একযুগ আগে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের তদন্ত এখনো চলতে থাকা নিয়ে উচ্চ আদালত বলেছেন, বিচারের শুরুর আগেই তদন্তে বিলম্ব দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে অব্যাহতভাবে উপহাস। তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতা বিচার ব্যবস্থাকে অপ্রস্তুত ও ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও মন্তব্য করেছে হাইকোর্ট।
মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কাউকে কারাগারের কনডেম সেলে রাখা যাবে না— হাইকোর্টের এমন রায়ের পর্যবেক্ষণে এই মন্তব্য করে আদালত। বিভিন্ন কারাগারের কনডেম সেলে থাকা তিন ব্যক্তির পক্ষে করা রিট আবেদনের ওপর দেওয়া রুলের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গত ১৩ মে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. বজলুর রহমানের দ্বৈত বেঞ্চের দেওয়া ৬৫ পৃষ্ঠার রায়ের অনুলিপি আজ মঙ্গলবার (২ জুলাই) প্রকাশিত হয়েছে।
হাইকোর্টে রায়ে বলা হয়, ‘কনডেম সেলে কোনো আসামিকে রাখা দুই বার সাজার সামিল।’ আদালত কারা কর্তৃপক্ষকে দুই বছরের সময় দিয়ে বলে, এই সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আসামিদের ফাঁসির সেল থেকে সাধারণ সেলে রাখতে হবে।
রায়ে আরও বলা হয়, ‘কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড আপিল বিভাগ এবং রিভিউয়ের (রায় পুনর্বিবেচনা) পরও বহাল থাকলে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমার আবেদন নাকচ হয়ে গেলেই কেবল মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত বলে ধরে নিতে হবে এবং তখন থেকে দন্ডিত ব্যক্তিকে ওই বিশেষ সেলে রাখা যাবে।’
এ রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করলে ১৪ মে চেম্বার আদালত হাইকোর্টের রায়ের ওপর ২৫ আগষ্ট পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিলের নির্দেশ দেয়।
মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে ২০১২ সালের ১১ রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ফ্ল্যাটে খুনের শিকার হন। পুলিশের পর এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব। গত রবিবার পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ১০৯ বারের মতো সময় নিয়েছে সংস্থাটি।
কনডেম সেল সংক্রান্ত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে ফৌজদারি মামলায় তদন্ত ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। আদালত বলে, ‘দেশে হত্যা মামলার বিচার হতে কখনো কখনো ২০ বছরের বেশি সময় লাগে। আর হত্যাকাণ্ডকে যদি কোনো রাজনৈতিক আবরণ দেওয়া হয় তাহলে সময় আরও বেশি লাগতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ২১ বছরের বেশি সময়েও এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) দাখিল করা যায়নি।’
হাইকোর্ট বলেন, ‘সাংবাদিক সাগর-রুনির হত্যা মামলার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। মামলার বিচার এখনো আলো দেখতে পারেনি। দুর্ভাগ্যবশত, এই মামলাটি অব্যাহতভাবে দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে উপহাস করে চলেছে। আমাদের অপ্রস্তুত ও ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মামলার বিচারের মাধ্যমে কিছুটা প্রতিকার হয়েছিল।’
