এই নগরীতে বৃষ্টি মারাত্মক দোষী

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৪, ১২:৩২ এএম

বৃষ্টির তোড়ে আবার বাড়বাড়ন্ত দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নদ-নদীর পানি। দিন কয়েক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির পর বৃহস্পতিবার উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বেড়ে নদীঘেঁষা এলাকাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির ফের অবনতি। পরদিন শুক্রবার ঘণ্টা কয়েকের বৃষ্টির পানি আটকে অচল হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। পাউবোর তথ্যানুযায়ী, গতকাল দেশের মোট ৯ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল । সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ ১২-১৩টি জেলাকে বন্যা উপদ্রুত বলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বাস্তব সংখ্যাটি আরও বেশি।

কুড়িগ্রামে ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে। একটানা পানিতে থাকার কারণে বাড়ছে জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়ার প্রকোপসহ পানিবাহিত নানা রোগবিমারি। লালমনিরহাটে তিস্তা কিছুদিন ধরে মারাত্মক আগ্রাসী। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের উত্তর ডাউয়াবাড়ি। এর একপাশে নীলফামারীর জলঢাকা, অন্যদিকে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা। তিস্তার পানির তোড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে গাছপালা, চাষের জমি। ভেঙে গেছে রাস্তাঘাট। বসতভিটা, বাড়িঘর বিলীন হচ্ছে সমানে। 

পাহাড়ি ঢলে বিধ্বস্ত শেরপুরসহ আশপাশ। মহারশি নদীর দুই তীরের বেশ কয়েকটি ভাঙা অংশ তাৎক্ষণিকভাবে মেরামতের জন্য বালির বস্তা ও জিওব্যাগ ফেলে আপৎকালীন কাজ সারানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু, চেষ্টায় অকুলান। স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ থাকছে কেবল আশ্বাসে। উজানের ঢলে সুনামগঞ্জে আবার পানি থই থই। মেঘালয়ের ভারী বর্ষণে সুনামগঞ্জের প্রধান নদী সুরমায় পানি বেড়েছে। ঢলের পানিতে নতুন করে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্ত এলাকার রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। সিলেটে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে না হতেই আবার অবনতি। আক্রান্তরা ঘরবাড়িতে ফেরা শুরু করেছিল মাত্র। এরমধ্যে প্রতিদিনই আগের দিনের তুলনায় বেশি বৃষ্টিতে অবস্থা তথৈবচ। 

দেশের বাদবাকি এলাকার মানুষ কি স্বস্তি বা স্বাভাবিকতায় আছে? পর্যটন বা বিনোদন নগরী কক্সবাজারের কী অবস্থা? সেখানে মৌসুমটাই আতঙ্কের। শহরের ভেতরেই একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা। মৃত্যু হয়েছে বেশ কয়েকজনের। এরপরও বন্ধ হয়নি পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ দায় এড়িয়ে যাচ্ছে যথারীতি। রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতায়ও দায় না নেওয়ার সংস্কৃতি। যানজট, জনজটের ঢাকায় জলজটের যন্ত্রণাটা সেদিন একটু বেশি কাবু করে দিয়ে গেছে। এই নগরীতে বৃষ্টি মারাত্মক দোষী হিসেবে সাব্যস্ত। না এলে দোষ। এলেও দোষ। পানি সরার ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টিকে দায়ী করে দায়হীন থাকছেন এখানকার দায়িত্ববানরা।

মাঝেমধ্যে জলাবদ্ধতার পর ‘ঢাকায় আর জলাবদ্ধতা হবে না’ এমন ওয়াদা কেন দেন জনপ্রতিনিধিরা? দেখান স্বপ্ন? দুঃসহ ভোগান্তির মধ্যে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি কি জরুরি? নাকি বেহুদা স্মার্টনেস দেখান? এর মধ্য দিয়ে কি নিজেরাই হচ্ছেন ট্রল আইটেম। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজধানীতে এবারের মতো এত বেশি জলাবদ্ধতা আর দেখা যায়নি। শুক্রবারের মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঢাকা শহর তলিয়ে জলাবদ্ধতার জন্য একদিন পর শনিবার দুঃখ প্রকাশ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সংস্থাটি এখন সমন্বয়হীনতার দিকে আঙুল তুলেছে। আর দায়ী করেছে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও পলিথিনকে। মাত্র দু’মাস আগে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন, তার এলাকায় জলাবদ্ধতা হবে না। এই সক্ষমতার বাহাদুরির মধ্যেই ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে বর্ণনাতীত জলাবদ্ধতার নজির।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাস্তা মেরামত কাজে বরাদ্দকৃত অর্থের ৩০ শতাংশ ব্যয় হয় ড্রেনেজের কাজে। আলাদাভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতি বছর কম হলেও প্রায় ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় এখন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে সংস্থাটি। জলাবদ্ধতা আর দেখতে হবে না এমন বাগাড়ম্বর প্রতি বছর দেখানোর মানে কি? সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, অন্যদের কারণে সৃষ্ট সমস্যা করপোরেশনের কাঁধে তুলে দেওয়া উচিত নয়। তাহলে কার কাছে সমস্যার সমাধান চাইবে নগরবাসী? সেই ‘অন্যরাই’ বা কে? কী পরিমাণ বৃষ্টি মোকাবিলার সক্ষমতা ঢাকা দক্ষিণ সিটির রয়েছে, তাও জানানো হচ্ছে না। 

শুক্রবার ছুটির দিনটিতে ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রাজধানীর কোনো এলাকাই এবার রক্ষা পায়নি। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমর সমান। অনেক এলাকায় বিকল হয়ে পড়ে যানবাহন। এসবের যাবতীয় কারণ বিদ্যমান। বৃষ্টি প্রাকৃতিক। বৃষ্টির পানি আটকে জলজটের আজাব মোটেই প্রাকৃতিক নয়। মনুষ্যসৃষ্ট।  

বৃষ্টিকে কান ধরে পরিমিতিবোধে আনা না গেলেও বৃষ্টির পানিকে আয়ত্তে বা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। সেই কর্তৃপক্ষও আছে। তারা পুকুর কাটা, জলাশয় সাফ করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতিসহ নানান কিছু শিখতে বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যয়ে কত দেশ সফরে যান। দেশে ফিরে কী করেন? সেই অভিজ্ঞতা কোথায় ফলান? তারা কোথাও কি দেখেছেন নগরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যকর না করা, রাস্তা মেরামত না করা, যানজট ও যেখানে সেখানে বাস দাঁড়িয়ে রাখার স্বাধীনতা, পার্কিং ছাড়া ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া, ব্যক্তিমালিকানায় গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি হতে দেওয়া, যখন-তখন একজন-দুজন ভিআইপি যাবেন বলে দীর্ঘ সময় হাজার হাজার মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ রাখা? এগুলো একটা শহরকে ‘শহর’ হিসেবে বাসযোগ্য করার ন্যূনতম পূর্বশর্ত।

চার বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে কমপক্ষে ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গত চার বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে খরচ করেছে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা। আর উত্তর সিটি প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা। দুই সিটির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগের চেয়ে ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। সেই উন্নতির নমুনা তো আনুষ্ঠানিক দেখেছে মানুষ। জলাবদ্ধতা হলে দুই সিটি যা করে তা একেবারেই সাময়িক ব্যবস্থা। এটি সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতার ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে করা মহাপরিকল্পনাকে গুরুত্ব না দিয়ে আচ্ছা মতো টাকা খরচ করছে তারা। অথচ, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ওয়াদা তারা ঠিক মতোই দেন। বরাদ্দও পান বিশাল বিশাল অঙ্কের।

২০২১ সালের আগে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব ছিল ঢাকা ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থার হাতে। তখনো মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হলেই ঢাকার রাস্তাগুলো হয়ে যেত নদীপথের মতো। তখন কথা উঠত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে না থাকায় জবাবদিহি নেই জলাবদ্ধতা নিয়ে। তাই সরকার ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার অধীনে থাকা সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর দুই সিটি করপোরেশন সময়ে সময়ে খাল উদ্ধারে তৎপর হয়। এ খাতে বিগত অর্থবছরগুলোতে পৃথক বরাদ্দও রাখা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই সিটি করপোরেশন প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে। ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, গত এক যুগে জলাবদ্ধতা নিরসনে অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে বুঝে পাওয়ার পর খাল ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের কাজ করছে দুই সিটি কর্র্তৃপক্ষ। শুধু কিছু খাল-ড্রেন পরিষ্কার রাখলেই জলাবদ্ধতার সমাধান হবে না। বৃষ্টির পানি নর্দমা হয়ে খালের মাধ্যমে নদীতে যাওয়া পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ধাপ আছে। বৃষ্টির পানি নালার ওপরের ছিদ্রযুক্ত ঢাকনার মাধ্যমে সড়কের নিচে পানি নিষ্কাশনের নালায় যায়। বহু ক্যাচপিট এবং নালার মুখ বন্ধ অনেক দিন থেকে। খালের তলায় মাটি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। তা নিরসনে খরচ কম হয়নি। জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল ও নালা পরিষ্কারের মতো কিছু নিয়মিত, প্রাথমিক ও ছোট কাজ আছে। বড় বড় অঙ্কে এ ছোট কাজগুলো সিটি করপোরেশন নিয়মিতই করে। যেমন, শান্তিনগর ও এর আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করে। কিন্তু পরিস্থিতি তেমন বদলায়নি। শুক্রবারের বৃষ্টিতে রাজারবাগ, মালিবাগ, শান্তিনগর এলাকার দশা ওইপথের পথিক বা যাতায়াতকারীরা দেখেছেন।

ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই বছর আগে প্রায় ২১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। শুক্রবারের বৃষ্টিতে প্রায় ৮ ঘণ্টা ডুবে ছিল এই এলাকাসহ আশপাশ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন চারটি খালের সৌন্দর্যবর্ধনে ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে ‘খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদন পায়। ৮৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুনে। ঠিকমতো কাজ শুরু হওয়ার আগেই ২১ মাস পেরিয়ে গেছে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত