ফুটবল থেকে আর কী চাইতে পারতেন লিওনেল মেসি? তার চাওয়া-পাওয়ার পালা তো সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে। কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পরই প্রাপ্তির ঝুলি হয়েছে পূর্ণ। ফুটবলে যা যা জেতা সম্ভব তার সবই জিতেছেন। সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে নিজেকে নিয়ে গেছেন অমরত্বের পথে। তবুও আর্জেন্টাইন ফুটবলের এই মহানায়কের ওপর থেকে সরে যায়নি বিধাতার আশীর্বাদের হাত। ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে তাই আরও একটি শিরোপা উঠল তার হাতে। আরও একটি কোপা আমেরিকা ট্রফি।
অথচ মাত্র তিন বছর আগেই চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাদুকরী ফুটবলে শীর্ষ ক্লাব পর্যায়ের সবকিছু জয় করে ফেলা লিওনেল মেসিকে সর্বকালের সেরাদের তালিকায় রাখতে আপত্তি ছিল অনেক বোদ্ধার। বিশ্বকাপ না জিতলে, নিদেনপক্ষে জাতীয় দলের হয়ে একটা ট্রফি না জিতলে কীসের আবার বিশ্বসেরা? ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে হার, পরপর দুটি কোপা আমেরিকায় রানার্সআপ হয়ে আর্জেন্টিনা শুধু হতাশাই উপহার দিয়ে যাচ্ছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, মেসির ক্যারিয়ার কি এভাবেই নিঃশেষ হবে?
মেসি তো একবার নিজেই থেমে গিয়েছিলেন। ২০১৬ কোপায় চিলির কাছে হারের পর নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে। একসময় অভিমান ঝেড়ে ফেলে ফের গায়ে চাপান আকাশি-নীল জার্সি। তবু রাশিয়া বিশ্বকাপ থেকে খালি হাতেই ফেরে আর্জেন্টিনা। ফুটবল অঙ্গনে শঙ্কা জাগে, আবার কি অভিমানে কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন মেসি? নাহ, এবার তিনি হয়ে ওঠেন ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় জাতীয় দলের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই লড়াইয়ের সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়ে গেলেন একসময়ের সতীর্থ লিওনেল স্কালোনিকে। দুই ‘লিও’তে বদলে গেল আর্জেন্টিনার ফুটবল।
২৮ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে ২০২১ কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতল আর্জেন্টিনা, সেটাও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে তাদের মাটিতে হারিয়ে। জাতীয় দলের হয়ে সেটাই মেসির প্রথম শিরোপা। ওই আসর দিয়েই শুরু হলো মেসি-স্কালোনির জয়রথ। ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে ‘ফিনালিসিমা’ শিরোপাও জিতল আর্জেন্টিনা। তখনো সবচেয়ে বড় অর্জনটি মেসির অধরাই ছিল। একটা বিশ্বকাপ জিততে হবে না? ২০২২ বিশ্বকাপ তাই পরিচিত পেল ‘মেসির শেষ বিশ্বকাপ’ হিসেবে। মেসির জন্য জীবন দিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেন এমি মার্তিনেজ। মরুর বুকে মেসি-ডি মারিয়াদের অবিশ্বাস্য ফুটবল আর এমি মার্তিনেজের ‘বাজপাখি’র উড়ানে ঘুচল ৩৬ বছরের অপেক্ষা। ফুটবল জাদুকরের হাতে উঠল বিশ্বকাপ ট্রফি।
দুই বছরে তিন শিরোপা সব পাওয়া তো হয়েই গেল। এবার কি তবে বিদায় নেওয়ার পালা? মেসি চাইলেও তো তার দল এবং সমর্থকরা বিশ্বজয়ের নায়ককে এত তাড়াতাড়ি বিদায় দিতে নারাজ। শরীর বেঁকে বসলেও মেসি তাই খেলা চালিয়ে গেলেন। সামনে এলো আরেকটি কোপা আমেরিকা। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নির্ভার হয়ে মাঠে নামল আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্ট জুড়ে চোটের সঙ্গে লড়াই করা মেসি নিজের সেরা ফর্মের ধারেকাছেও ছিলেন না। মিস করেছেন পেনাল্টিও। কিন্তু আর্জেন্টিনা দল স্কালোনির মাস্টার কোচিংয়ে দারুণ একটা দলে পরিণত হয়ে উঠেছে। মেসিকে ছাড়াও তারা জিততে শিখেছে। এদিকে আনহেল ডি মারিয়া আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, কোপার শেষেই অবসর নেবেন। তাই এবারের কোপা আমেরিকা হয়ে উঠল ‘ডি মারিয়ার আসর’।
মেসি স্বয়ং ঘোষণা দিলেন, ১৭ বছরের সতীর্থ ডি মারিয়ার জন্যই ফাইনালে উঠতে হবে। গোলপোস্টে ফের ডানা মেললেন ‘বাজপাখি’। ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। সামনে দুর্ধর্ষ কলম্বিয়া, যারা গত ২৮ ম্যাচ ধরে অপরাজিত। তাই মৃদু শঙ্কা জাগল, কোনো অঘটন ঘটবে না তো? কিন্তু ওই যে, ফুটবলবিধাতা ঠিক করে রেখেছেন মেসিকে দুহাত ভরে দেওয়ার। তাই মারাত্মকভাবে পা মচকে মেসি উঠে গেলেও দেবদূত হয়ে এলেন লাউতারো মার্তিনেজ। অতিরিক্ত সময়ের গোলে মেসির হাতে তুলে দিলেন কোপার আরেকটি শিরোপা। সব পাওয়া হয়ে গিয়েছিল আগেই, এবার দুহাত ভরে উঠল মেসির। দুই বছর পরই আরেকটি বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার ফুটবল জাদুকর সে পর্যন্ত চালিয়ে যাবেন কি?
