এ দেশের সাধারণ মানুষকে খুশি করা (মন জয় করা) খুব সহজ। অল্পতেই তারা সন্তুষ্ট হন। বিনিময়ে উজাড় করে প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করেন। অকৃত্রিম ভালোবাসার মধ্যে দেওয়া-নেওয়া, চাওয়া-পাওয়ার কোনো হিসাব নেই। এমন উদাহরণ অহরহই চোখে পড়ে।
ঈদযাত্রায় ট্রেনের টিকিট পেলে নাগরিকরা আত্মহারা হয়ে যান। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি বা টিভিতে প্রচারিত মুখের হাসিই বলে দেয় কালোবাজারিতে টিকিট করতে হয়নি। তাদের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায়, এক জীবনে এই টিকিট পাওয়াও কত বড় অর্জন। পাহাড় ঠেলে ঈদযাত্রায় বাড়ি যেতে এবং ফিরতে হয়। সীমাহীন কষ্টের পরও মুখে হাসি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টিকা দিতে পারলে ভি চিহ্ন প্রদর্শন করেন। সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে পারলে আবেগ ধরে রাখতে পারেন না অভিভাবকরা। লটারিতে ভর্তি ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আর্তচিৎকার করে ওঠেন কেউবা কেঁদে ফেলেন। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের অভিব্যক্তি ছাত্রছাত্রীরা ফুটবল খেলোয়াড়দের মতো করে বিজয় উদযাপন করে। বিসিএস পরীক্ষায় চান্স পাওয়া চাঁদে বা স্বর্গে যাওয়ার মতো। কেউ বিদেশে পড়ার সুযোগ পেলে বা অভিবাসী হলে তারা এখন আমাদের অনেকের কাছে এলিয়েনে পরিণত হয়েছেন।
মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসকের কাছে ভালো ব্যবহার ও সেবা পাব, এটাই স্বাভাবিক। অথচ চিকিৎসকের কাছ থেকে মানসম্মত চিকিৎসা ও ভালো ব্যবহার পেলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না আবেগী সেবা গ্রহণকারীরা। সেই চিকিৎসকের মঙ্গল কামনায় কেউ কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। বন্যার সময় সাহায্য-সহযোগিতা পেলেও ভাবেন বিধাতার আশীর্বাদ। ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারলে এটাকেও জীবনের একটা ছোটখাটো বিজয় মনে করেন চলমান পরিস্থিতিতে। সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেও মানুষ এখন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে কার মুখ দেখেছি। বাসে-ট্রেনে বসার সিট পেলে অবচেতন মনে ভাবেন নিশ্চয়ই পূর্বপুরুষরা কোন পুণ্যের কাজ করেছিলেন। লোডশেডিং কম হলে সৃষ্টিকর্তা আজ তাদের প্রতি সদয় হয়েছেন এমনটাই মনে করতে চান। কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ভালো ব্যবহার বা সার্ভিস পেলে অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করেন এটা অষ্টম আশ্চার্য কি-না?। আমরা কোন দেশে আছি।
রাজনৈতিক দল লিফলেট বিতরণ, মানববন্ধন, পথসভা, সভা-সমাবেশ করতে পারলে সেটাকে বিরাট এক রাজনৈতিক সাফল্য বা বিজয় হিসেবে মিডিয়াতে প্রচার করে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেলেও বড় রকম অর্জন বলা যায়। নিবন্ধন পেতেও সর্বোচ্চ আদালতে যেতে হয়। মামলায় জামিন পাওয়াও এখন সৌভাগ্যের তালিকায় অনেক ওপরের দিকে চলে গেছে। স্বজনের মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তি যেন স্বয়ং বিধাতার হাত দিয়ে ঘটে। আর সেটা না ঘটলে ডান্ডাবেড়ি পরেই জানাজা পরতে হয়। ডান্ডাবেড়ি পরে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়।
ক্রিকেট খেলায় বিজয়ী হলে দল মত নির্বিশেষে সবার মুখে হাসি ফোটে। দর্শকরা আনন্দে মেতে ওঠে। ক্রিকেটে এক বা একাধিক খেলায় বিজয়ী হওয়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। পৃথিবীর অনেক দেশই ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হচ্ছে। সেসব দেশের নাগরিকরা আমাদের দেশের মতো এত উল্লাস করে না। খেলাধুলায় ছোটখাটো সাফল্যও আমরা উদযাপন করি। অন্য কোনো দেশের ফুটবল খেলার সাফল্যও আমাদের উদ্বেলিত করে। খুব কম দেশ আছে, যে দেশের নাগরিকদের সামান্যতে তুষ্ট করা যায়।
আমরা সরকারকে কর প্রদান করছি নাগরিক সেবাগুলো সঠিকভাবে পাবো বলে। ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচিত করি জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশা অভাব-অভিযোগ দূর করতে। জীবনের গতিকে স্বাভাবিক করতে। অভিযোগগুলো আমলে নিতে। এ সমস্যাগুলোর সমাধান সরকারই করতে পারে। এ জন্যই নাগরিকরা ভোট দিয়ে নাগরিকসেবা পেতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে। আন্তর্জাতিক জরিপেও আমাদের দেশের অল্পতে সন্তুষ্ট হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে অতীতে। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট-২০২৪ অনুযায়ী সুখী দেশের তালিকায় ১১ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের ১৪৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১২৯। ২০২৩ সালে আমাদের অবস্থান ছিল ১১৮ (জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি রিপোর্ট থেকে এ তথ্য জানা গেছে)। সুখী দেশের তালিকায় আমাদের দেশের অবস্থান ভালো না। যেসব বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের সুখী মানুষের তালিকা করা হয়েছে, সেটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
দিনের পর দিন ন্যায্য সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষ অধিকারের কথাই ভুলতে বসেছে। অপ্রাপ্তিকে মেনে নেয়। নিয়তিকে দোষারোপ করে সুযোগ পেলেই। অনেকে নাগরিক মৌলিক অধিকারের কথা আলোচনাও করতে চায় না। সর্বজনীন মানবাধিকার আইনের শাসন বা ভোটাধিকার নিয়েও মাথাব্যথা নেই। ভোটার আইডি কার্ড পেলেই হলো। ভোট দিতে পারল কী পারল না তাতে কিছু যায়-আসে না। ট্রেন-বাসের টিকিট পাওয়াটাই তার কাছে নগদ প্রাপ্তি। সামান্যতেই অসামান্য আনন্দ তাদের তা জেনেও রাজনৈতিক দল ও বেসরকারি সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো সে পথে হাঁটে না। সরকারও সেবার মান বাড়াতে সচেষ্ট হয় না। মানসম্পন্ন পণ্য ও সেবা পেতে আমরা লাইনে দাঁড়াতেও প্রস্তুত। কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করেও আমরা সেবা বঞ্চিত। মৌলিক ও নাগরিক অধিকার কারও দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়।
মানুষের জীবন দুই চাকার সাইকেলের মতো। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির সমন্বয়ে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির আক্ষেপই বেশি। সামরিক-বেসামরিক আধা সামরিক সরকার ক্ষমতায় এলো-গেল, কিন্তু কোনো সরকারই জনসাধারণের চাওয়া বুঝল না বা গুরুত্ব দিল না। ভবিষ্যতে কোন সরকার করবে এমন আশাও কেউ জাগাতে পারেনি। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছর কেটে গেল। কেউ কথা রাখল না।
বর্তমান অবস্থায় স্বাভাবিক পাওয়াকেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এ বাস্তবতায় ছোট ছোট প্রাপ্তির ওপর দাঁড়িয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখছি। অথচ এই ছোট ছোট চাওয়াগুলোও সঠিকভাবে পূরণ হচ্ছে না। অর্থ খরচ করেও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছি না। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পরও রেমিট্যান্স যোদ্ধারাও দূতাবাস থেকে কাক্সিক্ষত সেবা পায় না। বিমানবন্দরে বিড়ম্বনা রুটিনওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। সরকারের বিশেষ নজর নেই তাদের প্রতি। এতে দেশের মেধা যেমন পাচার হচ্ছে তেমনি মানুষের মধ্যে অভিবাসী হওয়ার স্বপ্নও তীব্র হচ্ছে। এ বাস্তবতায় নতুন প্রজন্ম বিদেশমুখী হচ্ছে। পাচার হচ্ছে দেশের অর্থ সম্পদ ও মেধা। ঘাটতি দেখা দিচ্ছে দেশপ্রেমের। রাজনীতিবিমুখ হচ্ছে দেশের সাধারণ নাগরিকরা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
