আমরা সবকিছুই শেষ মুহূর্তে এসে করি

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৪, ১২:৪৪ এএম

২৬ জুলাই প্যারিসে শুরু হচ্ছে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস। যেখানে বাংলাদেশের পাঁচ ক্রীড়াবিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। বাংলাদেশ বহরের প্রধান (শেফ দ্য মিশন) করা হয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের উপমহাসচিব ও বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইন্তেখাবুল হামিদ অপুকে। আসছে অলিম্পিক ও দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বাস্তবতা নিয়ে এই সংগঠক কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দর সঙ্গে

আরেকটি অলিম্পিক এগিয়ে আসছে। বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের প্রধান (শেফ দ্য মিশন) হিসেবে আপনার প্রত্যাশা কী?

ইন্তেখাবুল হামিদ : যে কোয়ালিফাই করে যাচ্ছে, তার কাছে প্রত্যাশা তো অবশ্যই একটু বেশি। যারা ওয়াইল্ড কার্ড নিয়ে যাচ্ছে, তাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা কম থাকবে। আরচারি থেকে একজন সামার অলিম্পিকে যোগ্যতা অর্জন করে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্যারালিম্পিকেও একজন আরচার নিজ যোগ্যতায় খেলতে যাচ্ছে। এটাও আমাদের বড় প্রাপ্তি। আরচার সাগর যেহেতু অনেকের সঙ্গে লড়াই করে কোটা অর্জন করেছে। সঠিক সময়ে সঠিক পারফরম্যান্সটা করতে পারলে ওর কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়া যেতে পারে। আমি যেহেতু শুটিংয়ের মানুষ, শুটিংয়ে আমরা ভেবেছিলাম সায়রা নামে একটি মেয়ে ওয়াইল্ড কার্ড পাবে। আন্তর্জাতিক শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশন আমাদের জানিয়েছিল, সায়রার নাম তারা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কাছে সুপারিশ করেছে। পরে আন্তর্জাতিক আসরে উপস্থিতির ওপর রেটিং গণনা করে রবিউলকে ওয়াইল্ড কার্ড দিয়েছে। সায়রা যদি যেত প্রত্যাশাটা হয়তো বেশি থাকত। রবিউলেরও ফাইনালে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর বাইরে যারা যাচ্ছে, আশা করব তারা নিজ নিজ ইভেন্টে নিজেদের সেরাটা দেবে। কারণ মানুষের জীবনে অলিম্পিক বারবার আসে না। এই সুযোগটা আমাদের কাজে লাগাতে হবে। সেটা করতে হলে আমাদের প্রয়োজন যথেষ্ট প্রস্তুতির। এই প্রস্তুতি আমরা নিতে পারলাম কি না, সেটাই দেখার বিষয়।

শেষ মুহূর্তে এসে নিশ্চয় আপনি প্রস্তুতির ভালো-মন্দ নিয়ে কিছু বলতে পারবেন না। প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকলেও তো কিছু করার নেই?

ইন্তেখাবুল হামিদ : এটাই আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা সবকিছুই শেষ মুহূর্তে এসে করি। শেফ দ্য মিশনের নিয়োগটাও হয়েছে অনেক বিলম্বে। শেফ দ্য মিশনের কাজ হলো ক্রীড়াবিদরা নির্দিষ্ট সময়ে খেলায় অংশ নিচ্ছে কি না, তারা সব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে কি না, এসব নিশ্চিত করা। এসবের বাইরে আমি মনে করি, শেফ দ্য মিশনের আরেকটি বড় দায়িত্ব আছে, যেটা সাধারণত আমরা করি না। বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন থেকে যারা যাবেন, আর যারা খেলবেন, তাদের সবাইকে গভীরভাবে মনিটরিং করা। না হলে শেফ দ্য মিশনের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত। ওখানে ট্যুরিস্টের মতো গিয়ে বদনাম নিয়ে ফেরার কোনো মানে হয় না। অতীতে এমনও দেখেছি গেমসের শুরুর দুই-তিন দিন পর ঢাকায় ফিরে এসেছেন শেফ দ্য মিশন হয়ে যাওয়া এক কর্মকর্তা।

এমন একটা বহরের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন, যাদের নাম প্রতি অলিম্পিকের আসরে উঠে আসে এক লজ্জার তালিকায়। বিশ্বের জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে যারা কখনোই অলিম্পিক জিততে পারেনি, সেই তালিকার শুরুতেই থাকে বাংলাদেশের নাম। আপনারও তো এবারও বিব্রত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল?

ইন্তেখাবুল হামিদ : শেফ দ্য মিশনকে আসলে এর জন্য খুব বেশি দায় দেওয়া ঠিক নয়। লজ্জা তো অবশ্যই লাগে। এটা ১৭ কোটি মানুষের লজ্জা। এই লজ্জাটা যেন না পেতে হয়, তাই আমাদের দুই আসর পরের অলিম্পিককে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। ২০২৮ অলিম্পিকের পরিকল্পনা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি মনে করি অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেটা আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল। এটার দায় আসলে সবার। এটা অলিম্পিক গেমস। এর জন্য সমন্বিত চেষ্টা ও উদ্যোগ থাকতে হবে। মন্ত্রণালয়, ক্রীড়া পরিষদ, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন ও ক্রীড়া ফেডারেশনগুলে একসঙ্গে বসে নিজেদের লক্ষ্য ও কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে। অথচ আমাদের সবার ভাবনা এসএ গেমসকেন্দ্রিক।

সেখানেও তো বাংলাদেশ খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না?

ইন্তেখাবুল হামিদ : এসএ গেমসে কয়েকটা স্বর্ণপদক পেলেই আমরা তৃপ্ত। আমরা সবাই মনে মনে আশা করি যাতে ভারত না খেলে। ভারত না খেললে যে কিছু পদক বাগিয়ে নেওয়া যাবে। এতেই আমরা তৃপ্ত হই। এটাই আমাদর আশা-ভরসা। যারাই ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্বে নিয়ে আসেন, প্রথমেই অনেক ভালো ভালো কথা বলেন। এটা করা হবে, সেটা করা হবে। আসলেই যদি সেই কথাগুলোকে কাজে রূপ দেওয়া যেত, অবশ্যই ভালো কিছু হতো। তবে এটা ঠিক আমাদের ক্রীড়াবিদদের মধ্যে মেধা আছে। আমরাই সঠিক অনুশীলন আর সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা দিয়ে তাদের কাছ থেকে পারফরম্যান্সটা আদায় করে নিতে পারছি না। আমরা অনেকগুলো খেলা নিয়মিত খেলছি। অনুশীলনও হয়তো হচ্ছে। তবে এগুলো মোটেই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যে অনুশীলনটা প্রয়োজন, সেটা আসলে করতে হবে।

এ দেশের ক্রীড়াবিদদের খেলার বাইরেও অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে হয়। তাদের শিক্ষা-দীক্ষায় ঘাটতি থাকে, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়তে হয়। ঘাটতি সুষম খাদ্যেরও। এসব সমস্যা কিন্তু ভারতেরও আছে। অথচ ভারত ঠিকই এটা পাশ কাটিয়ে অলিম্পিকের মতো আসরে ভালো করছে। তাহলে আমরা কেন পারছি না?

ইন্তেখাবুল হামিদ : আপনার সঙ্গে আমি শতভাগ একমত। আমাদের অ্যাথলেটদের বয়সটা থাকা উচিত ১৪ থেকে শুরু ২৪ পর্যন্ত। এই ১০ বছরের মধ্যেই এরা ফলাফল দেবে। ২৪-এর পর দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়, বিয়েশাদি হয়ে যায়। তখন খেলার প্রতি শতভাগ মনোযোগ দিতে পারে না। ২৪ পর্যন্ত তারা এত বেশি দায়িত্ব নিতে পারেনি। মন দিয়ে খেলতে পারে। এখানে যদি আমরা বাড়তি কিছু দিতে পারি এবং যদি এই বিশ্বাসটা তাদের দিতে পারি যে তোমরা খেলো, আমরা তোমাদের পাশে আছি, তাহলেই হবে। ভারতের শুটিং নিয়ে একটু বলি। সরকার প্রতিবছর শুটিংকে ১৮০ কোটি ভারতীয় মুদ্রা দেয়। সেখানে মন্ত্রণালয় আমাকে এক বছরে দেয় ১৬ লাখ টাকা। তাহলে কী করে আপনি আমার কাছ থেকে ভালো কিছু চাইবেন? আপনার কাছে যখন বাদাম থাকবে, আপনি বানরের কথাই ভাববেন, আপনার তো তখন বাঘের কথা ভাবা উচিত নয়।

তাহলে মুক্তির উপায় কী?

ইন্তেখাবুল হামিদ : আমি তো মনে করি, আমাদের ভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। এটাকে যদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখি, সেখানে আমাদের প্রফিটের কথা চিন্তা করতে হবে। আর প্রফিটটা হলো অলিম্পিকের স্বর্ণপদক। এভাবে যদি চিন্তা করি যে হ্যাঁ, আগামী এক বছরে আমরা পাঁচটি ফেডারেশনকে বেছে নিয়ে অনুশীলন বাবদ ১০০ কোটি টাকা ঢালব। বিশ্বের সবচেয়ে সেরা কোচ এনে চোখ বন্ধ করে ৮ থেকে ১০ বছর ট্রেনিং করাতে হবে। শুরুটা করতে হবে ১৪ থেকে। আমাদের আসলে এখনই ১৯৩২ সালের অলিম্পিক নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। এ ছাড়া ২০২৮-এর জন্যও আমরা তৈরি হতে পারি। কারণ আরচাররা এখন ভালো করছে। শুটিংও ভালো অবস্থানে আছে। এদের নিয়ে আমরা একটা শর্টটার্ম পরিকল্পনা করি। এর সঙ্গে থাকুক একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত