অধিগ্রহণে গ্রহণ!

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪, ০৪:১৩ এএম

 

শাসকরা বলে থাকেন জনগণের জন্যই উন্নয়ন, আর সেই উন্নয়ন করতে গিয়ে যদি জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নানা রকম

উন্নয়নকাজের জন্য মাঝে মাঝেই জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়ে আর নিয়মানুসারে সেসব অধিকৃত জমির মালিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। কিন্তু, প্রায়শই অভিযোগ পাওয়া যায় যে, বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য অধিকৃত জমির মালিকরা যথাসময়ে ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ পান না। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, খুলনায় সড়ক নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলেও টাকা পরিশোধ করা হয়নি। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিনা নোটিসে বসতবাড়ি ভেঙে কাজ শুরু করতে যান ঠিকাদার ও তার লোকজন। এতে বাড়িহারা হয়েছেন এক নারী। গত ২৬ জুন খুলনা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে লিখিত অভিযোগে এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন জমির মালিক ভুক্তভোগী ওই নারী।

 

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়ার শরাফপুর ইউনিয়নের গজোন্দ্রপুর ভদ্রা নদীর ওপর ৮৪ মিটার দৈর্ঘ্যরে গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করছে খুলনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্রিজের পূর্বপাশে ১০০ মিটার সংযোগ সড়কটি ১৪ থেকে ১৫ জনের জমির ওপর দিয়ে যাচ্ছে। জমির মালিকরা জেলা প্রশাসনের ৭ ও ৪ ধারার নোটিস পেলেও অধিগ্রহণ মূল্য ও ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। অন্যদিকে দীর্ঘদিনেও তাদের কথা কানে তোলেনি এলজিইডি। অধিগ্রহণের অর্থ ও ক্ষতিপূরণ না দিয়ে বাকি থাকা ১০০ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ করতে গেলেই বাধা দেন জমির মালিকরা। তাদের বাধায় প্রকল্প সমাপ্ত হচ্ছে না। সড়কটি নির্মাণ শেষ না হলে বাকি বিল তুলতে পারছেন না ঠিকাদার। এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডির সঙ্গে জমির মালিকদের বিরোধ দেখা দেয়।অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের লোকজন ঠিকাদারের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে জোর করে অধিকৃত জমিগুলো দখলের চেষ্টা করেছেন। তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও, ব্রিজ নির্মাণ বন্ধ থাকায় লোকজনের অসুবিধা হচ্ছে উল্লেখ করে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেন যে, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া মাঝামাঝি অবস্থায় রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের নামের তালিকা তৈরি করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে টাকা না আসায় তাদের দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

 

বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে জমি অধিগ্রহণ সবসময়ই একটি জটিল বিষয়। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষের আয়রোজগারের মূল উৎস জমি। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এই বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের কারণে অনেকেই চাষাবাদের জমি হারায় এবং অসংখ্য মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। জীবন-জীবিকার বিষয়টি বাদ দিলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জমির সঙ্গে মানুষের রয়েছে আবেগের এবং আত্মমর্যাদার সম্পর্ক। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণে বিভিন্ন সুশাসনগত সমস্যা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়ভিত্তিক ক্ষতিপূরণ এবং জীবিকা পুনর্বাসনসহ ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যেমন, ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনে নিয়মবহির্ভূত টাকা আদায়, সম্পদের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে দুর্নীতি, ক্ষতিপূরণ উত্তোলনে জমির মালিকদের ভোগান্তি ও হয়রানি, ক্ষতিপূরণ প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে অনিয়ম ইত্যাদি। এসব কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি এদেশের মানুষ কখনোই সাদরে গ্রহণ করেনি। ফলে যেখানেই সরকার উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়েছে সেখানেই জনগণের প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। 

 

জমি অধিগ্রহণ বিষয়ক জটিলতা কমানো যেমন জরুরি, তেমনি মনে রাখা দরকার যে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে না নিলে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই কার্যকরী হয় না। এ বিষয়ে সরকারের নানা মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনের সব স্তরে সঠিক সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। জমি অধিগ্রহণের ব্যাপারটি জনগণের জন্য অভিশাপ না হয়ে যেন আশীর্বাদ হয় তা লক্ষ রাখা দরকার। আর এই কাজটি করার সময় প্রশাসন ও জনতা যাতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে না যায় সে ব্যাপারটিও খেয়াল রাখতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত