই ভেবে যে কবে আমরা বুঝব যে ইন্টারনেট ফ্রিডম থেকে ডিজিটাল কমার্স কোনোকিছুই কপি-পেস্টের বিষয় না। কখন থেকে আমরা ‘আমাদের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ’, বা ‘আমাদের ধ্রুব রাঠি’ বলাটা বন্ধ করব। এই কলোনিয়াল মাইন্ডসেটের পরিবর্তন করাটা খুব দরকার। তা না হলে বারবার বলতে হবে, ‘স্বাধীনতা থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’
লেখক : নৃবিজ্ঞানী, শিক্ষক, সোশ্যাল মিডিয়া তাত্ত্বিক
