জামিনে কারামুক্ত হওয়ার পর সাংবাদিক গোলাম রব্বানি নাদিম হত্যা মামলার প্রধান আসামি মাহমুদুল আলম বাবু বলেছেন, ‘এবারের সংসদ সদস্য (এমপি) মো. নূর মোহাম্মদ সাহেব, উনি অত্যন্ত ভালো লোক। আমার সঙ্গে জেলে অনেকবার কথা হয়েছে। আমার ইউনিয়নের রাস্তাঘাটের কথা বলেছেন। বাবু তুমি বের হয়ে আসো, এ মামলা মীমাংসা করে দেব।’
গতকাল বুধবার বিকেলে জামিনে জেলা কারাগার থেকে বের হয়ে বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের কেবি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দেওয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন ইউনিয়ন পরিষদের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া চেয়ারম্যান বাবু। তার এ বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের এমপির দাবি, সাংবাদিক নাদিম হত্যা মামলা মীমাংসার বিষয়ে কারও সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।
ভিডিওটির শুরুতে একজনকে উপস্থাপনা করতে দেখা যায়। ওই ভিডিওর ১ মিনিট ১০ সেকেন্ডের মাথায় বক্তব্য শুরু করেন বাবু। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘১৭ জুন আমি অ্যারেস্ট হয়েছিলাম, পঞ্চগড় আমার নানাবাড়ি থেকে। আপনারা জানেন, এ মামলায় অনেকেই অনেক মন্তব্য করেছেন। ওপরে আল্লাহ তাআলাই জানেন, কে মেরেছে, কে মেরে ফেলেছে। আপনারা জানেন আমি প্রাক্তন একজন চেয়ারম্যান। আমার সঙ্গে সাংবাদিকদের অনেক ভালো সম্পর্ক। এটা আপনারা অনেকে জানেন। হঠাৎ করে কী কারণে, কী আমার পাপ ছিল, আমি জানি না। এ মামলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় আমাকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। আপনারা সবাই জানেন, আমার ছেলে রাজধানী ঢাকার বাড়িধারায় ছিল। সে ওইখানে লেখাপড়া করে। ঢাকা থাকাবস্থায় তাকে দুই নম্বর আসামি দিয়েছে। আপনারাই ভালো জানেন। আপনাদের ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারব না। আমার সাধুরপাড়াবাসী আমার কাছে প্রাণের চেয়েও দামি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবুকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘আমি এক বছর আপনাদের কাছ থেকে দূরে ছিলাম। আমি এক বছরে আমার সাধুরপাড়ার অনেক ঘটনা শুনেছি। অনেক ক্ষতিও হয়েছে। ডাকাতি করেছে, চুরি করেছে আমার গরিব লোকের ওপর নির্যাতন করেছে। টাকা-পয়সা খেয়েছে। ভয়ভীতি দেখাইয়া কেউ গরু বেচে, ছাগল বেচে টাকা দিয়েছে। ঘর বেচে টাকা দিয়েছে। আমি আপনাদের কাছে পাঁচ বছরমারী কামলা হিসেবে, আড়াই বছর চলে গেছে। বাকি আড়াই বছর আপনাদের পাশে থাকব ইনশাআল্লাহ। এ মামলা বিচারাধীন অবস্থায়, বিচার চলবে। আইনকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমি আইনকে সারা জীবন শ্রদ্ধা করে যাব। আপনি যদি মনে করেন, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট, জজ কোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট থেকে আমাকে জামিন দিয়েছে। আপনারা অনেকেই জানেন, আমার রুল জারি হয়েছিল। আমাদের সরকার, বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট স্টে নো অর্ডার করে দিয়েছে। আমার মামলায় আর কোনো সমস্যা হবে না।’
ভিডিওর শেষের অংশে বাবুকে বলতে শোনা যায়, ‘এবারের সংসদ সদস্য মো. নূর মোহাম্মদ সাহেব, উনি অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমার সঙ্গে জেলে অনেকবার কথা হয়েছে। আমার ইউনিয়নের রাস্তাঘাটের কথা বলেছে। বাবু তুমি বের হয়ে আসো, এ মামলা মীমাংসা করে দেব। আমার বন্ধুবর দু-দুবারের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং এবারের উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন। উনি আপনারা জানেন নজরুল ইসলাম সাত্তার। উনি আমার অভিভাবক এবং শ্রদ্ধাভাজন লোক। উনিও আমাকে বলেছেন, আমার ইউনিয়নে যা যা প্রয়োজন সবই করে দেবেন। আপনারা শুধু দোয়া করবেন আমি যেন আবার এক দেড় বছর আগে যে চেয়ারম্যান ছিলাম, সেই চেয়ারম্যান হিসেবে চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি দূর করতে পারি।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বাবুর মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের এমপি নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘তার সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি।’
বাবুর ছড়িয়ে পড়া এ ভিডিও নিয়ে জেলা জুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এ বিষয়ে সাংবাদিক নাদিমের স্ত্রী ও মামলার বাদী মনিরা বেগম বলেন, ‘বাবুর জামিন হওয়াতে আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি। তিনি একজন উচ্ছৃঙ্খল লোক। এটা নিয়ে আমরা ভয়ের মধ্যে রয়েছি। আর এমপি সাহেবের সঙ্গে আমার মামলা নিয়ে কোনো কথা হয়নি। বাবুর সঙ্গে কী কথা হয়েছে তা আমি বলতে পারব না।’
প্রেস ক্লাব জামালপুরের সদস্য ও জামালপুর অনলাইন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদের সঙ্গে সাংবাদিক হত্যা মামলার প্রধান আসামির (বাবু) ভালো সম্পর্ক রয়েছে, যা ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখলে বোঝা যায়। ক্ষমতাসীন লোকের প্রভাবে বিচারকাজ যেন প্রভাবিত না হয়, রাষ্ট্র্রের কাছে এমনি চাওয়া। ওই নৃশংস সাংবাদিক হত্যা মামলায় সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। সেই মামলার সঠিক বিচার পাওয়া এখন সময়ের দাবি।’
