ফ্রান্সের রাজনীতিতে ডানপন্থি ধাক্কা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৪, ১২:২৮ এএম

ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থার উত্থান বেশ পুরনো ঘটনা। ‘স্বাধীনতা, সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের’ আদর্শ যে রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র সেই ফ্রান্সও এর বাইরে নয়। তারপরও এক সময়ের প্রান্তিক দল ন্যাশনাল র‌্যালির (আগের নাম ন্যাশনাল ফ্রন্ট) নেতৃত্বে ডানদের পার্লামেন্টের বৃহত্তম জোট হয়ে ওঠার আশঙ্কা বড় রকমের ধাক্কা হিসেবেই এসেছে।

১৯৭২ সালে কট্টর জাতীয়তাবাদী জঁ মারি লো পেনের প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ফ্রন্ট প্রথম এক দশক হালে মোটেই পানি পায়নি। কয়েক দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে অনেক পেছনে থেকে দ্বিতীয় হয়েছে তারা। ২০১২ সালে জঁ মারি লো পেনের মেয়ে মেরিন লো পেন নেতৃত্বে আসেন। ততদিনে ফরাসি ডানপন্থার মুখ হয়ে উঠেছে ন্যাশনাল ফ্রন্ট। যদিও মধ্যপন্থি ও বামপন্থিদের কাছে তখনো অনেকটা হাসির পাত্র দলটি। ২০১৮ সালে নাম বদলে নিজেদের ন্যাশনাল র‌্যালি হিসেবে ঘোষণা দেয়। কাকতালীয়ভাবেই তাদের ভাগ্য তখন থেকে দ্রুত ফিরতে থাকে।

বিশ্ব তথা ইউরোপ জুড়ে গত এক দশকের ঘটনাপ্রবাহ ন্যাশনাল ফ্রন্টকে সামনে এগোতে সাহায্য করেছে। ইসলামি কট্টরপন্থার উত্থান, ফ্রান্সে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বৈধ-অবৈধ অভিবাসীর চাপ আর সর্বোপরি করোনা মহামারী ও ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত বাকি ইউরোপের মতো ফরাসি জনমতের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। পুরো পরিস্থিতিটা চরম অভিবাসনবিরোধী, যা মেরিন লো পেনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ করে তোলে। দীর্ঘদিনে প্রান্তিক অবস্থানে থেকে এখন তার দল ক্ষমতার দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। গত রবিবার অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে সুস্পষ্ট জয় পেয়েছে মেরিন লো পেনের উগ্র ডানপন্থি ন্যাশনাল র‌্যালি। ফরাসি রাজনীতির চিত্র পুরো পাল্টে দেওয়া লক্ষ্য তাদের। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে তারা হয়তো আরেকটা ধাপ এগিয়ে গেল।

দ্বিতীয় দফার ভোটে আরএন-বিরোধী ভোটকে একত্র করার জন্য মধ্যপন্থি এবং বামপন্থি প্রার্থীদের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোসহ নানা তৎপরতা চলবে এখন। যত কিছুই করা হোক প্রথম রাউন্ডের ভোট শেষে এ কথা অস্বীকার করার আর কোনো উপায় নেই যে, আরএন এই মুহূর্তে অবিসংবাদিতভাবে ফ্রান্সের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি। তবে আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটে কী হয় তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে একটি উগ্র ডানপন্থি সরকার কার্যত যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে। অন্যদিকে আসন সংখ্যার জোর তেমন বেশি না হলে কিছু করতে পদে পদে বাধা পাবে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছিল আরএন জোট ২৬০ থেকে ৩১০ এর মধ্যে আসন পাবে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ২৮৯টি আসন। তাই স্পষ্টতই শেষ কথা বলার সময় হয়নি।

ঘর সামলাতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর মধ্যপন্থি এবং বামপন্থি নিউ পপুলার ফ্রন্ট জোট তাদের সমর্থকদের ৭ জুলাই দ্বিতীয় রাউন্ডে কৌশলগতভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাবে। এমনকি তাদের নিজস্ব প্রার্থী ছিটকে গেলেও ভোটারদের বলা হবে আরএন-এর বিরুদ্ধে থাকা প্রার্থীকে ভোট দিতে। এ ধরনের দলীয় পরামর্শে ভোটাররা আর তেমন একটা কান দেন না সেটাই হচ্ছে সমস্যা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, আরএনকে ভোট দেওয়া ফ্রান্সে এক সময় লজ্জার ব্যাপার বলেই মনে করা হতো। গত কয়েক দশক ধরে ক্রমে সেই লজ্জার বোধটি কমছিল। এখন যে এটি পুরোপুরিই গায়েব হয়ে গেছে তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই। নির্দ্বিধায় আরএনকে ভোট দেওয়ার কথা জাহির করেছে অনেক মানুষ।

আরএন-বিরোধীদের জন্য আরেকটি অসুবিধা হচ্ছে দ্বিতীয় রাউন্ডে কথিত ‘ত্রিভুজ ভোটের’ উচ্চ হার। কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে এবার। কমবেশি সব দলের সমর্থকরাই এবারের ভোটকে বাঁচামরার লড়াই মনে করাতে এত ভোট পড়েছে। তবে কম সময়ের মধ্যে ঝটিকা গতিতে প্রচারণা চালাতে হওয়ায় ছোট দলগুলোর পক্ষে বেশি কিছু করা সম্ভব হয়নি। তাই ভোট কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে তিন মূল শিবিরেই। একটি আসনে তিন শিবিরের তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে আরএন-বিরোধী ভোট একত্র হওয়া কঠিন হবে। অনেক জায়গায় মধ্যপন্থি বা বামপন্থি প্রার্থীরা হয়তো সরে যাবেন। কিন্তু সব জায়গায় এটা হবে না। শঙ্কাটা সেখানেই।

সব মিলিয়ে ফ্রান্সের মানুষ যেন এক রকম ধরেই নিয়েছে, দেশের ক্ষমতার রাশ উগ্র ডানপন্থিদের হাতেই উঠতে যাচ্ছে। এক সময় যে আশঙ্কাটি বাস্তব হওয়ার কথা ভাবাও যেত না এখন তা চরম বাস্তবে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। ফ্রান্সের এবারের নির্বাচনের ওপর শুধু একটি সরকার বা কোনো একজন নেতার ভাগ্য নয়, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনী পরাজয়ের অর্থ সমর্থক বা সংশ্লিষ্ট নেতার হতাশা ও রাজনীতিতে পিছিয়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়। কিন্তু ফ্রান্সে রীতিমতো সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভোটের দিন প্যারিসসহ অনেক শহরের বিপণিগুলোর রাস্তার পাশের বড় ‘উইন্ডো’ মোটা বোর্ড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় লুটপাট ঠেকাতে। অতীতের সহিংস ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এ কাজ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জুন মাসের শুরুতে হঠাৎ করেই আগাম নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে সবাইকে হতবাক করে দেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থিদের হাতে হেরে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় দেশে আগাম ভোট ডাকেন তিনি। মাখোঁর হিসাবটা সম্ভবত ছিল অল্প সময়ে ঝটিকা প্রচারণা উগ্রপন্থিদের প্রতি ভোটারদের ঘোর কাটিয়ে পার্লামেন্টে মধ্যপন্থিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু তার হিসাব-নিকাশ স্পষ্টতই ভুল প্রমাণ হয়েছে। নির্বাচন ডাকার পর অচিরেই দেখা যায়, কট্টর ডানপন্থি আরএন তখনো জনমত জরিপে অনেক এগিয়ে। দেখা যায়, নতুন গঠিত বামপন্থি জোটও মাখোঁর দল থেকে এগিয়ে, দ্বিতীয় স্থানে। সেই জোটের মূল শক্তি হচ্ছে কট্টর-বামপন্থি ফ্রান্স আনবাউড (এলএফআই)। সম্ভাব্য ফলাফল হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি আরএন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থাৎ একটি উগ্র ডানপন্থি সরকার নয়তো একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট যা অচলাবস্থার সৃষ্টি করবে।

ভোটের এক সপ্তাহ আগে ফ্রান্সের প্রবীণ রাজনৈতিক ভাষ্যকার নিকোলাস বাভারেজ বলেন, এখন দেশের সামনে তিনটি ঝুঁকি। প্রথমত, ফ্রান্সের সার্বভৌম ঋণের সংকট, দ্বিতীয়ত, রাস্তায় রাস্তায় সহিংসতা এবং তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘পঞ্চম প্রজাতন্ত্র এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যাতে রাষ্ট্র বিভিন্ন সংকট পাড়ি দিতে পারে। কিন্তু আমরা এখন খুবই অস্থিতিশীল অবস্থায় আছি। নাগরিকরা বিভ্রান্ত, কারণ খোদ প্রেসিডেন্টই বিভ্রান্ত। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বাজেভাবে ভেঙে যেতে পারে।’ ফ্রান্সের বর্তমান প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা ‘পঞ্চম প্রজাতন্ত্র’ বা ফিফ্থ রিপাবলিক হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৮ সালে শার্ল দ্য গলের প্রতিষ্ঠিত সংবিধানের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু।

মাখোঁর মিত্র হরাইজনস দলের প্রার্থী জুলিয়েট ভিলগ্রাঁ বলেন, ‘ইউরোপীয় নির্বাচনের রাতে মাখোঁ যখন নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানান, তখনই আমি আমার সন্তানদের বলেছিলাম, ‘তোমরা কি বুঝতে পারছ যে আমরা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত দেখছি? প্যারিসের দক্ষিণে সেন এ মার আসনে লড়ছেন ভিলগ্রাঁ। ‘মানুষ জানে (এ নির্বাচনের জেরে) সহিংসতার সম্ভাবনা রয়েছে। লোকে ক্ষুব্ধ আর হতাশ। তাছাড়া এমন রাজনীতিক আছেন যারা সহিংসতার ডাক দিতে পারেন’, বলেন উদ্বিগ্ন জুলিয়েট ভিলগ্রাঁ।

প্রেসিডেন্ট মাখোঁ নিজেও ‘গৃহযুদ্ধের’ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, এটা উগ্র ডান ও উগ্র বামদের কর্মসূচির ‘যৌক্তিক ফলাফল’। গত সোমবার এক পডকাস্টে বলা মাখোঁর কথাগুলোকে বোঝানো হচ্ছে, ভোটারদের ভয় দেখিয়ে নিজের দিকে টানার চেষ্টা বলে। কিন্তু ফ্রান্সের ভাষ্যকার নিকোলাস বাভারেজের মতে এটি একেবারেই বিভ্রান্তিকর কথা। বাভারেজের কথায়, ‘গৃহযুদ্ধ’ শব্দটা ব্যবহার করে খুব বিপজ্জনক কাজ করেছেন মাখোঁ। ভীতিকে কাজে লাগিয়ে নিজের ক্ষমতা বাঁচানোর চেষ্টা এটা। গণতন্ত্রে ভয় নিয়ে খেললে ঘৃণা ও সহিংসতারই সৃষ্টি হবে।

মাখোঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্দ দারমানা বলেছিলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় দফার (৩০ জুন এবং ৭ জুলাই) ভোটের রাতে সহিংস বিক্ষোভ হতে পারে এই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা কর্র্তৃপক্ষ। আরএন বিজয়ী হলে কট্টর বাম দলগুলো বিক্ষোভের ডাক দিতে পারে। এর জেরে ফ্রান্সের সমস্যাপীড়িত শহরতলিগুলো থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। বঁলিউ নামে পরিচিত শহরগুলোতে অনেক অভাবী কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসীর বসবাস। এসব জায়গায় বামপন্থিদের বৃহৎ সমর্থন-ভিত্তি রয়েছে। গাজার পক্ষে সমর্থন ছিল তাদের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম মূল বিষয়। ভোটের তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে অলিম্পিক গেমস। এত বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কী প্রভাব ফেলতে পারে সে প্রশ্নটিও দৃশ্যত প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বিবেচনায় নেননি।

চরম ডানপন্থিদের জয় ঠেকাতে প্রচারণার শেষ মুহূর্তে আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী গাব্রিয়েল আতালও। সাবধান করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, আরএন ও তাদের মিত্রদের জয় ‘ঘৃণা ও আগ্রাসী মনোভাবের’ জোয়ার আনবে। আগামী দিনগুলোতে ঠিক কী হবে তা বুঝতে ৭ জুলাইয়ের ভোটের ফল দেখতে হবে। তবে মেরিন লো পেনের দল আপাতত যে ফরাসি রাজনীতির চেহারাটা ভালোভাবেই পাল্টে দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

তথ্যসূত্র : বিবিসি, সিএনএন, এএফপি

লেখক: সাংবাদিক, অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত