কথায় বলে, যে ভোর দেখলেই মোটামুটি বোঝা যায়, সারা দিন কেমন যাবে। ভারতের এবারের নির্বাচনের পরে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, গত দুবারের মতো এবার কখনোই একতরফাভাবে শাসক এনডিএ জোট বিরোধী কণ্ঠ রোধ করতে পারবে না। বললাম বটে এনডিএ জোট। যার কেতাবি নাম, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স। জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা। আসলে তা ছিল বিজেপির। অন্যান্য দল দুএকটা ছিল বটে, কিন্তু তা নামকাওয়াস্তে। কলকাঠি যা নাড়ার তা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ-ই নাড়তেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকা অবস্থা থেকে যারা নরেন্দ্র মোদিকে চেনেন, তারা জানেন, গণতন্ত্রের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সম্পর্ক খুবই পলকা। অন্যের মতামত মেনে দেশ চালাবেন, এমন উদার হৃদয় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আছে, এ তার অনুগত ভক্তরাও বলতে পারবে না।
কিন্তু ওই, বলে না, হাতি কাদায় পড়লে ব্যাঙেও লাথি মারে। এবার হয়েছে তাই। চারশো পার বলতে বলতে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে বহুদূর, মাত্র দুশো চল্লিশে এসে থেমে যাওয়ায় মোদিজিকে বাধ্য হয়ে অন্য শরিকদের বাবা বাছা বলে জামাই আদরে নিতে হলো সরকার গড়তে। কুর্সি ছাড়া নরেন্দ্র মোদি, ভাবাই যায় না। কিন্তু এবার আক্ষরিক অর্থেই এনডিএ সরকার। মিডিয়া সেভাবে বলছে না। অথচ এটা নিশ্চিত যে, ভারতে, অন্তত আপাতত বিজেপি জমানা খতম। জোট সরকারের ফের আবির্ভাব। ভারতের জনতা নিঃসন্দেহে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের ভাষায়, ‘ভারতের জনগণ হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা রাজনীতিবিদদের রুখে দিতে পেরেছে।’
সোজাসুজি বলাই যায়, নরেন্দ্র মোদির কর্তৃত্ব আগের চেয়ে কমেছে। আর সংসদেও মোদিজি যত চেঁচামেচি করে নিজেকে বিরাট ক্ষমতাধর প্রমাণ করার চেষ্টা করুন, বাস্তবে তিনি এখন নিতান্তই কাগুজে বাঘ ছাড়া কিছু নন। প্রথম দিনেই বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী যেভাবে বিজেপিকে তুলোধোনা করেছেন তা কয়েক বছর কল্পনাও করা যায়নি। রাহুল গান্ধীর চোখা চোখা বাক্যবন্ধে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ ও অন্যান্য ভাজপা (ভারতীয় জনতা পার্টি) নেতাদের অসহায় অবস্থা তাদের শরীরের ভাষাতেই স্পষ্ট।
পরের দিন সংবাদ মাধ্যমে, এবং জবাবি ভাষণে নরেন্দ্র মোদি অভিযোগ করলেন যে, রাহুল গান্ধী হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করেছিলেন। সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা! রাহুল বলেছিলেন যে কোনো ধর্ম হিংসা, ঘৃণাকে সমর্থন করে না। হিন্দুধর্মও করে না। সঙ্গে সঙ্গে এও জানিয়েছেন যে, নরেন্দ্র মোদি, বিজেপি, সংঘ পরিবার হিন্দুধর্মের ঠিকা নিয়ে বসে নেই। তবুও নরেন্দ্র মোদি ও তার ভক্তরা রাহুল হিন্দুবিরোধী বলে আসর গরম করতে নেমে পড়েছে। এই অসত্য বচন এবার মোদি সরকারের পতনের অন্যতম কারণ। চারশো পার, চারশো পার বলে লম্ফঝম্ফ করা লোকজন মানতেই পারছে না যে তারা এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হতে পারেনি। সংসদে, দেখলাম নরেন্দ্র মোদি বলেছেন যে, কংগ্রেস প্যারাসাইট। অপরের সঙ্গে জোট করে ভোটে জেতে। এটা অবশ্যই ইনডিয়া জোটে ভাঙন ধরাবার এক কৌশল। যদিও এবার তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। যিনি অপরকে প্যারাসাইট বলছেন তিনি যে চন্দ্রবাবু নাইডু ও নীতিশ কুমারের কাঁধে ভর করে দাপটহীন প্রধানমন্ত্রী তা যে কেন ভুলে যান বুঝতে পারি না। হতেই পারে তিনি স্বয়ং ঈশ্বরের অংশ। নন-বায়োলজিক্যাল ম্যান। তবুও প্রথম থেকেই রাহুল গান্ধীর মারমুখী বক্তৃতায় কেমন অসহায় হয়ে গেছিলেন তা প্রযুক্তির কল্যাণে সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে।
নরেন্দ্র মোদির সরকার এবার যে সহজে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে না, সেটা স্বয়ং মোদিজিও জানেন। বিজেপির সাধের উত্তর প্রদেশ যে এভাবে ডোবাবে তা কস্মিনকালেও ভাবতে পেরেছে কেউ! রাহুল গান্ধীর বড় খোঁচা ছিল খোদ অযোধ্যায় বিজেপির গো-হারা হেরে যাওয়া নিয়ে বিদ্রুপ। এটা হজম করতে পারা সত্যিই কঠিন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহদের পক্ষে। রাহুল গান্ধী হারের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন, অযোধ্যার বহুচর্চিত রামমন্দির উদ্বোধনে মান্যগণ্য অনেকেই ছিলেন। আম্বানি জি ছিলেন। কিন্তু অযোধ্যার সাধারণ মানুষের সেখানে কোনো জায়গা ছিল না। ফলে তারা অপমানের জবাব তো দেবেই। কথাটা তো ভুল নয়। গত কয়েক বছর ধরে বিজেপির আমলে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েছে এ বোঝার জন্য অমর্ত্য সেন হওয়ার দরকার নেই। ডিমনিটাইজেশন বা বিনা নোটিসে কভিডকালে লকডাউনে কত কত পরিবার ভেসে গেছে তা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের হেলদোল নেই। নরেন্দ্র মোদির রাজত্বকালে বেকারত্ব বেড়েছে মাত্রাহীন। তিনি শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। ক্ষমতা পেলে কোটি কোটি তরুণের চাকরি হবে। বিদেশের কালো টাকা ফেরত নিয়ে এসে প্রত্যেক ভারতের নাগরিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পনেরো লাখ টাকা জমা পড়বে। এমন সব কাজ হয়েছে যার প্রোপাগান্ডা হয় গগনচুম্বী। কিন্তু কার্যত তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছুদিনের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে। সে রেলসেতু বা বন্দে ভারত ট্রেন কিংবা উন্নয়নের ঠেলায় পাহাড়ি জনপদ।
ব্রিটিশ যুগের কুখ্যাত কালো রাওলাট আইনকে সাফসুতরো করে নতুন ন্যায়বিচারের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন নতুন আইন এনেছে মোদি সরকার। তা আনতে তারা ছলে-বলে-কৌশলে বিরোধী সদস্যদের সাসপেন্ড করে সংসদকে বিরোধীশূন্য করার ঘৃণ্য কৌশল নিয়েছিলেন। এ রকম অজস্র উদাহরণ আছে যা মোটেও গণতান্ত্রিক নয়। পুরোপুরি স্বৈরতান্ত্রিক। পাশাপাশি এই কয়েক বছর ধরে নরেন্দ্র মোদির সরকার গোটা দেশ জুড়ে ঘৃণা-বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। শুধু মুসলিম নয়, দলিত হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের ওপরেও একাধিকবার হামলা চালিয়েছে সংঘ পরিবারের লোকেরা। খোদ প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কুৎসিত ভাষায় নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করেছেন। যা দেশের অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী করা তো দূরের কথা, কল্পনাও করেননি।
খেয়াল করে দেখবেন, ইদানীং আমি প্রায়ই বিজেপির নয়, বলি নরেন্দ্র মোদির সরকার। কারণ গোটা নির্বাচনে দলকে গৌণ করে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন একজনই। তিনি ঈশ্বরের অংশ, মাননীয়, মহামহোপাধ্যায়, মহামহিম শ্রীল শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। যিনি ছোট্টবেলায় কলকাতা এসেছিলেন মেট্রো ট্রেনের টানে। যদিও সালটাল হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে মেট্রো রেল যখন এ শহরে চলতে শুরু করে, তখন মাননীয়র বয়স চৌত্রিশ বছর। ওই বয়স কি আর ছোট্টবেলা বলা যায়! কি জানি, ভগবানের অংশের পক্ষে সবই হয়তো সম্ভব। তিনি নাকি এন্টায়ার পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে এমএ করেছেন। হবে হয়তো অমন কোনো জটিল সাবজেক্ট। যা সাধারণ মানুষের জানা নেই। এমন কোনো ধর্ম নেই, যেখানে তিনি বলেননি, যে তাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক জন্মজন্মান্তরের। তিনি যখন ধর্ম জিজ্ঞাসায় আকুল হয়ে নিরালায় ধ্যানে বসেন তখন সেখানে কেউ যেতে পারে না। তার ধ্যানভঙ্গ হবে বলে। শুধু কয়েকশো ক্যামেরা ইউনিট তাকে ঘিরে থাকে, প্রতি মুহূর্তে তার কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য।
নরেন্দ্র মোদির মনুবাদী ভাবনাকে লোকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলের জোট এবার ভোটে হয়তো জিততে পারেনি। কিন্তু নৈতিক পরাজয় নিঃসন্দেহে হয়েছে এবার নরেন্দ্র মোদির। তিনি নিজেই বেনারস কেন্দ্রে হারতে হারতে বেঁচে গেছেন। সরকারি কর্মচারীদের যাবতীয় ভোট গেছে বিরোধী বাক্সে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মতো হেভিওয়েট প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তথাকথিত ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’-এর ভাগ্যে এবার কী ছিল বলা কঠিন।
বিরোধী জোট এবার অনেক সঙ্ঘবদ্ধ। রাহুল তো বটেই, অখিলেশ যাদব, শশী থারুর, মহুয়া মৈত্র, আমড়া রাম এ রকম বহু যোদ্ধা নিশ্চিত এবারের সংসদে মোদি সরকারকে বিপাকে ফেলবে। লালুপ্রসাদ যাদব বলেছেন যে, মোদি সরকার খুব বেশি হলে, আগস্ট মাস অবধি টিকবে। আমি কোনোরকম ভবিষ্যদ্বাণী করব না। সে যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু এটা বলব, সারা দেশে নরেন্দ্র মোদি সরকারের জনপ্রিয়তা দিনকে দিন কমবে। রাহুল গান্ধীর কথায় বলি, শুধু ঘৃণা, বিদ্বেষ দিয়ে জনগণের মন জয় করা যায় না। বেঁচে থাকার ন্যূনতম শর্ত পূরণ না করলে লাঠি, গুলি, দমন-পীড়ন করে পৃথিবীর কোথাও কোনো সরকারের পক্ষেই দিনের পর দিন শাসন করা কার্যত অসম্ভব। ফলে এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই যে নরেন্দ্র মোদি ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা যদি নিজেদের ভ্রান্তনীতি শুধরে না নেন, তবে আগামীতে এই সরকারের ওপর জনরোষ বাড়বে।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
