তারা পুলিশ দেখলেই বলে, ‘ব্যাপারী আসছে, মাল কেনা শেষ’

মোবাইল বন্ধ রাউটার চালু ধূর্ত ডাকাত

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৮ পিএম

রাজধানীর মতিঝিলের ব্যাংকপাড়া ও মহাসড়কে পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি করে আসছে দুটি চক্র। তাদের দলের সদস্য সংখ্যা ১৬ জনের মতো। গ্রেপ্তার এড়াতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের সময় মোবাইল ফোনের ফ্লাইট মুড অপশন চালু করে পকেট রাউটার এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপস ব্যবহার করে কথা বলে তারা। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সহজে তাদের চিহ্নিত করতে পারেন না। শুধু তাই নয়, নিজেদের মধ্যে কথোপকথনে ব্যবহার করে সাংকেতিক শব্দ।

তারা পুলিশ দেখলেই বলে, ‘ব্যাপারী আসছে, মাল কেনা শেষ।’ যার অর্থ ‘সামনে পুলিশ আছে, যে যার মতো সরে পড়ো’। দলের কোনো সদস্য পুলিশের হাতে আটক হলে বলে ‘কাকা কই নামব, টাকা লাগবে।’ এর অর্থ ‘আমি আটক হয়েছি, আমাকে টোপ বানানো হয়েছে’। এসব সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে প্রায় বিশ বছর ধরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলা আছে গড়ে ১৫টি করে।

সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের মহাসড়কে যানবাহনে ডাকাতির ঘটনায় সক্রিয় এই দুই চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এরই মধ্যে দুটি চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বেরিয়ে আসছে। তারা গত এক মাসে একাধিক যানবাহনে ডাকাতি করে মালামাল লুটে নিয়েছে। ডাকাতির ঘটনায় কুমিল্লা ও ঢাকায় মামলাও হয়েছে। ওইসব মামলায় ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনো পলাতক আছে চক্রের আরও ১১ সদস্য।

গ্রেপ্তাররা হলো একটি ডাকাত দলের সর্দার রমজান শেখ ওরফে কালু এবং দলটির সদস্য মেহেদী শেখ হীরা, জমির খান, আসলামুল হক আসলাম, বেল্লাল ও জহিরুল ইসলাম চৌকিদার। গ্রেপ্তার আরেকজন হলো আরেকটি ডাকাত দলের সর্দার দেলোয়ার। তারা থাকে ঢাকার সাভারে। তাদের মধ্যে কালুর নামে ১০টি, হীরার নামে ৬টি, বেল্লালের নামে ৫টি, জমিরের নামে ৩টি ও জহিরুলের নামে ২টি ডাকাতির মামলা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডাকাত দলের সদস্যরা মতিঝিলের বিভিন্ন ব্যাংকে ছদ্মবেশে অবস্থান করে। তারা বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করা ব্যক্তিকে শনাক্ত করে বাইরে থাকা সদস্যদের কাছে তথ্য পাঠায়। পরে পুলিশ পরিচয়ে টার্গেট করা ব্যক্তির গতিরোধ করে টাকাসহ মূলবান জিনিসপত্র লুটে নেয়। এই চক্রের কাছে রয়েছে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র। তারা যশোর সীমান্ত থেকে সংগ্রহ করেছে ওইসব আগ্নেয়াস্ত্র। ইতিমধ্যে অস্ত্র কারবারিদেরও শনাক্ত করা হয়েছে।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এই ডাকাত চক্র দুটি মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও নরসিংদীসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত ডাকাতি করে আসছে। এই কাজে তারা পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের ব্যবহৃত ওয়াকিটকি, লেজার লাইট ও অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে টার্গেট করা ব্যক্তিদের ভড়কে দেয়। তারা এসব মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গাড়ির চাকা খুলে দাঁড়িয়ে থাকে। যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সন্দেহ না করে। পরে কোনো ট্রাককে টার্গেট করলে, তাদের গাড়ির চাকা লাগিয়ে তাকে অনুসরণ করতে থাকে। এরপর নির্জন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে গাড়িসহ ডাকাতি করে। ডাকাত দলের সদস্যরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক থেকে গরুবাহী ট্রাক এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে রড ও সিমেন্ট বোঝাই গাড়ি ডাকাতি করে। তাছাড়াও ডিম ও মুরগিবাহী পিকআপ ভ্যান, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসও ছিনিয়ে নেয়। প্রথমে তারা টার্গেট করা গাড়ি থামিয়ে চালক ও সহকারীকে অস্ত্রের মুখে নিজেদের গাড়িতে তুলে নেয়। পরে তাদের সুবিধাজনক নির্জন স্থানে ফেলে চলে যায়। এরপর ছিনিয়ে নেওয়া গাড়ি ঢাকার আশুলিয়ায় নিয়ে রাখে এবং তারপর গাড়িসহ মালামাল সাভার ও উত্তরার কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেয়। এমন কয়েকজন ব্যবসায়ীকে শনাক্ত করেছে ডিবি। এর মধ্যে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত ডাকাতি করা ডিম কিনত আশুলিয়ার শহিদুল নামে এক ব্যবসায়ী।

তদন্ত তদারক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই ডাকাত দলের সর্দার কালু ও আনোয়ারের নামে ১০-১৩টি মামলা রয়েছে। তারপরও তারা গ্রেপ্তার হলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে বের হয়ে যায়। তাদের গ্রেপ্তারের পর জেল থেকে বের করতে নির্ধারিত কয়েকজন আইনজীবী রয়েছেন। তারা প্রতিটি মামলায় এক থেকে দেড় লাখ টাকায় জামিন করান। এই টাকা ডাকাতরা জামিনের পর ডাকাতি করেই পরিশোধ করে। আইনজীবীদের সঙ্গে চুক্তির পর অনেকেই জামিন নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ডাকাতরা যাতে জামিন পেতে না পারে সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে। তা না হলে ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধ রোধ করা সম্ভব হবে না।

এ বিষয়ে ডিবির মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার রাজীব আল মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডাকাত দলের সদস্যরা টাকা লেনদেনের তথ্য ব্যাংকের মধ্য থেকেই সংগ্রহ করে। ব্যাংকের ভেতরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করা লোকজনকে নজরদারিতে নিয়ে আসতে হবে ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষকে। আর পথে পুলিশ পরিচয়ে কাউকে গতিরোধ করলে ভয় না পেয়ে তার পরিচয়পত্র যাচাই করে দেখতে হবে। এ ছাড়া তাদের (ডাকাতরা) বিরুদ্ধে পুলিশ চার্জশিট দিলেও তারা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধ করছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত