১৯৫৫ সাল, ফ্রান্সে তখন চতুর্থ সংবিধানের (ফোর্থ রিপাবলিক) শাসনামল; সেই সময় সেখানে জনতুষ্টিবাদী, কর ব্যবস্থাবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল নেতা পিয়েরে পুজেদের দল ‘ইউডিসিএ’-এর উত্থান ঘটে। এ সময় তাদের ঠেকাতে একত্র হয়েছিল প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক মধ্য-বাম ও মধ্য-ডান শক্তিগুলো। সে সময় একজন প্রথিতযশা সাংবাদিকের লেখা থেকে ধার করে ফরাসি গণমাধ্যম ‘লে মন্ডে’-এ এই যৌথমঞ্চকে ‘রিপাবলিকান ফ্রন্ট’ বলে আখ্যা দেয়। ওই সময় প্রগতিবাদীরা যেভাবে ডানপন্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়; ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এসে আধুনিক ফ্রান্সে (ফিফথ রিপাবলিক) রিপাবলিকান ফ্রন্টের সেই মৈত্রী আবারও ফিরে এলো। ডানপন্থার বিপদ ঠেকাতে একাট্টা হলো বাকি সবাই। দেশটিতে এর আগে এই রিপাবলিকান ফ্রন্টের কথা জোরেশোরে শোনা গিয়েছিল ২০০২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। শুধু তাই নয়, ফ্রান্সে গত শতকে নানা সময় এই ফ্রন্টের কথা এসেছিল। তবে চব্বিশের রিপাবলিকান ফ্রন্ট যেন অনেক কিছুর চেয়েও তাৎপর্যবাহী। এবারে ফরাসি ডানদের বিরুদ্ধে বাকিদের লড়াইয়ে চোখ রাখছিল গোটা ইউরোপ। কারণ এর ওপর ইউরোপের প্রতিরক্ষা, আদর্শ আর ফাঁপা মূল্যবোধের অনেক কিছুর নির্ভর করত।
এই টালমাটাল পরিস্থিতি ১৯৫৫ সালের চরিত্রগুলোকে ২০২৪-এ চোখের সামনে যেন মূর্ত করে তুলল। কারণ ডানপন্থি নেত্রী লি পেনের বাবা জ্যাঁ-ম্যারি লি পেন ছিলেন সেদিনের ডানপন্থি ইউডিসিএর অন্যতম নেতা। ইহুদিবিদ্বেষ, অভিবাসন বিরোধিতাসহ কট্টর ডান মতাদর্শের জন্য তিনি ছিলেন নিন্দিত। ওই সময়ের রিপাবলিকান ফ্রন্ট যেমন ইউডিসিএর যাত্রা থামিয়েছিল, এবারও তাই হলো। মেরিঁ লি পেন ও শিষ্যদের বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে সব বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিকে এক মঞ্চে আসার আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। ফল প্রকাশের পর দেখা গেল এই ‘ডানপন্থা রুখো’ আহ্বান চমকপ্রদভাবে সাড়া ফেলেছে। বলা হচ্ছে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ডানপন্থি পতাকা মেয়ের হাতেও মাথা তুলতে পারল না।
ফরাসি বিপ্লবের দেশে ইউরোপীয় মূল্যবোধের কুলীন পণ্ডিতরা ফ্রান্সকে ডানপন্থার হাতে চলে যেতে দেখার শঙ্কায় গত রবিবার পর্যন্ত চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু অভিজাত মূল্যবোধের একতরফা দাবিদার ইউরোপীয় চিন্তকদের কপালের ভাঁজ এরই মধ্যে সরে গেছে। কারণ ফ্রান্সের আইনসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় ৩৩ শতাংশের মতো ভোট দখল করে প্রথম হওয়া দল কট্টর ডান দল ‘ন্যাশনাল র্যালি (আরএন)’ দ্বিতীয় দফার ভোট শেষে তৃতীয় স্থানে চলে গেছে। শেষ অবধি ডানপন্থিদের হারানোর লড়াই ফলপ্রসূ হয়েছে। আর এতে আশ্চর্যজনকভাবে সিংহভাগ আসন পেয়েছে বামপন্থিদের জোট।
অথচ ফ্রান্স থেকে ইউরোপের মঞ্চে মাথা তোলা আরএন নেত্রী মেরিঁ লি পেন হুংকার দিয়েছিলেন দ্বিতীয় ধাপেও অবিস্মরণীয় কিছু করার। সম্ভাবনাও তৈরি করেছিলেন। জুন মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আইনসভা নির্বাচনে লি পেনের দল ফ্রান্সে ৩১ শতাংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে। সেই শঙ্কায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ আইনসভার আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। ঘটনাচক্রে মাখোঁর এই জুয়ায় নিজের দলের জয় পোক্ত না হলেও ডানপন্থার বিপদ আপাতভাবে কাটানো গেছে বলেই ভাবা হচ্ছে। এখন বিশ্লেষকরা বলছেন, ডানপন্থার বিপদ না হয় আপাতত কাটল, ফান্সের সামনে যে অনিশ্চয়তা এলো, তার মেঘ সরানোর কী হবে!
নির্বাচনে বামপন্থি মতাদর্শের নিউ পপুলার ফ্রন্ট (এনএফপি) ১৮৩টির মতো আসনে জয়লাভ করে শীর্ষ অবস্থানে এসেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রেসিডেন্ট মাখোঁর ‘অ্যাঁসেম্বেল অ্যালায়েন্স’, যারা ১৬৩টি আসনে জয় পেয়েছে। বিষয় হলো, ৫৭৭ আসনের নিম্নকক্ষে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৮৯ আসন পায়নি কেউই। অর্থাৎ সরকার গঠনের জন্য একে অপরের সমঝোতা ছাড়া ঝুলন্ত এই পার্লামেন্ট এগুতে পারবে না। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন থেকে শুরু করে কোনো কিছুই বিতর্ক ছাড়া হবে না।
ফ্রান্সের নির্বাচনের কয়েকদিন আগে যুক্তরাজ্যের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়ে গেল, যেখানে জয় পেয়েছে লেবার পার্টি। অর্থাৎ ব্রিটিশদের পর এবার ফরাসিরা ডানপন্থাকে ছুড়ে ফেলল। কিন্তু ফ্রান্স আর ব্রিটেনের প্রগতির ঝান্ডাধারী দুই শিবিরের জয়ের মধ্যে তফাৎ বিস্তর। লেবার পার্টি একক শক্তিতে আইনসভার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। যদিও বাম-প্রগতিশীল ধ্যান-ধারণাও প্রশ্নবিদ্ধ।
একটি কথা প্রচলিত রয়েছে, ব্যাপারটি অনেকাংশে সত্যও, তা হলো ইউরোপে বামপন্থি মনোভাবাপন্ন দাবি করা দলগুলো জিতে আসার মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর গুণগত কোনো লাভ হবে না; যেহেতু এসব বামশক্তি পশ্চিমাদের সুনির্দিষ্ট বয়ান বা বিবৃতির বাইরে চিন্তা করে না বলেই মনে করা হয়। অর্থাৎ গাজা থেকে ইউক্রেন বিদ্যমান সংকট নিরসনে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা অবস্থানের যে দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তাই দেখা যাবে ফ্রান্সের জয়ী দলের ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রচলিত এই ধারণাটি ফ্রান্সে এবার না-ও খাটতে পারে।
নির্বাচনে বামপন্থি ব্লক এনএফপির মধ্যে চারটি দল রয়েছে। দল চারটি একে অপরের সমালোচনায় মুখর ছিল নির্বাচনের আগেও। এই চারটি দলের রয়েছে নিজ নিজ মূলনীতি ও কর্মসূচি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই চারটি দলের তরফেই হোক কিংবা বাইরের কারও সমর্থনে হোক; যিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তাকে অনেক মতের সম্মিলন ঘটাতে হবে। আবার মাখোঁর দলের বাইরের কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে মতের পার্থক্য দেখা দেবে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের সঙ্গে। এখানে মতপার্থক্য প্রবল যে মতৈক্য নির্মাণ জটিল ব্যাপার হবে। আবার সরকার গঠনের পরও পথচলা সহজ হবে না। বিশেষত, ফ্রান্সের মতো দেশ বহির্বিশ্বের যেসব সংকটে মাথা না ঘামিয়ে থাকতে পারে না, সেসব প্রশ্নে আইনসভার মতপার্থক্য বাইরে চলে আসতে পারে। কারণ, দলগুলোর অবস্থানগত পার্থক্য বেশ গাঢ়।
চারটি দলের মধ্যে সর্বোচ্চ আসন লাভ করেছে জ্যাঁ-লুক মেলেনশঁর নেতৃত্বাধীন ‘ফ্রান্স আনবোড (এলএফআই)’। ২০১৬ সালে গড়ে ওঠা দলটির এই নেতাকে ফিলিস্তিনপন্থি হিসেবে অনেকে দাবি করেন। হামাসকে ‘সন্ত্রাসী’ মনে করে না এলএফআই। তাকে ফরাসি রাজনীতির অনেক চিন্তক রুশপন্থিও মনে করে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও তার অবস্থান নাকি পশ্চিমা বিশ্বের বিদ্যমান অবস্থানের মতো নয়।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএস), যার নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। দলটি সামাজিক গণতন্ত্রী ও ইইউপন্থি। ইউরোপীয় মূল্যবোধের প্রথাগত বাম শক্তি তারা। তৃতীয় শক্তিধর দল ফ্রেঞ্চ গ্রিন পার্টি। তারা পরিবেশবাদী। মাখোঁর জলবায়ু নীতিতে বাদ সাধতে পারে তারা। আর চতুর্থ স্থানে রয়েছে ফ্রেঞ্চ কমিউনিস্ট পার্টি (পিসিএফ)। তারা অনেকটা ধ্রুপদী মার্কসবাদী পার্টির মতো। পুঁজিবাদী সভ্যতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার তাদের। বলশেভিকদের দ্বারা বেশ অনুপ্রাণিত তারা।
সুতরাং আগামী দিনে ফ্রান্সকে এমন জায়গা নিতে হবে, যেখানে এসব দলের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়। মাখোঁ চাইলেও এসব মত অগ্রাহ্য করতে পারবেন না। বিশেষত, ইউক্রেনে সেনা ও ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর মতো সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে। অভ্যন্তরীণ ব্যাপারেও ফ্রান্সের জন্য এই সংকট সত্য। নির্বাচনের আগেই বামপন্থিদের মঞ্চ মাখোঁর ‘বিতর্কিত’ পেনশন কর্মসূচি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নিশ্চিতভাবে এ নিয়ে আবারও শোরগোল হবে।
ফ্রান্সের বিগত ৫০-৬০ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ফরাসিরা কোন সরকার নির্বাচন করবে তার আভাস আগেই কিছুটা পাওয়া যেত। সরকার গঠন নিয়ে এত অনিশ্চয়তা অনুভূত হয়নি ফরাসিদের মধ্যে। দ্বিতীয় দফায় হুমড়ি খেয়ে ভোট দিয়েছে মানুষ, যা শতাংশের হিসেবে ৬৬ ভাগের ওপরে। সরকারের কর্মসূচি ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ সবটাই অনিশ্চয়তায় ঠাসা। খোদ প্রেসিডেন্টের দলকেই মানুষ বর্জন করেছে। দুই মহাদেশে দুটি বড় যুদ্ধের মধ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফ্রান্স। এ ছাড়া ফ্রান্সের জন্য মূল চ্যালেঞ্জটি হলো, আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে দেশটিতে অলিম্পিক গেমস শুরু হতে যাচ্ছে। এখন ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে সরকার গঠন করা জরুরি। তবে কথা একটাই, সামনের পথের ভয় দূর করা কঠিন। এই মতভেদ পশ্চিমা দুনিয়ার ইউক্রেন নীতি আর মধ্যপ্রাচ্য নীতির জন্য স্বস্তির নয়। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মাখোঁর জন্য কঠিন পথচলার শুরু এখন থেকে।
ফ্রান্স না হয় এবার ডানে ঘুরতে ঘুরতে কোনোমতে বামে মোড় নিল। এখন এটি টেকসই কি না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে সব জায়গায়ই। কারণ এবারের ইইউ পার্লামেন্ট দেখিয়েছে, ইউরোপে ডানপন্থার হাওয়া এখন একটি দেশে সীমিত নেই। এটি ইউরোপের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য তো বিপদের কারণ হবেই, ইউরোপের নিজস্বতার জন্যও হুমকির। ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থি দলগুলোর শক্তি সঞ্চয়ের কারণ কিন্তু প্রথাগত মূল্যবোধের আওয়াজ তোলা দলগুলোর নীতিগত বিভ্রান্তি ও দৈন্য। যেমন ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার বিরুদ্ধে জনমত বেশ গাঢ় এবং ক্রমশই তা আরও বিকশিত হচ্ছে। এ অবস্থায় মেরি লি পেনের মতো ডানপন্থি নেতানেত্রীরা ইউক্রেনকে অর্থ সহায়তা ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরুদ্ধে। মেরি লি পেনের মতো তার দলের বর্তমান প্রধান জর্দান বারলেল্লে ইউক্রেনকে সমর্থনটুকু করতে রাজি, কিন্তু এর চেয়ে এক বিন্দুও বেশি নয়। তাই ইউরোপে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডানপন্থি জনমতের কারণ শুধু অভিবাসন বিরোধিতার মধ্যে খুঁজলে চলবে না। কিন্তু ইইউ নেতারা ইউক্রেন যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যেতে যত আগ্রহী, তা থামাতে ততটা নয়।
গত কয়েক দশকে ইউরোপের মাটিতে ডানপন্থার বিকাশ কোনো মূলধারার রাজনীতির আলোচ্যসূচিতেই ছিল না। বাস্তবতা হলো, এখন ফ্রান্স থেকে জার্মানিতে অতি ডান ও কট্টর ডান শক্তিগুলো নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারার জায়গায়। লি পেনপন্থিরা ফ্রান্সের স্পর্শকাতর পদে অভিবাসীদের দেখতে চায় না, ইহুদি নিধনকে সংবেদনশীলভাবে দেখতে চায় না এবং রাশিয়ার সঙ্গেও তিক্ত সম্পর্কে থাকতে চায় না। আবার ইউরোপের অপরাপর কট্টর ডান গোষ্ঠীগুলোর মতো তারাও ইইউ জোটকে জাতীয় সত্তার ওপরে দেখতে চায় না। এমনকি কারও কারও ভাষ্য এমন যে, ইইউ ভেঙে গেলেও কষ্ট পাবেন না এসব নেতা। এ অবস্থায় ইতালির ফ্যাসিবাদ অনুরাগী, জার্মানির নব্য নাৎসি এবং ফ্রান্সে লি পেনের মতো ডানশক্তির সম্ভাব্য মৈত্রী গড়ে ওঠার কথা ভাবাও ইউরোপীয় নেতাদের জন্য অস্বস্তিকর। আবার তাদের সঙ্গে ওরবানের মতো নেতারা যোগ দিলে ইউরোপকে তার এখনকার জায়গায় ধরে রাখাই কঠিন। আরেকটা কথা মনে করিয়ে দেওয়া ভালো, ভিক্তর ওরবান রাশিয়া সফরে যাচ্ছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইইউভুক্ত দেশের এটিই হবে প্রথম রাশিয়া সফর।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
