বিভ্রান্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্লোগান বিতর্ক

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৪, ০৫:৪৪ এএম

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ‘অরাজনৈতিক’ বলেছেন। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। কিন্তু তারা কীভাবে মোকাবিলা করছেন? সরকার আসলে এ আন্দোলনকে কোনোভাবেই থামানোর চেষ্টা করছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছে। অবশ্য মাঝে মাঝে পুলিশ প্রশাসনের হুমকি-ধমকি দেখা যাচ্ছে, গত পরশু পর্যন্ত সেটা এতটুকুই দেখা গিয়েছে। তবে, গতকাল আর আজ সেটা কোন দিকে যায় বলা যাচ্ছে না। তা না হলে পুলিশের বিনা বাধায় কোটা আন্দোলনকারীরা বঙ্গভবনের কাছাকাছি গণপদযাত্রা নিয়ে যেতে পারত না। প্রশ্ন উঠেছে, এটা আসলে ‘ইস্যু দিয়ে ইস্যু শিকার মারা’র পুরনো খেলা কি না। তা না হলে যুক্তি ও ভবিষ্যতের কথা ভাবলে খুব সহজেই, অনেক আগেই এই সংকটের সমাধান হয়ে যেত। সমাধান প্রধানত সরকারের হাতে। ২০১৮ সালে সরকার কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে কোটা ব্যবস্থাই তুলে দিয়েছিল। এটি ভালো সমাধান ছিল না, কোটা আন্দোলনকারীরাও এ রকম কিছু চাননি, চেয়েছিলেন সংস্কার। এই সংস্কার সংবিধানের আলোকে করতে হলে আমাদের নির্মোহভাবে সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদ বুঝতে হবে। ২৮ অনুচ্ছেদে সার্বিকভাবে সাম্য ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা আছে। ২৯ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্টভাবে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য করা যাবে না বলা আছে।

দুটো অনুচ্ছেদেই বৈষম্যহীনতা মূলনীতি, তবে পৃথিবীর অন্য বহু সংবিধানের মতো এখানেও কিছু ব্যতিক্রমকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সরকার মনে করলে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা (যেমন কোটা) করতে পারবে বলা আছে। ২৯ এবং ২৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোটার ব্যবস্থা করা তাই বাঞ্ছনীয়, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।

চীন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উসকানিমূলক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থীরা হঠকারী সেøাগান দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানালে পরিস্থিতি সত্যিই জটিল হয়ে পড়ে। আশার কথা, নিজেদের ‘রাজাকার’ দাবি করা রাতের সেই বীভৎস সেøাগান শিক্ষার্থীরা কিছুক্ষণের মধ্যেই সংশোধন করে নেন। ছাত্ররাই ভুল শুধরে নিয়েছেন। তবে শুরু হয়েছে সেøাগান নিয়ে বিতর্ক। পুরো বিতর্কটাই বিভ্রান্তির ওপর দাঁড়িয়ে করা হচ্ছে।

প্রত্যেকটি আন্দোলনে একটি আবেগ থাকে। আমরা যখন আন্দোলনে ছিলাম, তখনো আমাদের ভেতরে চরম আবেগ ছিল। কিন্তু প্রতিক্রিয়া জানাতে যারা এই হঠকারী সেøাগানটা দিয়েছেন তারাও বোঝেননি হয়তো যে, এর খণ্ডাংশ তাদের বিরুদ্ধেই চলে যেতে পারে। নিজেদের ‘রাজাকার’ বলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সাফাই দিয়েছেন, এটা আমাদের জন্য চরম লজ্জার। আমি মনে করি এটা আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে আত্মঘাতী। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, “রোকেয়া হলের মেয়েদের মুখে ‘রাজাকার’ সেøাগান, দুঃখ লাগে। তারা কী শিক্ষা পেল। তারা কি জানে, ২৫ মার্চ কী হয়েছিল। এসব তারা দেখেনি। তাই তারা রাজাকার পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে।” (সংবাদ প্রকাশ) প্রতিটি বৃহত্তর আন্দোলনে নানা ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটে। চলমান এ আন্দোলনও ব্যতিক্রম নয়। মূলধারার ছাত্র সংগঠনগুলোর সক্রিয় নেতৃত্বের ঘাটতি যেমন চোখে পড়ছে, তেমনি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের উপস্থিতিও বোঝা যাচ্ছে। আবার আন্দোলনকে বিতর্কিত করতে সরকারি-বেসরকারি নানা মহলের উসকানিও অসম্ভব নয়। কোটার হার যৌক্তিক সংস্কারে সবাই প্রায় একমত। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের দোহাই না দিয়ে সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া। যত বেশি সময়ক্ষেপণ হবে, ততই আন্দোলন ভিন্ন খাতে নেওয়ার প্রচেষ্টাও জোরালো হবে। তবে গণজাগরণ মঞ্চের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমে তরুণ প্রজন্মের অবস্থান সুস্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করে দেওয়া কোনো সেøাগান বা বক্তব্য দিয়ে কেউ হালে পানি পাবে না। কোটা সংস্কার দেশের বেশিরভাগ মানুষ যৌক্তিক মনে করেন। তবে মনে রাখা দরকার প্রতিটি আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারিত হয় তার বক্তব্যের ওপর। ছাত্রী হলে লাইট বন্ধ করে কেন ও কারা বিতর্কিত সেøাগান দিল আর রাজু ভাস্কর্যে এসে সেøাগান পাল্টে গেল! আন্দোলনের সবার মতলব জানি না। কেউ কেউ কি মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে মøান করার উদ্দেশ্যে আন্দোলনটা টেনে নিচ্ছে? সতর্ক থাকতে হবে।

দুই

একটি আন্দোলনে যখন রাজনৈতিক লক্ষ্য না থাকে রাজনৈতিকশূন্যতা থাকে, সেখানে তখন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধা থাকে, আছে। সরকার প্রথম দিকে বিএনপিকে দোষারোপ করেছে। বিএনপি সেই জায়গায় খুব কৌশলগতভাবে নীরব অবস্থানে থাকার চেষ্টা করলেও শেষ অবধি পারেনি। ২০১৮ সালে যখন এ আন্দোলনটি শুরু হয়, তখন একটা সেøাগান দেওয়া হলো, ‘রাষ্ট্রের মেরামত চলছে’। খুব জনপ্রিয় হয়েছিল সে সেøাগান। কিন্তু এ সেøাগানটির আড়ালে মূলত বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া আরও জোরালো হয়েছে, আমাদের মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিকে রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

তিন

দেশ জুড়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, নানা কারণেই তা ঘটনাবহুল। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একে একে দুর্নীতির ঘটনা ফাঁস হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেনশন স্কিম নিয়ে ধর্মঘট, সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন, বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেংকারি; সবকিছু মিলিয়ে যেন তালগোল পাকিয়ে গেছে।  যতই দিন যাচ্ছে, ততই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত একটি দেশের সামগ্রিক চিত্র নির্লজ্জভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্থ কেলেংকারি, অর্থ পাচারসহ নানা ধরনের অপকর্মের খবর নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এসব দেখেশুনে সাধারণ মানুষদের সরকারি চাকরির প্রতি বিমুখ হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা। বাস্তবতা হলো, দিন দিনই সরকারি চাকরির প্রতি মোহ বাড়ছে, বাড়ছে প্রতিযোগিতা। লুটপাট আর দুর্নীতির এই চিত্র বিন্দুমাত্রও প্রভাব ফেলছে না তরুণ প্রজন্মের ওপর। তরুণরা কি চাকরিজীবনে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা জেনেই সরকারি চাকরির পেছনে ছুটছেন? একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আটকা পড়েছিলাম। সে সময় কিছু ছাত্রের সঙ্গে কথা বলা ও তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়েছিল। লক্ষ করেছি, সেখানে তাদের মধ্যে যতটা না কোটা সংস্কার আর বৈষম্যের প্রতি প্রতিবাদের আকুতি, তার চেয়েও বেশি মনে হয়েছে সরকারি চাকরির প্রতি তীব্র মোহ। সরকারি চাকরির প্রতি লিপ্সা তাদের অনেক সৃজনশীল কর্মস্পৃহা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। সরকারি চাকরিই যেন তাদের জীবনের একমাত্র গন্তব্য। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বলে, কোটা আন্দোলনটি এ পর্যায়ে আসার পেছনে শুধু কোটাব্যবস্থাকে যৌক্তিক রূপ দেওয়ার দাবিটিই নেই; সঙ্গে বারুদের মতো কাজ করছে সরকারি চাকরি লাভ করার মরিয়া আকুতি। কারণ কোটায় সংরক্ষিত আসনসংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ হলো, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরি লাভের সম্ভাবনার পথটি প্রশস্ত হওয়া। একদিকে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষমতার আতশবাজি, আর অন্যদিকে বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে ধনসম্পদের নিরাপদ পাহাড় গড়ে তোলার আকর্ষণীয় প্যাকেজটি সম্ভবত আর কোনো চাকরিতে নেই। ফলে অন্য চাকরিতে বেতন বা পদবি যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন; সরকারি চাকরির তুলনায় তা জৌলুসহীন। ফলে তা তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করছে না। তাই তো বিচ্ছিন্ন কিছু ইস্যুতে প্রতিবাদ করা ছাড়া অন্য কোনো যৌক্তিক আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের শামিল হতে দেখিনি।

চার

এই পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এবং পোষ্য কোটায় বাংলাদেশে কজন বিসিএস ক্যাডারে বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ পেয়েছেন? বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা ১০ ভাগ কোটাও পূরণ হয় না। মুক্তিযোদ্ধা ও পোষ্য কোটায় লোক পাওয়া যায় না, এই কারণে কোটা খালি থাকে। অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা ও পোষ্য কোটার কারণে যে কেউ যে খুব একটা বঞ্চিত হচ্ছে তা সত্যি নয়। এই কোটাটা কার্যত কারও স্বার্থই বিঘিœত করে না। তাহলে কেন এত ক্ষোভ? বিশেষভাবে মুক্তিযোদ্ধা ও পোষ্য কোটার ওপর এত ক্ষোভ কেন? যদি এমন হতো যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার কারণে শত শত চাকরি ওদের ছেলেমেয়েরা বা নাতিপুতিরা নিয়ে যাচ্ছে, তাহলে বুঝতাম যে আপনাদের ক্ষোভ সঠিক। সেটা তো নয়। তাহলে কী উপসংহারে পৌঁছব? হ্যাঁ, অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আছে। তার জন্য মুক্তিযোদ্ধা কথাটা আমরা ভুলে যাব? কিছু প্রতারক ধরনের লোক জাল-জালিয়াতি করে ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে চেষ্টা করে, ওদের ধরে জেলে পাঠানো দরকার, শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ওদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমার সম্মান শেষ হয়ে যাবে? কিছু লোক প্রশ্নফাঁস করে, সেই প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে বিসিএস পাস করে, তার জন্য বিসিএস তুলে  দেবেন? পুলিশের কিছু লোক চুরি করে, পুলিশ বাহিনী তুলে দেবেন?

কেউ কেউ বলছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা কি কোটা চেয়েছিলেন?’ তারা চাননি। মুক্তিযোদ্ধারা ব্যক্তিগত সুবিধা চাইবেন কেন? ১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য যারা রাজাকারে যোগ দেয়, তারা বেতন পেত, ভাতা পেত, লুটের মাল পেত। লোভ করেছে রাজাকাররা। মুক্তিযোদ্ধারা তো জীবন দিতে গেছে দেশের জন্য। প্রাণ দিতে গেছে, মরতে গেছে। লোভীরা পাকিস্তানিদের পক্ষে ছিল আর যুদ্ধে গেছেন দেশপ্রেমিকরা। আর দেশপ্রেম কী জিনিস? দেশপ্রেম হচ্ছে এমন একটা পরীক্ষা যেটাতে পাস মার্ক হচ্ছে ১০০-তে ১০০-৯৯ পেলেও ফেল। এই পরীক্ষায় পাস করেছেন কেবল আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। এদেশের আর কেউ না।

লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ যুব  ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত