দেশের বাইরে শ্রমিক পাঠানো নিয়ে আমাদের যত আলোচনা, শ্রমিকদের শূন্যহাতে ফিরে আসা নিয়ে ততটা আলোচনা নেই। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাঠানোর কাজটি করে মূলত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। নির্দিষ্ট চাকরি, বেতনের অঙ্ক ইত্যাদি উল্লেখ করে চুক্তির মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো হলেও প্রায় সময়ই কাগজ আর বাস্তবতার মধ্যে মিল থাকে না। মূল সমস্যাটা হচ্ছে ফ্রি ভিসার কারণে। রিক্রুটিং এজেন্সি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটি বলছে, প্রতি বছর যত জনশক্তি রপ্তানি হচ্ছে তার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই যায় ফ্রি ভিসায়। এই যাওয়ার ক্ষেত্রে আবার অর্থের বিনিময়ে তাদের কাগজপত্র করে দিচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। যদিও এজেন্সিগুলো এর পুরো দায় নিতে নারাজ।
সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, দুবাই, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে ‘ফ্রি ভিসা’ বেশি খোঁজে বিদেশগামী বাংলাদেশি শ্রমিকরা। একশ্রেণির জনশক্তি ব্যবসায়ী ফ্রি ভিসার নামে বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠাচ্ছে। তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে কাজ ছাড়া কর্মীরা বিভিন্ন দেশে দালাল চক্রের হাতে বিক্রি হচ্ছে। এই অভিযোগে কয়েকটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে অজস্র অভিযোগ জমা পড়েছিল। কিন্তু তার পরিণতি আমরা জানি না। কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে রহস্যজনক নীরবতার কারণে প্রতারণার শিকার হচ্ছে নিরীহ মানুষ। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে ‘ফ্রি ভিসায় মিছে আশা’ প্রতিবেদন। কাগজে-কলমে যে ভিসার অস্তিত্ব নেই। তবুও প্রচুর মানুষ এই ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় পাড়ি জমাচ্ছেন। এ ভিসায় যাওয়া প্রবাসীদের অধিকাংশই প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরছেন। অনেকে কাজ না পেয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
মূলত দালাল চক্রের সিন্ডিকেটের ভাষা ফ্রি ভিসা। তারা সাধারণ মানুষের কাছে লোভনীয় কথা বলে বিদেশ গমনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করে। এই দালাল চক্র দুই দেশেই সক্রিয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) সৌদি আরব থেকে মাত্র ১৯৬ কোটি ৬৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৭৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৫৪ কোটি ১৯ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৭২ কোটি ১৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে দেশটি থেকে। প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে কমেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার একক কোনো কারণ নেই। কারণ অনেক শ্রমিক বিদেশে গিয়ে যে প্রজেক্টে তার কাজ, সেখানে কাজ করছেন না। বেশি বেতন পেলে তিনি অন্য কোনো প্রজেক্টে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু এটা আইনগতভাবে বৈধ না। কিন্তু তারা এই ঝুঁকিটা নিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ‘যারা ফ্রি ভিসায় যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করেন। এখানে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি শুধু সরকারি আনুষ্ঠানিকতাটা করে দেয়। সুতরাং এখানে পুরো দায়টা শুধু এজেন্সিগুলোকে দিলে হবে না।’ তাহলে পুরো দায়টা কোন পক্ষের?
শ্রমিকদের অভিযোগ, এসব দেখভালের জন্য বিএমইটি কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে অভিযোগ পড়েছে দুই হাজারের বেশি। তবে এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে অর্ধেকেরও কম। আর জরিমানা আদায় হয়েছে ৭ কোটি টাকারও বেশি। জরিমানার টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভুক্তভোগী কর্মীদের ফেরত দেওয়া হয়েছে? প্রশ্ন হচ্ছে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর এসব অনিয়ম আগে থেকেই কেন ধরা পড়ছে না? এটি যে শুধু বাংলাদেশের শ্রম খাতেই সমস্যা তৈরি করছে তা নয়, বরং একই সঙ্গে দেশে বেকারত্বের চাপ বাড়িয়ে সমাজ এবং পরিবারেও তৈরি করছে নতুন সংকট। সবার উচিত ভিসা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক হওয়া এবং ফ্রি ভিসা নামের কোনো ভিসা না নেওয়া। দালালের কাছ থেকে ভিসা না নিয়ে সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি থেকে ভিসা নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। না হলে শ্রমিকের কান্না কখনো থামবে না। এ বিষয়ে সরকারের সুচিন্তিত, জনস্বার্থ পরিকল্পনা থাকা জরুরি। দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক কোনো সরকার এ ব্যাপারে নীরব থাকতে পারে না। অপরাধের দায় আসলে কোন পক্ষের?
