তারে একজনমে ভালোবেসে...

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৪, ০৭:১১ পিএম

বাংলা সিনেমার প্লেব্যাক সম্রাট বলা হয় এন্ড্রু কিশোরকে। আজ জনপ্রিয় এই কণ্ঠশিল্পীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। বরেণ্য এই কণ্ঠশিল্পীর জীবনের নানাদিক নিয়ে দেশ রূপান্তরে গত বছর তাপস রায়হান লিখেছিলেন। পাঠকদের জন্য লেখাটি পুনরায় দেওয়া হল। 

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র সংগীতশিল্পী নিয়ে যদি কখনো কোনো প্রামাণ্যচিত্র হয় চোখ বন্ধ করে বলা যায়, সেলুলয়েডে বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে থাকবে দীর্ঘ সময়ের একটি নাম। ১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর, রাজশাহীতে যিনি জন্ম নিয়েছিলেন।

প্রথম জীবনে নাম ছিল তার এন্ড্রু কিশোর কুমার বাড়ৈ। বড় হয়েছেন সেখানেই। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী বেতারের মাধ্যমে শুরু করেন সংগীত জীবন। কণ্ঠ ছিল অসম্ভব দরদি। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লোকগীতি, আধুনিক গান দিয়ে শুরু সংগীত জীবন। ১৯৭৭ সালে, ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মাত্র ২২ বছর বয়সে শুরু করেন প্লেব্যাক। সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন আলম খান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যত দিন কণ্ঠে সংগীত রাজত্ব করেছে, তিনিই ছিলেন বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সম্রাট। হাজার হাজার গানে কণ্ঠ দিয়ে দেশের চলচ্চিত্র সংগীতপিপাসু মানুষকে করেছেন বিমোহিত। অথচ নিজের জীবনের প্রতি ছিলেন ভয়ংকর উদাসীন। বন্ধনহীন জীবনের মতন ঘুরে বেড়িয়েছেন। যদিও স্ত্রী লিপিকা এন্ড্রু আর দুই সন্তানের বাবা ছিলেন। দুই সন্তানই অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। মেয়ে মিনিম এন্ড্রু সংজ্ঞা সিডনিতে গ্রাফিক ডিজাইন ও ছেলে জে এন্ড্রু সপ্তক মেলবোর্নে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে পড়াশোনা করছেন।

বিশাল প্রাপ্তির পরও এড্রু কিশোর অজানা এক কষ্টে হঠাৎই আনমনা হতেন। দেখা হলেই প্রাণখোলা হাসি তার। কিছু বললেই মুচকি হাসতেন। বলতেন নো প্রবলেম। চলে যাচ্ছে। গালভর্তি কাঁচাপাকা চাপদাড়ি নিয়ে, একটু নাক কুঁচকে, ঠোঁট ফাঁক করে হাসতে হাসতে এক দিন বললেন চলো, নতুন একটি জায়গায় যাই। চিল ব্রো, চিল...।

প্রাণোচ্ছল এন্ড্রু কিশোর বিরামহীনভাবে চলচ্চিত্রে গান গেয়ে, হেসে-খেলে জীবন কাটিয়েছেন। তার গাওয়া অজস্র গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস, আমার সারা দেহ, জীবনের গল্প আছে বাকী অল্প, ভেঙ্গেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা, আমার বাবার মুখে, তুমি যেখানে আমি সেখানে, চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা, ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না, সবাই তো ভালোবাসা চায়, তুমি মোর জীবনের ভাবনা, আমার বুকের মধ্যখানে, তোমায় দেখলে মনে হয়সহ শত শত গান জনপ্রিয় হয়েছে চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে। দীর্ঘ সময় দর্শকের মনে এমন ধারণাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ঢাকাই চলচ্চিত্রের গান মানেই এন্ড্রু কিশোর। প্রায় আড়াই দশক দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের সংগীত জগৎ।

১০ মাস দুরারোগ্য ক্যানসারের সঙ্গে সঙ্গে বসবাস করে জীবনযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার আগে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে স্ত্রী লিপিকা এন্ড্রুকে বলেছিলেন ‘আমি দেশের মাটিতে মরতে চাই। ব্লাড ক্যানসার আমাকে আর সময় দেবে না।’ এর আগে সিঙ্গাপুরে থাকতেই লিপিকা এন্ড্রু একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি আবেগী ভাষায়, এন্ড্রু কিশোরের সর্বশেষ অবস্থা জানিয়েছিলেন দেশের মানুষকে। লিখেছিলেন শুরুতে ডাক্তার বলেছিলেন, ‘লিম্ফোমা’ যদি শরীরে আবার ফিরে আসে, তাহলে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আসবে। তখন রোগীকে কোনোভাবেই বাঁচানো যাবে না। এই কথা শুনে আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। মনে মনে শুধু ঈশ^রকে ডেকেছি। তখন কিশোর আমাকে বলল ডাক্তারকে বলবে, আমাদের ছেড়ে দিতে। আমরা দেশে ফিরব। আমি ভয়ে চুপ করে বসে আছি। শুধু বললাম দেখি ডা. লিম কী বলেন? এরপরই একজন নার্স এসে আমার হাত ধরে বাইরে নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন ডাক্তার ডাকছেন। তখন লিম আমাকে শুধু বললেন লিম্ফোমা ব্যাক করেছে। আমি বললাম হোয়াট নেক্সট! চোখের জল ঠেকাতে পারছিলাম না। ডা. বললেন, আই অ্যাম স্যরি। আই হ্যাভ নাথিং টু ডু। কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে থাকলাম। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। নিজেকে অসম্ভব অসহায় লাগছিল। এরপর এই কথা শুনে কিশোর আমাকে বলে, আমি তো মেনে নিয়েছি। কাঁদছি না। তুমি কাঁদছো কেন! সব ঈশ^রের ইচ্ছে। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। কিশোর তখন বাংলাদেশ মিশনে ফোন করে বলে আমাকে আগামীকালই দেশে ফেরার ফ্লাইট ঠিক করে দিন। আমি মারা গেলে অনেক ঝামেলা হবে। জীবিত অবস্থায় পাঠানো, আপনাদের জন্য সহজ হবে।

এরপর...। নিশ্চিত মৃত্যুর নীরব সংকেত পেয়ে এন্ড্রু কিশোর ফিরে এলেন রাজশাহীর বোনের বাসায়। কিছুদিন পর জীবনের তরী ঘাটে থামল, সেই জন্মস্থানেই। ২০২০ সালের ৬ জুলাই সন্ধ্যায় দম ফুরাল তার। সমাপ্ত হলো সুদীর্ঘ সংগীতজীবনের রাজকীয় পথচলা। রাজশাহী সার্কিট হাউজের সামনেই চার্চ অব বাংলাদেশের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সিমেট্রিতে চিরনিদ্রায় রয়েছেন ঢাকাই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের কণ্ঠ জাদুকর এন্ড্রু কিশোর। তার গাওয়া সেই জনপ্রিয় গানটির কথা দীর্ঘদিন কানে বাজবে হায়রে মানুষ রঙ্গীন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস! বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র সংগীতের বরপুত্র এন্ড্রু কিশোরের মৃত্যুদিনে থাকল নিযুত শ্রদ্ধার্ঘ্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত