গাজীপুরের কাপাসিয়ায় গবাদি পশুর চামড়া পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করা হচ্ছে একটি অস্থায়ী কারখানায়। এখানে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে পশুর চামড়াসহ নানা ধরনের পরিত্যক্ত ভাঙাড়ি মালামাল। পশুর চামড়া পোড়ানো ও ভাঙাড়ি মালামালের কালো ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ফলে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন আশপাশের মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষরা শ্বাসকষ্টসহ নানা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন। উপজেলার সিংহশ্রী ইউনিয়নের বড়িবাড়ি এলাকার আইনজীবী মোজ্জাম্মেল হক মিন্টুর বাড়ির পাশের একটি বনে গড়ে তোলা হয়েছে এ কারখানা।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কি. মি. দূরে কপালেশ^র থেকে সিংহশ্রীগামী রাস্তার প্রায় তিনশ গজ উত্তরে বড়িবাড়ি গ্রামের একটি গজারি বনে গবাদি পশুর চামড়া পোড়ানোর একটি অস্থায়ী কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। গজারি বনের ভেতরে প্রায় আড়াই বিঘা ফাঁকা মাঠের এক পাশে মাটি খনন করে বড় আকৃতির দুটি চুল্লি তৈরি করা হয়েছে। তার ওপরে দুটি বিশাল আকৃতির কড়াই বসানো। চুল্লি দুটির এক পাশে রয়েছে উৎপাদিত বিশাল কয়লার স্তূপ আর বাকি তিন পাশে রয়েছে অসংখ্য বস্তাভর্তি নানা ভাঙাড়ি মালামাল। সামনের খালি মাঠে সারিসারি বিছানায় সূর্যের তাপে শুকানো হচ্ছে উৎপাদিত কয়লা। মাঠের এক কোণায় শুকনো কয়লা ভরে রাখা হয়েছে অসংখ্য বস্তা, যেগুলো পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েল তৈরির কারখানায়।
ওই কারখানায় কর্মরত এক নবাগত শ্রমিক ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার লেঙ্গুটিয়া গ্রামের আব্দুর রফিকের ছেলে মো. শামীম (২৫)। তিনি জানান, এর আগে তিনি রাজধানী ঢাকার হেমায়েতপুরের একটি টেনারীতে কাজ করতেন। তার এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে তিনি এখানে কাজে যোগ দিয়েছেন। সন্ধ্যার পর থেকে এখানে প্রতি রাতে পোড়ানো হয় বিপুল পরিমাণ চামড়া। দেশের বিভিন্ন টেনারী থেকে আনা গবাদি পশুর চামড়া চুল্লির ওপরে বসানো কড়াইয়ে অ্যাসিড জাতীয় কেমিক্যাল মিশিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। পরে চুল্লিতে আগুন ধরিয়ে দীর্ঘক্ষণ জ¦াল দিলে এক সময় সেগুলো পুড়ে কয়লায় পরিণত হয়। পরে পোড়া চামড়া আবার লোহার একটি মেশিনে ভাঙানো হয়। এরপর এগুলো রোদে শুকানো হয়।
ওই কারখানার প্রবেশ পথে একটি বাড়ির বাসিন্দা ও স্থানীয় আফতাবউদ্দিন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনির হোসেন জানান, প্রায় তিন মাস আগে হঠাৎ করেই ওই বনে এ কারখানাটি তৈরি করেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। তারা তীব্র প্রতিবাদ করেও এটি বন্ধ করতে পারছেন না। এখানে বিভিন্ন ধরনের ভাঙাড়ি মালামাল দিয়ে চুল্লিতে জ্বাল দেওয়ার সময় উৎপন্ন বিষাক্ত কালো ধোঁয়া আশপশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন অ্যাসিড জাতীয় কেমিক্যাল মিশানো চামড়া পোড়া দুর্গন্ধও মারাত্মক আকার ধারণ করে। তীব্র গরমের মধ্যে রাতের বেলা ঘরের জানালা খুলে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে তাদের এখন দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এ কারখানা চালু হওয়ার পর এলাকার শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বেড়ে গেছে। এরই মাঝে তাদের এলাকায় ২০-২৫টি ছাগল ও গরু মারা যাওয়ার খবর শুনেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
স্থানীয় রুহুল আমীনের ছেলে আশরাফুল ইসলাম (২২) জানান, রাতে যখন চামড়া পোড়ানো হয় তখন ভয়াবহ দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না, বমি আসে। পোড়ানো চামড়ার কয়লা যখন দিনের বেলায় রোদে থাকে তখন দুর্গন্ধটা বাতাসে ছড়ায় এবং খুবই খারাপ লাগে। এই দূষিত পরিবেশে জনসাধারণের তীব্র কষ্ট হলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ করতে পারছেন না।
এ বিষয়ে জমির মালিক আইনজীবী মোজাম্মেল হক মিন্টু জানান, তার জমিতেই ওই কারখানাটি চলমান। এলাকার লোকজনের এসব সমস্যার কথা তাকে এখনো কেউ জানায়নি। তাকে জানালে তিনি পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম লুৎফর রহমান জানান, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তিনি আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
